ভারতের কঙ্কাল দ্বীপ

লেখক- অর্ঘ্য দীপ দাস  ও সোমেশ মাইতি



 ভারতের প্রায় উত্তর প্রান্তে একটা অন্যতম রাজ্য হল হিমাচল প্রদেশ। ওই হিমাচল প্রদেশের অন্যতম পর্যটন অঞ্চল হল সিমলা মানালি।  মানালি থেকে প্রায় ৩২৭ কিমি দূরে একটা লেক আছে। যাকে রুপকুন্ড লেক বলা হয়। সেখানেই এই কঙ্কালের উপস্থিতি। রূপকুন্ড লেক সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০২০ মিটার ওপরে। চারদিকে পাথুরে জমি আর বরফে আবৃত পাহাড় দ্বারা ঘেরা। অত্যধিক বরফ থাকার কারণে এই রূপকুণ্ড লেকে পড়ে থাকা কঙ্কালদের অস্তিত্ব সবসময় পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র গরম কালে বরফ কিছুটা গলে গেলে এই কঙ্কালদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

এই রুপকুণ্ড লেকের কঙ্কাল এর অস্তিত্ব প্রথম পায় ১৯৪২ সালে হরি কিষান মাধওয়াল। তিনি ছিলেন নন্দা দেবী জঙ্গলের একজন ফরেস্ট অফিসার। তার সাথে ছিল আরো কয়েকজন ব্রিটিশ অফিসাররা। প্রথম দিকে ব্রিটিশরা মনে করেছিল এই কঙ্কালগুলো জাপানিদের, যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশদের হাতে পরাজিত হয়ে ভারত হয়ে পালিয়ে গেছিলো। হয়তো ঠান্ডায় কাবু হয়ে তারা মারা যায়। কিন্তু পরবতীকালে গবেষণা করে তা অবশ্য নাকচ করে দেয়া হয়।
প্রায় ২০০ মতো কঙ্কালের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। প্রথমদিকে মনে করা হয়েছিল কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ওখানকার অধিবাসীরা মারা যায়। ওখানকার শুকনো বরফাবৃত পরিবেশের জন্য কঙ্কাল গুলো প্রাকৃতিক ভাবে সংরক্ষিত হয়ে যায়।প্রকৃতির এমন খেয়াল এদের শরীরের হার গুলো তো নষ্ট হয়নি, এদের চামড়া পর্যন্ত পচে যায়নি। শুধু তাই নয় শরীরে জামাকাপড়ের অস্তিত্ব পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এমনকি ডিএনএ পর্যস্ত একদম ঠিক আছে। এরপর ২০০৪ সালে একটা গবেষণা হয়। সেখান থেকেই উঠে এল এক অদ্ভুত খবর।  এই কঙ্কালগুল প্রায় ৮৫০ ক্রিস্টপূর্ব আগেকার। ডিএনএ রিপোর্ট থেকে এটা বোঝা যায় যে কঙ্কালগুল অনেক দল এ বিভক্ত ছিল।তবে কিছু কিছু মানুষের মধ্যে স্থানীয় বেশভুসার পরিচয় পাওয়া যায়। কিছু কঙ্কালের সাথে বাঁশের লাঠি বা চামড়ার জুতো ইত্যাদি জিনিসপত্র পাওয়া যায়। যার থেকে মনে করা হয় এরা  চাকর, কুমোর,মুচি  বা জেলের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। এই সমস্ত মানুষজন কোনো তীর্থযাত্রীর দল।  কাছাকাছি অবস্থিত কোনো এক দেবীর উদ্দেশে তীর্থে যাচ্ছিল। 

প্রত্যেকটা লোকই একই রকম ভাবে মারা যায়। প্রত্যেকেই মারা যায় মাথায় আঘাত পেয়ে। কিন্তু আঘাতের চিহ্ন থেকে এটা পাওয়া যায় যে কোনো অস্ত্র দ্বারা এরা আঘাত পায়নি। কারণ এই ক্ষত গুলো গভীর হলেও খুবই ছোট ছিল । তবে প্রতিটা কঙ্কালেরই আঘাতের চিহ্ন শুধু মাথাতেই পাওয়া যায় তা নয় । কিছু কিছু কঙ্কালের ক্ষেত্রে অবশ্য কাঁধেও  আঘাতের দাগ  পাওয়া যায়। অনেক গবেষণার পর জানা গেছে এদের মৃত্যু খুব আচমকা ভাবে হয়েছে। এরা যখন এ পথ দিয়ে যাচ্ছিলো তখন  আচমকা তুষারপাত হয়।যাওয়ার পথে বিপদে পরে পালানোর পথ পায়নি । বরফের বড়ো বড়ো গোলা এদের মাথায় আঘাত করে আর সেখান থেকেই এদের মৃত্যু হয়। বরফের গোলা গুলোর আকার প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার ছিল। আর তারপর থেকেই এরা প্রায় ১৫০০ বছর ধরে পরে আছে প্রকৃতির কোলে।

এদের পরিচয় কিছু জানা না গেলেও জীনের অস্তিত্ব থেকে এটা বোঝা যায় যে এরা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ই বাসিন্দা। এরা ভারত, নেপাল, মায়ানমার বা চীন থেকে আগত যাত্রী। 
  

তথ্যসূত্র 

Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস