কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

 


রিয়া দাস






শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু,কৃত্তিবাস ওঝা এমন অনেক জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিদের জন্ম স্থান হল পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলা। এই জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগর। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নামানুসারে এই স্থানের নাম কৃষ্ণনগর। ১৭১০ সালে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ১৭২৮-১৭৮২ প্রায় ৫৪ বছর তিনি কৃষ্ণনগর তথা নদিয়ায় মহারাজা ছিলেন।আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে মহারাজা কৃষ্ণনগরে এক সুবিশাল রাজবাড়ী তৈরি করান।

                 জনশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি অন্নপূর্ণার পূজা করতেন। পরবর্তীকালে এই পরিবারে দুর্গোৎসব এর প্রচলন হয়। অতীতে এই জায়গার নাম ছিল'রেউই'। নদিয়া রাজপরিবারের শ্রেষ্ঠ পুরুষ রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজধানী ছিল কৃষ্ণনগর। রাজবাড়ীর পঙ্খ অলংকৃত দুর্গা দালানে অধিষ্ঠান রাজরাজেশ্বরী। এটাই রাজবাড়ির দুর্গার প্রচলিত নাম। দেবী দুর্গার সামনের দুটি হাত বড়, পিছনের আটটি হাত আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট। মাঝে থাকেন পঞ্চানন শিব। ফটকের গায়ে খোদাই করা কালী মায়ের স্তুতি অর্থাৎ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন শক্তির পূজারী। দেবীর বাহন ছিল পৌরাণিক সিংহ। আসলে তিনি ছিলেন শিল্পের পৃষ্ঠপোষক। এছাড়া মাথা উঁচিয়ে আছে কামানটি। যেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রতিপত্তির নিদর্শন।

দোল পূর্ণিমার পর দ্বিতীয় একাদশী তিথিতে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে এক বিশাল মেলা বসে। মেলাটি বারো দোলের মেলা নামে প্রখ্যাত। বরনারায়ন এর সাথে বারোটি কৃষ্ণমূর্তি সমন্বিত রাজবাড়ির মন্দির প্রাঙ্গন সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এই সময়। তাই এই মেলা'বারো দোলের মেলা'নামে পরিচিত। দোলযাত্রা ছাড়াও দুর্গাপূজা, ঝুলন উৎসব, জন্মাষ্টমী উৎসবসহ বিভিন্ন তিথি পূর্ব রীতি অনুযায়ী রাজবাড়িতে আজও সাড়ম্বরে পালিত হয়।দীর্ঘকালের প্রাচীন ও বিশাল মেলা হিসেবে এর প্রসিদ্ধি আছে।

 বাংলায় জগদ্ধাত্রী পুজো ও নবদ্বীপ ধামে শাক্ত রস প্রচলন কৃষ্ণচন্দ্র রায়েরই কৃতিত্ব।তিনিই ১৭৫৪ সালে প্রথম দেবীর স্বপ্নাদেশে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী প্রতিমার পূজার প্রচলন করেন। তীব্র রক্ষণশীল রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন শাক্ত পদাবলী কার রামপ্রসাদ সেন, অন্নদামঙ্গল কাব্য প্রণেতা ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর, বিদূষক গোপাল ভাঁড় প্রমুখ বাংলার প্রবাদপ্রতীম গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষক।

 যদিও ঠিক কোন সময়ে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু হয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র দুবার মুর্শিদাবাদের নবাবের হাতে বন্দী হন। প্রথমবার ১৭৫৪, মতান্তরে ১৭৫৬ সালে, দ্বিতীয়বার ১৭৬৩ বা ৬৪ সালে।

গবেষকদের মতে, প্রথমবার তিনি আলিবর্দীর হাতে বন্দী হয়েছিলেন। যদিও মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের উত্তরপুরুষ মনিশ চন্দ্র রায়ের মতে, রাজকর বকেয়া রাখার অজুহাতে সিরাজ তাঁকে বন্দী করে। তাঁর কথায়, সেই সময় ফারসিতে লেখা রাজসভার কার্যাবলী ও অন্যান্য ঘটনার বিবরণ এখনো তাদের কাছে পারিবারিক সূত্রে রক্ষিত রয়েছে, সেই বিবরণ অনুযায়ী, ১৭৫৬ সাল অর্থাৎ সিরাজী রাজত্বকালে কৃষ্ণচন্দ্র বন্দী হন।

 রাজীব লোচন মুখোপাধ্যায় তাঁর,' কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রম 'বইয়ে লিখেছেন, সিরাজের দুর্ব্যবহার ও ঔদ্ধত্যে অতিষ্ঠ হয়ে তৎকালীন বিভিন্ন প্রভাবশালী লোক কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে পরামর্শ চান। কৃষ্ণচন্দ্রের উপস্থিতিতেই সিরাজকে গদিচ্যুত করে মীরজাফরকে সিংহাসনে বসানোর ষড়যন্ত্র হয়। কাজেই কৃষ্ণচন্দ্র এবং সিরাজের মধ্যে দ্বৈরথের সম্ভাবনা একেবারে বাতিল করে দেওয়া যায় না।

আজও রাজবাড়ির প্রতিটি কোনায় লুকিয়ে আছে কত শত ইতিহাসের গল্প, আজও রাজবাড়ির প্রবেশপথে স্বমহিমায় দণ্ডায়মান তোরন  শত শত বছরের কত শত ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে আসছে, আজও প্রবেশদ্বারের মুখে অবস্থিত সুগভীর বড় কিংবা রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন আমবাগান ইতিহাস সচেতন মানুষের হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আজও কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির বুকে তৈরি হয় হাজারো নিত্য নতুন গল্প।কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্য সংস্কৃতি ইতিহাস সমৃদ্ধ সেই গল্প হার মানায় সহস্ত্র আরব্য রজনী কে। এর কোন অতীত নেই। নিজেই নিজের চির প্রবাহিত গল্প কথা।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টায় অনেক কিছুই। কিন্তু কৃষ্ণনগরের প্রতি উৎসব প্রবাহমান সময় কে যেন স্থির করে দেয় রাজ বাড়ির দরজায়।

 



তথ্যসূত্রঃ

১/নদীয়া জেলার পুরাকীর্তিঃ মোহিত রায়।

২/নদীয়া কাহিনীঃ কুমুদনাথ মল্লিক।

৩/আনন্দবাজার পত্রিকা।

 

 

লেখক পরিচিতি - রিয়া দাস রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্রী।বরাবরই  ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী।সাথে অবসর সময়ে কবিতা লিখতে ভালবাসেন। ইতিহাস নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। অতীতের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে মাঝে মাঝেই  বেরিয়ে পড়েন অতীত অনুসন্ধানে।রাজ্যের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ইতিহাস নিয়ে নানান গবেষণাধর্মী লেখা তিনি নিয়মিত ভাবে লিখে চলেছেন।     


Comments

  1. Hi, আমি আপনার লেখাটাকে ব্যাবহারকরতে পারি? মানে এর দ্বারা স্ক্রিপ্ট লিখে ইউটিউবর ভিডিওর জন্য প্রস্তুত করতে পারি?

    ReplyDelete
  2. Hi, আমি আপনার লেখাটাকে ব্যাবহারকরতে পারি? মানে এর দ্বারা স্ক্রিপ্ট লিখে ইউটিউবর ভিডিওর জন্য প্রস্তুত করতে পারি?

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস