বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি


 

 

প্রিয়াঙ্কা সরকার

 

 

 বাংলা সাহিত্য পড়লেই মনের ভিতরে উৎসুক হয় অন্ধকার যুগ, ওরফে  "বর্গি" লুঠপাট। সময়টা ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দ। ইতিহাস একটু লক্ষ্য করলে পাই, এই সময়টাতেই ইউরোপে  সাত বছর ব্যাপী যুদ্ধের প্রস্তুতিকাল।  তখন ইউরোপ জুড়ে গড়ে উঠেছে অস্থিরতা, আর বাংলা!  আলিবর্দি খান শাসিত বাংলা বিহার ও ওড়িশায় বর্গি আক্রমণে চরম বিপর্যয় । অত্যাচারের বেশ কিছু নথি ইউসুফ আলি খানে "তারিখ ই বাঙ্গালা ", কবি  ভারতচন্দ্র রায়ের " অন্নদামঙ্গলকাব্য ", গঙ্গারামের "মহারাষ্ট্রপুরাণ " কাব্যে পাওয়া যায়। এছাড়াও আরো অনেক প্রামাণ্য দলিল বর্তমান, যা  সাক্ষ্য রেখে যায় অবার্চীন আক্রমণের ফলিত ইতিহাস কান্না।

 আসুন দেখি ইতিহাস কি বলে! বাংলার রাজনৈতিক আকাশে তখন বুনো মেঘের আনা গোনা। ঠিক যেমনটা হেরে যাওয়া পটে ১৭৫৭ সাল ; বর্গি লুঠের দানা বাঁধা ইতিহাসে প্রলয়ের মহাকাল অভিশাপ। লুঠ মানেই ধর্ষণের হত্যা, হু হু শ্মশানের কান্নার জ্বালা জড়িয়ে বারাঙ্গনা আসর ;বাধ্য হয়েই পলায়ন কারী মনোভাবের ছায়াচিত্রে সেই সাহিত্যের চাপাকান্নার চিরাচরিতের  আসর,

 " ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে।

বুলবুলিতে ঘান খেয়েছে খাজনা দেব কীসে। " 

 

 কিন্তু শস্য শ্যামলা বাংলা এমন স্থান যেখানে মানুষ শিকড় গড়ে দেয় অযাচিতের হাত ধরেই। আর সে প্রমাণ ক্ষেত্রসমীক্ষায় উঠে আসে। যেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, এমন বর্গির লুঠের পরবর্তী অনেক মারাঠে সেনা নাকি মহারাষ্ট্রের মুখো হয়নি। আর এদের আবাসস্থলে  ইটাচুনা রাজবাড়ি গড়ে উঠেছিলো। এটা ভাবতে ভালো লাগে, লুঠ বা দ্বন্দ্ব শুধুই শেষ করে না, প্রতিষ্ঠাও করে। এমন করেই ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দ প্রতিষ্ঠিত হলো ইটাচুনা রাজবাড়ি,যা " বর্গি ডাঙ্গা " নামেও পরিচিত। 

 তথ্যসূত্র বলে  রাজবাড়ির পূর্বপুরুষ মারাঠা বর্গির কুন্দন নাকি আর মহারাষ্ট্রে ফিরে যান নি। বর্গিরা মীর হাবিবকে হত্যার পর আক্রমণ বন্ধ করে দেয়।তবে তারা যখন উড়িষ্যার উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেন, সেই নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করতেই   জীবনধারণের জন্য নিজস্ব  ব্যবসা শুরু করেন। তাঁরই বংশধর সাফল্যনারায়ণ কুন্ড। এদের সঙ্গে সম্পর্কিত কাটোয়ার কড়ুই গ্রামের কুন্ডর রাজবাড়ি। এই আক্রমণ নিয়েই গবেষণা অনেক তুঙ্গ।  উল্লেখ্য আচার্য যদুনাথ সরকারের " ফল অব দ্য মোগল এম্পায়ার "।

 উল্লেখ্য বইয়ের সাথে উপাদানের মেলবন্ধন যদি করতে চাই তবে দেখবো এই রাজবাড়ি, কিংবা বংশ পরম্পরার দ্বন্দের বাইরেও আছে লোকশ্রুতি, লোক ইতিহাস।  বাংলার বর্গিহানার করুণ পরিণতি হয়, কেতুগ্রামের বহুলাক্ষ্মী, নলহাটির নলাটেশ্বরী, বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা বাড়ি, কাটোয়ার ঝুপোকালী ইত্যাদি বহু দেব দেবীর নাম জড়িয়ে আছে৷ বহুলাক্ষ্মী, সতীপীঠের দেবীর ভৈরব " ভীরুক " বলে খ্যাত৷ কিন্তু, একতরফা বর্গিদের এই আক্রমণ জনসাধারণ মেনে নেয় নি। তারা তীব্র প্রতিবাদ করে৷ বর্গিরা সমষ্টির আক্রমণে ভয় পায় ও পালিয়ে যায়৷ হেতমপুরে বর্গি আক্রমণের শহিদ শেরিনা বিবির কথা লোকগাথায় বেশ বলিষ্ঠ ভাবে স্থান পেয়েছে৷

 ১৭০৭ সালে শেষ বিদায় নিলেন ঔরঙ্গজেব। তারপর মসনদে বসলেন মহম্মদ শা। বাদশাহের কন্যা শাহজাদী আমিনা, পিতার সেনাপতি ওসমানের প্রেমে পড়লেন। এদিকে পিতা ভাইপো হোসেন খানের সাথে আমিনার বিবাহ ঠিক করলেন। কিন্তু, একথা আমিনা মানতে নারাজ। তিনি সেনাপতি ওসমানের সাথে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে গেলেন। ঘুরতে ঘুরতে তারা হেতমপুরে এসে পৌঁছালো। তখন বীরভূমের অধিপতি হাতেম খান। তাঁর কোনো সন্তান জীবিত  না থাকায়, পিতার স্নেহে তাদের আশ্রয় দিলেন। কিন্তু ততোদিনে আমিনা ও ওসমান নাম পরিবর্তন করে ফেলে, শেরিনা বিবি ও  হাফেজ খানে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য এই হাতেমের নাম অনুসারে "হেতমপুর " গ্রামের নাম হয়েছে৷

 এরই মধ্যে ১৭৪২ সালে বাংলা বর্গি লুঠরাজের আক্রমণে অস্থির। মৃত্যুকালে সব সম্পত্তি শেরিনা বিবি ও হাফেজের নামে লিখে দেওয়ায়, তারাই কর্তৃত্ব করতে থাকে। এদিকে গোপনে আমিনা পিতার ভাইপো হোসেন খান সন্ন্যাসী ছদ্মবেশে আমিনা খোঁজ পেয়ে, বর্গিদের হাতে হাত মিলিয়ে হেতমপুর আক্রমণ করে৷ হাফেজ যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ দেয় এবং শেরিনা বীরাঙ্গনার মতো লড়াই শুরু করে। সামনে প্রণয়প্রার্থী হোসেনকে দেখে শিশুপুত্র সহ ছাদ থেকে দীধির জলে ঝাঁপ দেয় শেরিনা। মৃত্যুতে একটা অধ্যায় শেষ হয়। জনশ্রুতিতে আজও মানুষ বর্গিদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া বীরাঙ্গনার মৃত্যুতে সতী শেরিনার সমাধিকে ঈশ্বরের মতো শ্রদ্ধা করে। 

আলিবর্দি খাঁ - এর প্রকৃত নাম মির্জা মুহম্মদ আলি। মুঘল দরবার তাঁকে "খান " উপাধি দেয়। বংশ পরিচয় বলে, আলিবর্দি খাঁ এর মা ইরানের খোরাসানের এক তুর্কি উপজাতি  থেকে এসেছিলেন ; তাঁর পিতামহ ছিলেন ঔরঙ্গজেবের সৎ ভাই। ঔরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র আজম শাহে তাঁকে পূর্ণবয়স্ক হবার সাথে সাথেই পিলখানার পরিচালক হিসাবে নিয়োগ করেন৷ ১৭০৭ ইতিহাসের এক ইন্দ্রপতন, সাথে পরিবারগত বিবাদের পুনরাবৃত্তি বলা  যেতে পারে। কিন্তু বিবাদের যে ফলশ্রুতি তা নঞর্থক।  আজম শাহের মৃত্যুর পর একপ্রকার ফাঁকা হাতেই আলিবর্দি ভাগ্যান্বেষনে বেরিয়ে পড়েন। ১৭২০ সালে তিনি সপরিবারে বাংলায় চলে আসেন। কিন্তু প্রাথমিকে নবাব মুর্শিদকুলি  খাঁ তাঁকে পাত্তা দেন নি। অধিক চেষ্টা সত্ত্বেও আলিবর্দি একপ্রকার নিরাশ হয়েই ফিরে আসেন৷ কিন্তু এক দরজা বন্ধ হলে আরো এক দরজা খুলে যায়। মির্জা মুহম্মদ আলী, মুর্শিদ কুলি খাঁর জামাতা সুজাউদ্দিনের আত্মীয় থাকায়, তাঁকে সম্মান সঙ্গে গ্রহণ করেন।আলিবর্দি খাঁ কে তিনি রাজস্ব বিভাগে ১০০ টাকার বেতনে  কাজ দেন৷  এতে মুর্শিদকুলি খাঁ চরম অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন, কিন্তু ধীরে ধীরে সুজাউদ্দিনের বিশ্বাসের আকর হয়ে ওঠেন। সুজাউদ্দিন, তাঁকে উড়িষ্যার কিছু জমিদারি তদারকি করতে দেন।  এককথায় তৎকালীন সময়ে উড়িষ্যায় শান্তি শৃঙ্খলা স্থাপন করতে আলিবর্দি ভূমিকা অপরিসীম।

 

মুর্শিদকুলি খাঁ, একপ্রকার ভালোবাসা বশত সরফরাজকে সিংহাসন দেবার প্রতিশ্রুতি দেন৷ কিন্তু সুজাউদ্দিন জানতেন যে সরফরাজ অকর্ম ন্য। তাই তাঁকে সিংহাসনে বসিয়ে  সে ভুল করতে তিনি নারাজ। আলিবর্দি খুব নাটকীয় ভাবেই এই কাজে সরফরাজ কে ঘনিষ্ঠ আমলা দিয়ে বুঝিয়ে সুজাউদ্দিনকেই নবাবী পদ দিলেন। কিন্তু এখানে আলিবর্দি জানতেন, যে, তিনি সরফরাজকে আজ সরিয়ে দিলে , তিনি নিজেই সুজাউদ্দিনের প্রিয়তম হয়ে উঠবেন৷ ততদিনে মাটি শক্ত হলে সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর অকর্মন্য সরফরাজকে সরাতে তাঁর বেশী দিন লাগবে না। আর এই সুযোগে তিনি বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত হলেন৷ ইতিহাস তাঁর এই আশায় জল ঢালে নি; কারণ সত্যিই সুজাউদ্দিনের পর তিনিই ১৭৪০ খ্রীস্টাব্দে বাংলার নবাব হলেন।শ্রদ্ধেয় স্বপন কুমার ঠাকুর তাঁর  তথ্যসূত্রে  উল্লেখ্য করেছেন,   "গিরিয়ার প্রথমযুদ্ধের গ্রাম্যকবিতা " মুর্শিদাবাদ কাহিনি, নিখিলনাথ রায়,

 

" মারামারি লেগে গেল গিরিয়ার ময়দানে।

কান্দে বাঙলার সুবাদার হাপুস নয়নে।।" 

 

 বাংলার বুকে যে অসন্তোষের তুষ জ্বলে ওঠে, তা ক্রমান্বয়ে আলিবর্দির সময় তুঙ্গ হয়ে ওঠে৷ এ এক নিরবচ্ছিন্ন অরাজকতা তখন; তদানীন্তন কালে বঙ্গে নতুন উৎপাত হলো, মহারাষ্ট্রীয়দের বাংলায় আসার সঙ্গে সঙ্গে ভোঁসলা রাজার দেওয়ান ভাস্কর রাওয়ের নেতৃত্বে চল্লিশ হাজার আশ্বারোহী সৈন্য মেদিনীপুর, বর্ধমান, বাঁকুড়া বিবিধ স্থানে এসে উপস্থিত হলো। কিন্তু আলিবর্দি এসেই কি করলেন!  স্বজনপোষণ!  নাকি বিস্তার!  ভগ্নিপতি মীরজাফরকে দিলেন মিরবক্সে পদ, তিন কন্যার বিবাহ ও জামাতা নোয়াজেস পেলেন  ঢাকার শাসনকর্তার পদ  আর যে উড়িষ্যায় নিজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সুজাউদ্দিনের সাহায্যে, আজ সেই উড়িষ্যাকে দিলেন সৌলদজঙ্গকে। কিন্তু সুজাউদ্দিনের জামাই রুস্তম জঙ উড়িষ্যাকে ছাড়তে রাজী হলেও, বেগম দুর্দানা ও জামাতা বাকর আলির চাপে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। সময়টা ১৭৪১ খ্রীস্টাব্দ, কটকের ফুলবাড়ি যুদ্ধে আলিবর্দি জিতে গেলেন৷ তারপর কয়েক মাসের মধ্যেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পেলো এবং তিনি এই বাংলায় ফিরে এলেন। "অন্নদামঙ্গল " কাব্যে এ কথা স্পষ্ট ভাবে স্থান, কাল ধরে লেখা আছে। কিন্তু,  কবি ভারতচন্দ্র বিধর্মীদের যথেচ্ছাচারকেই বর্গিহাঙ্গামার মূল কারণ দেখিয়েছেন৷ "মহারাষ্ট্র পুরাণ " নামে কাব্যে কবি গঙ্গারাম লেখেন,

 "মঠ ঘেরিয়া বরগী দেয় তবে সাড়া।

সোনা রূপা লুটে নে এ আর সব ছাড়া।। "

 

তখন মুর্শিদাবাদ অরক্ষিত।  সাধরণ মানুষ কেবল নয়, জগৎ শেঠের মতো ব্যক্তি ধনরত্ন নিয়ে ঢাকায় চলে যেতে বাধ্য হন। সাময়িকে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র কৃষ্ণনগর ত্যাগ করে ইছামতীর তীরে বসতি গড়েন।শ্রদ্ধেয়  যদুনাথ সরকার এই মারাঠা আক্রমণকে "passing blost " বলেছেন। মুর্শিদাবাদে যখন আলিবর্দি পৌঁছান, তখন বর্গিরা বীরভূম জেলাকে রেখে বর্ধমানের দিকে অগ্রসর হয়। সাথে সাথে আলিবর্দিও বর্ধমানের রাণিসায়রের পাড়ে এসে তাঁবু খাটালেন। এই দিঘি ১৭০৯ সালে রাজা কীর্তিচন্দ্র রায়ের মাতা ব্রজকিশোরীদেবী খনন করেছিলেন৷ তাঁর স্বামীও স্নান করতে করতে এই জলেই আততায়ীর হাতে হত্যা হন৷ তারপর নিষিদ্ধের বেড়া ডিঙিয়ে ছয় বছর পর এই দিঘি কাটানো হয়৷ ১৭৪২সালে ১৬ ই এপ্রিল মারাঠা বর্গিরা এই রানিসায়রকে ঘিরে ফেলে। আতঙ্কগ্রস্থ বাসীন্দাররা তখন বর্ধমান ছাড়ে। নবাবি সৈনদের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে উঠেছিল।  চরম খাদ্যাভাব এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলো যে, শুধুমাত্র কলার এঁটে সেদ্ধ খেয়ে খেয়ে তাঁরা বেঁচে ছিলো। নবাব আলিবর্দি তখন বাধ্য হয়ে ভাস্কর পণ্ডিতের মত নেন। একপ্রকার অর্থের রাজনীতিতে কূটকৌশল নিয়েই দুর্ভেদ্য জাল ভেদ করেন কাটোয়ার পথে যাত্রা করেন।

 বর্ধমানের উপর বর্গির করাল গ্রাস তো ছক কষা মহাভারত। অর্থের জটিল রাজনীতি জুড়ে তখন নবাব বাহিনী বিস্তৃতি ছেড়ে প্রাণে বাঁচতেই তৎপর। এঁটে সেদ্ধ খেয়ে কয়দিনই বা অস্তিত্বের লড়াই লড়া যায়!  তাই ১৭ ক্রোশ  দূরত্বে কাটোয়ায় নবাব যাত্রা করলেন। বড়ো সন্তর্পণে তৎপরতা সেই পথে ; শ্লথ গতিতে সৈন্যেরা সড়কপথে এগিয়ে চলল৷ আসলে বিপদের মুখে পড়লে,  প্রতি বর্গে যেন ভয় ব্যক্তিসত্ত্বা হয়ে যুদ্ধ করে৷ সূর্য পূর্ব পশ্চিমের পটে এমনটাই অকাল  যুদ্ধ নিয়ে অপেক্ষা করছে। রাস্তাটা ক্ষীণ আলোয় প্রতিকূলের চেহারায় বর্গি নামক দস্যুর ভীতি ছাড়িয়ে এগোতেই তো চাইছে - বলছে আর মনে হয় ভয় নেই, এবার " মাভৈ " সাথ;

 

কাটোয়া মহকুমার  নিজস্ব নদী ব্রহ্মাণী। মঙ্গলকোটের কালিপাহাড়ি গ্রাম হলো উৎসভূমি এবং গঙ্গা হলো মিলিত স্থল। কথিত আছে কাটোয়ার চাণ্ডুলী গ্রামে তিন বোনের পুজো হয়৷ ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষের শনিবারে ",বাঁইচিলি " অনুষ্ঠান হয়। বাঁইচিলি" কথার অর্থ " দেবদেবীর নৌকাভ্রমণ '।এই গ্রামের মজুমদার বংশের ব্রাহ্মণরা দুইবোনকে মালা দিয়ে সাজিয়ে ভট্টাচার্য্য বাড়ির এক বোনের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এই অনুষ্ঠানে বৃত্তাকার ৬ পাক বেষ্টন এবং সান্ধ্যপ্রদীপ প্রজ্জ্বলন উৎসবের অংশ।

তথ্যসূত্র বলে, এই নদীর কাছে পৌঁছাতে নবাবের  সৈন্যবাহিনীর উপর বর্গিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে৷

 

বর্গির ধ্বংসাত্মক লুঠ গ্রাস করলো নবাব সৈন্য সহ সাধারণ মানুষকে। আত্মসম্ভ্রম সহ মান ও ব্যস্ত জীবনের মর্যাদা রক্ষা দায় হয়ে উঠল। কিন্তু যাদের উপর নবাবের অগাধ বিশ্বাস, সেই আফগানেরা কি সাহায্য করেছিলো!  নাকি মীরজাফরের মতো তারাও স্থির হয়ে ছিলো। এ যেন সেই জগৎ শেঠের ক্ষোভ,  যেন ঘসেটির প্রত্যাশার বুকে জল ঢেলে তুষানল প্রজ্জ্বলন।। স্থবির আজ তারা; তথ্যসূত্র  " মহারাষ্ট্রপুরাণ " বলে এই স্থানটির নাম ' নিগনসরাই "। কিন্তু কেমন ছিলো নিগনসরাইয়ের যুদ্ধ!

" ভালো ভালো স্ত্রীলোক যত ধইরা লইয়া জাত্র।

আঙ্গুষ্ঠে দড়ি বাঁধি দেয় তার গলাত্র।

একজন ছাড়ে তারে আর জনা ধরে।

রমণের ভরে ত্রাহি শব্দ করে।। "

 

এই নিগন সরাই আসলে শিমুলিয়া মৌজার অন্তর্গত। এইখানেই ছিলো মোগলদের সরাইখানা।  ঘটনার সাথে হাতে হাত রেখে নতুন ইতিহাস নেবে এটাই তো প্রাপ্তি। নবাব চাইলেন ভাস্করের আক্রমণের প্রস্তুতি। কিন্তু নিগম সরাইয়ের মাঠে ভাস্করের সন্ধি আলিবর্দির অপমানে লাগে। আসে মুর্শিদাবাদ থেকে প্রচুর সৈন্যদল আর খাদ্যেরসদের ভিড়।ভাস্কর দাঁইহাট থেকে পিছনে হঠতে থাকে। একটা সময়ে তো ভাস্কর চেয়েছিলেন, তিনি ফিরে যাবেন,  কিন্তু বাদ সাধলেন মিরহাবিব। তাঁর সাহায্যেই জগৎশেঠের বাড়ি থেকে লুঠ হয় বহু মূল্যবান দ্রব্য ও দুকোটি টাকা। একসময় বর্ধমান রাজাদের গঙ্গা নিবাস, মানিক চাঁদের বাড়ি সবটুকু বর্গিদের কবলে চলে যায়। ইন্দ্রাণীর জমিদার ভয়ে  কম্পমান। এবার একদিকে হুগলী আর আরো একদিকে নদিয়া মুর্শিদাবাদের গ্রাম গঞ্জ লুঠ হলো। উল্লেখ্য বর্ধমানের চিত্রসেন ভয়ে লুকিয়ে গেলেন। অভিশাপ ও শয়তানের রাজত্বে তখন কেবল ধর্ষণ,  আর একাধিপত্যের অগ্রাধিকার।  তবে নিগন সরাইয়ে মির হাবিব এক খল চরিত্রের নাম।

 

১৭৪২ সালে একবারে গোড়ার দিক তখন। প্রবল বৃষ্টিপাত এবং প্রকৃতির আক্রমণে ভাস্কর পণ্ডিত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। কারণ লাভে  চৌথ তো শূন্য, তাই কিই বা পাওয়া যাবে। কিন্তু মুর্শিদাবাদ থেকে প্রচুর বাহিনী আসছে নিত্য, তাই অসংরক্ষিত তখন টাকার খনি মুর্শিদাবাদ।  মির হাবিব বললেন এইটাই তো সুযোগ; অকর্মণ্যতা আর ভীরুতাকে কাজে লাগিয়ে মির হাবিব ৭০০ অশ্বারোহী বর্গি সেনা কে গোপনে মুর্শিদাবাদে পাঠায়। শুরু হলো লুঠপাঠ। দাহাপাড়া তখন বিখ্যাত জনপদ। আক্রান্ত হলো হাজিগঙ্গা, ইচ্ছাগঞ্জ।  কারণ মির হাবিবের ভাই ছিলেন খোদ মুর্শিদাবাদে ;বাধা দেবার তো কেউ নেই সেখানে ; তাই লুঠ হলো সরফরাজ খাঁর জামাতা মুরাদ আলি খাঁ, দুর্লভ রায়, মির সুজাউদ্দিনের বাড়ি; তথ্যসূত্র অনুসারে বর্গিরা সারাদিন লুঠ করার পর দাহাপাড়ার কীরেটেশ্বরের মন্দিরে আশ্রয় নিতো।

 

 এবার নবাবের কানে গেলো সে কথা ; তিনি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। ততদিন গোপন লুঠে ভাস্কর যা পাবার তা ভরে নিয়েছেন দুই হাতে । তিনি নবাবের আসার খবর শুনেই দাঁইহাটা ছাড়বেন মনস্থির করলেন। এদিকে মির হাবির জানলেন, ভাস্কর মহারাষ্ট্রের পথে যাচ্ছেন। কিন্তু লুঠপাটের জিনিস! একক আধিপত্য!  প্রাথমিকে ভাস্করকে আঘাত করে বীরভূম শিবিরে সব লুণ্ঠিত সম্পদ হাতে নিলেন। মির হাবিব তো চান নি যে,  ভাস্কর পন্ডিত ফিরে যান;  তাই ভাস্কর পণ্ডিতকে আটকে দিলেন। আবার ফিরে এলেন দাঁইহাটায়। খল চরিত্র মির হাবিব এবার সার্থক হলেন৷।

 

"বর্গি " কি শুধুই এক নাম!  হ্যাঁ, এক সেনাবাহিনীর নাম ; মারাঠি শব্দ " বার্গির " অপভ্রংশ;  মূলে আছে "বরচ" শব্দ,অর্থ " বল্লম নামক অস্ত্র "; অভিযানের সময় এদের গায়ে থাকতো সাত হাত লম্বা এক কম্বল ও হাতে একটি  বল্লম। এরা ছিলো মহারাষ্ট্রের

 ধনগর বা ধেনুগর বা  গোয়ালা জাতির শাখা। বলা হয় যে, শিবাজীর অধিকাংশ সেনাদল এই গোষ্ঠী থেকেই নেওয়া। তাই এদের ঘোড়া ও অস্ত্র নবাবকেই মেটাতে হতো। তথ্যসূত্র বলে, এরা হঠকর, যাধে ও খুটে এই তিনভাগে বিভক্ত ছিলো; হঠকর ধেনুগরেরা ছিলো যোদ্ধা জাতি ; যাধে ধেনুগরেদের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না, আর খুটে ধেনুগরেরা ছিলো তাঁতি সম্প্রদায় ভুক্ত। এদের অনুচিত হঠকারী সিদ্ধান্তে নবাব পর্যন্ত নিরুপায় ছিলেন। এরা ছিলো রুক্ষমূর্তি,  কাম রসে অশ্লীলতার একনিষ্ট প্রতিনিধি৷ কিন্তু কোথাও এরা প্রভুভক্ত ও রাজপুত জনজাতির এক শাখা বলা যায়।

 

আইন - ই - আকবরিতে এদের জেদ, হঠকারী ভাবনার সম্যক প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়৷ তথ্যসূত্র অনুসারে প্রাচীন ও মধ্যযুগে এরাই যোদ্ধা হিসাবে নিযুক্ত হতো৷ এমনই এক নাম দত্তবরটিয়া ; বসবাসের সূত্র ধরেই এদের পরিচিতি গ্রামের নাম অনুসারে বিধিবদ্ধ আছে। আসলে ইতিহাস তো এমন করেই রেখে যায় নাম। সম্পর্কের সূত্র ধরে চিনে নিতে হয়, পশ্চাতে থাকে নামকরণের প্রেক্ষাপট৷ এই বর্গিরা শিবের ভক্ত ছিলো। মুখে থাকতো " হর, হর " নাম। এদেরও কবর দেওয়াই রীতি ছিলো। পদ্মাসনে বসিয়ে মুখে সোনা দিয়ে, অনেকটা এখনকার মতো করেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হতো। কারণ বর্তমানেও কোনো মৃত মানুষের কাজে গীতার সাথে  পুরোহিতকে সোনা, রুপোর কুচি দেওয়াই, রীতি।

 

নিছক সত্য আলাপন করতে গেলে অষ্টাদশ শতকের বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কারের কথা উল্লেখ করতেই হয়। তিনি ছিলেন নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের  সভাপণ্ডিত। কিন্তু অকস্মাৎ  তিনি রাজা  কৃষ্ণচন্দ্রের

 বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন।সেইমূহুর্তে সুজাউদ্দিনের মতোই চিত্রসেন তাঁর জীবনে এক অন্য মাত্রা নিয়ে আসেন। তাঁরই আদেশে ১৭৪৪ সালে " চিত্রচম্পূ " লেখেন৷ এ যেন আলিবর্দির জীবনে পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ে। মুর্শিদকুলির ক্রোধ সত্ত্বেও আলিবর্দি, শাসন নিজের হাতে সময়ের যথোপযুক্ত ব্যবহারে তুলে নিতে সক্ষম হন; আর এখানে বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার,  আবার কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে ফিরে গেলেও, পরে অবশ্য তিনি কলকাতার নবকৃষ্ণের কাছে আশ্রয় নেন৷

 

 ওয়ারেন হেস্টিংস যে ১১ জন পন্ডিতের সহায়তায় বিবাদার্ণবসেতু " নামে ধর্মশাস্ত্রসংগ্রহ রচনা, সেখানে

বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কারের নাম উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে যান। তথ্যসূত্র বলে, এটাই নাকি তৎকালীনে সুপ্রিম কোর্টের একমাত্র আইনগ্রন্থ।  শূন্যপুরাণের ধর্মীয় তত্ত্বের আকর গ্রন্থ ও গদ্য পদ্য মিশ্রিত চম্পূ কাব্য।

এখানে  মুসলমানদের জাজপুর প্রবেশ উল্লেখ আছে। গ্রন্থটি ২৫ টি অধ্যায় বিশিষ্ট।  এই সূত্রে বলতেই হয় যে,  শূন্যপুরাণে  বৌদ্ধদের শূন্যবাদ ও হিন্দু লৌকিক ধর্মের  মিশ্রণ চোখে পড়ার মতো। "চিত্রচম্পূ" তে কবির ভাষায় পাওয়া যায়,

 

" সংগ্রামে সমুপস্থিতে সুনিভৃতং দেশান্তরে সুদ্রুতং

ধাবন্ত্যদ্ভুতবেগবাজিনিবিহো যেষাং প্রধানং বলম। "

 

এছাড়াও শ্রদ্ধেয় সুপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইতিহাসাশ্রিত কবিতায় বর্গিদের সম্যক ছবি ফুটে ওঠে।।

 

তথ্যসূত্রানুসারে, "মহারাষ্ট্রপুরাণে "  ভাস্কর পণ্ডিতের অধীনে ২৩ জন মারাঠা সেনাপতির নামের তালিকা আমরা পেয়ে থাকি। তাঁদের মধ্যে ধামধরমা, হিরামন কাসি, গঙ্গাজি আমোড়া, সিমন্ত যোশী, বালাজি, সেবাজি কোহড়া, শম্ভুজি, কেসজি আমোড়া, কেসরি সিংহ ও মোহন সিংহ  সম্পদ লুঠে নেতৃত্ব দিত। বালা রাও, শেস রাও, আরসিস পন্ডিত, সেমন্ত সেওড়া, হিরামন পণ্ডিত, মোহন রাত্র,পিত রাত্র, সিসো পন্ডিত, শিবাজি, সামাজি, ফেরঙ্গ রাত্র, সুনতান খাঁ,ভাস্কর পণ্ডিত ছিলেন যুদ্ধকর্মে ব্যস্ত। এছাড়া রণনিপুণ আলিভাই কারাওল এর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য। এছাড়াও " বর্গি হাঙ্গামা " প্রবন্ধে ২০ জন বর্গি সর্দারের নামোল্লেখ বিদ্যমান৷ উল্লেখ্য যে ভাস্কর সহ সকল সেনাপতি আলিবর্দির হাতে নিহত হয়।

 

এদের নৃশংহ আঘাত চোখে পড়ার মতো। তরোয়ালের আঘাতে অনেকেই নিহত হতো। মানুষের টাকা পয়সা, সম্পত্তি কেড়ে নিঃস্ব করতো এই বর্গিরা ।এরা অঙ্গচ্ছেদ করতে সিদ্ধ হস্ত ছিলো। মানুষের নাক, কান, হাত, পা কেটে দিতো। প্রয়োজনে বুকের উপর চলতো তলোয়ারের আঘাত। এরা গ্রামের মানুষদের ভালো করে বেঁধে, জুতো সহকারে লাথি মারতো। এতেও যদি মানুষ তার সর্বস্ব না দিতো, তখন পুকুরের ডুবিয়ে হত্যা করা হতো। তথ্যসূত্র বলে, রঘুজি ভোঁসলে যখন দুর্লভরামকে গ্রেফতার করে, তখন ২০০ জনকে বন্দি করে নাক, কান, কেটে দেওয়া হয়েছিলো। আসলে নবাব আলিবর্দির কাছ থেকে বালাজি রাও ২২ লাখ টাকা পেলেও রঘুজি রাও কিছুই দেন নি। শিশু, ব্রহ্মণ, গর্ভবতী নারীও  এদের হাত থেকে রক্ষা পায় নি। এরা গণধর্ষণ করতো। সুন্দরী মেয়েদের কেবল ধর্ষণ নয়, গলায় ফাঁস দিয়ে দুই হাত বেঁধে দিতো। আর তাতেই স্ত্রীরা ফাঁস আটকে মারা যেতো।

 

১৬৮৩ সাল ছিলো ভয়াবহ৷ ১৬৮২ খ্রীঃ দ্বিতীয় বীর সংহের পর তাঁর পুত্র মল্লরাজ্যের সিংহসন আরোহন করেন।ঠিক এক বছর পর বর্গিরা গোয়া আক্রমণ করে।এদের উন্মাদগ্রস্থ যৌনসংগমের নেশায় নিজেদের স্থান ছেড়ে পালাতে থাকে। কোনো কোনো মহিলা ধর্ষণে বাধা দিলে তাদের স্তন তরোয়ালের আঘাতে কেটে নেওয়া হতো। ভারতচন্দ্রের " অন্নদামঙ্গল " কাব্যে এই ভয়াবহতার উল্লেখ পাওয়া যায়।

" লুটি বাঙ্গালার লোকে করিল কাঙ্গাল।

গঙ্গার পার হইলো বান্ধি নৌকার জাঙ্গাল।।

কাটিল বিস্তর লোক গ্রাম গ্রাম পুড়ি।

লুটিয়া লইলো ধন ঝিয়ড়ি বহুড়ী।। " এমন উল্লেখ পাওয়া যায় যে, বর্গির আক্রমণে কেতুগ্রামের উদ্ধারণপুরে এক পুরো পরিবার ভুল সংকেতবহ করে নিজের ভৃত্যকে হারায় ও নিজেরা

পাতালঘরেই মারা যান। অনেকেই এদের অত্যাচার ও ভয়াবহতার সাথে মগ ফিরিঙ্গিদের তুলনা করে৷ তবে মগেরা ছিলো জলদস্যু। এরা দাস করে হাটে বিক্রি করতো, অর্থাৎ মানুষ ছিলো এদের কাছে পশরা স্বরূপ৷ সাহিত্য ও ইতিহাসের খাতায় ভয়বহতা বলতে এই  বর্গি আক্রমণ এক এবং অদ্বিতীয় বর্বরোচিত হিসাবেই চিহ্নিত।

 

ইতিহাস পরম্পরার কথা বলে; নিরন্তর জীবনে সূর্য উদয় যে প্রকট থেকে প্রকট হয়, একথা মানা গেলেও, তার স্থায়িত্ব যে চির অমলিন একথা বলাটা নেহাতই অমূলক। কারণ সৃষ্টির সাথে লয় জড়িয়ে আছে জীবন।তাই ভাস্কর পণ্ডিতের স্থায়িত্ব বিলীন হলো অনায়াসে। বর্গিরা বর্ধমান, হুগলী, মেদিনীপুর, নারায়ণগড় পেরিয়ে এবার নবাব বাহিনীর চাপে ওড়িষ্যার  চিল্কা হ্রদে আস্তানা গেড়ে বসলো। নবাব আলিবর্দি খাঁ, মুর্শিদাবাদে ফিরে এলেন।  কিন্তু সুখ যে অসুখের আবাসস্থল, তাই মহাসংকট যেন আলিবর্দির জীবন ছেড়ে যেতেও চাইলো না।

 

 নবাবের চিঠি গেলো মহম্মদ শাহ ও মারাঠা শাহুর কাছে।  সফদর জঙ্গ এর হাতে  ভার পড়লো বিহার ; এবার গোদের উপর বিষ ফোঁড়া; পারসিক সেনারা এসে উপস্থিত হলো । কোথায় লাগে বর্গি, পারসিক সেনারা ছাড়িয়ে গেলো বর্গিদের ; নবাব জানালেন মুর্শিদাবাদে সফদরকে তাঁর লাগবে না ; এদিকে বালাজি বাজীরাও ৫০,০০০ বর্গিসেনা নিয়ে পাটনা আক্রমণ করলেন। এই সেনা আবার অস্বাভাবিক নারী লোলুপ। তারপর লুঠপাট আর হত্যা তো দোসর তাদের; ভাস্করের দলবল চিল্কা থেকে

ভগ্নমনোরথে ফিরে নাগপুর আক্রমণ করে। এবার রঘুজি ভোঁসলে,  অপমানে আবার আক্রমণে মন -  প্রাণ নিমর্জিত করলেন;

 

আলিবর্দি বিচক্ষণ মানুষ। দ্রুত সাক্ষাতে এলেন গঙ্গাধর রাও ও অমৃত রাও। দুইপক্ষের সাথে সমঝোতা ছাড়া আর উপায় কি!  উপঢৌকনের  বিনিময়ে পদ হস্তান্তর, এতো ইতিহাসে একবার নয়!  নবাবও তাই করলেন। ৪ টি হাতি, ২ টি মোষ, ৫ টি ঘোড়া দিলেন বালাজিকে। আর এবার যে বর্গিহানা রোখা যাবে, তা নবাব বুঝেছিলেন। "সবে মিলে করি কাজ, হারি জিতে নাহি লাজ৷ " তাই তো পতনের ডঙ্কা বাজলো সেইদিন বর্গিদের। এদিকে রাজকোষে তখন মহাটান। মাঝখান থেকে রঘুজি বালাজির সাথে মিটমাট করে নিলেন। ভাস্কর পণ্ডিত তখন ময়দানে একা। রক্তের হোলি খেলা শুরু এবার। আলিবর্দির মাথা নত করতে বর্গিরা লুঠপাট, ধর্ষণ বাড়িয়ে দিলো। চারিদিকে আতঙ্ক, সন্ত্রাস, ভয়াবহ হানায় সাধু  সন্ন্যাসী কেউ রেহাই পেলেন না৷ আলিবর্দি অবাক  হলেন। কারণ তিনি তো উপঢৌকনে আদায় করেছিলেন প্রতিশ্রুতি, কি পেলেন!  আবার বালাজি ও ভাস্কর এক হয়ে গেলেন। আলিবর্দি কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। কারণ আর নয়!  বিপর্যয়ে  এবার মুস্তাফার সাহায্যে মারাঠা সেনাপতি কারিওয়েলকে হস্তগত করলেন। শুরু হলো সন্ধির প্রস্তাব৷

 

এবার বলবো দিগনগরের কথা ; এই স্থান কি বর্গি হানার সাথে যুক্ত!  কেন বিখ্যাত এই দিগনগর৷ এইস্থানেই নাকি ভাস্করের সাথে নবাবের সন্ধি হয়েছিলো। আসুন!  একটু বিস্তৃত করে বলি ; কিংবদন্তি বলে যে, পূর্ব বর্ধমানের বিস্মৃত মানচিত্র ধরে আছে দিগনগর গ্রামের চাঁদনি,একটি জলটুঙি

।সময়টা ১৭১০ ; কীর্তিচন্দ্র চতুর্দিক বাঁধানো জলাশয়ের মাঝেই ভবন তৈরি করলেন৷ কিংবদন্তি বলে, বর্ধমান ছিলো দিল্লীর সম্রাটদের একান্ত  নিরাপদ আশ্রয়। তাই তো প্রিয় ঘরে গড়ে উঠেছে পীর, ওলি,আওলিয়াদের মাজার, মসজিদ, পুকুর ইত্যাদি৷  বিবিধ প্রান্তের মন্দির ও মসজিদের কারুকার্য বর্ধমানের স্থাপত্যকে সম্বৃদ্ধ করে। আসলে মোঘল আমলে বর্ধমানকে বলা হতো সম্ভ্রান্তদের বাসস্থান৷ উল্লেখ্য যে আইন - ই - আকবরী অনুসারে  সমগ্র বাংলা ১৯ টি সরকারে বিভক্ত করা হয়েছিলো। তার মধ্যে বর্ধমানের উল্লেখ আছে।

 

শাহাজাহান, শেরশাহ, নূরজাহান থেকে আজিম - উস - সান -ই বর্ধমানে এসেছিলেন। তথ্য বলছে বর্ধমানের পুরাতন চকের খোক্কর সাহেবের মাজারের কাছে কালো মসজিদ শেরশাহ ৯৫০ হিজরিতে তৈরি করেন। তথ্য বলে যে, এই জলটুঙিতে মেহফিল বসতো৷ চাঁদনির ছাদ, নৈশবাসর, অনেকটা অতীতে ফিরিয়ে দেয় আমাদের। এখন সেই ইতিহাস প্রেত ছায়া ছাড়া আর কিছুই নয়। এই দিগনগরের পুরাসম্পদ পার্বতী মূর্তি, আসলে অমরাগড়ের রাজবংশের কুলদেবী। এই দেবীমূর্তি বর্গিরা হরণ করে নিয়ে যায়। শোনা যায় ভাস্কর সময়পেলেই এই দিগনগরে পার্বতী আর চামুন্ডার পুজো দিতেন৷

এখানেই নাকি ভাস্কর জানতে পারেন যে, আলিবর্দি সন্ধি পিয়াসী। কিন্তু যার রক্তে ধূর্ততা আর বিশ্বাসঘাতকতা, তাকে তো আর স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে মেনে নেওয়া যায় না। কারণ কাক সবার মাংস খায়, কিন্তু কাকের মাংসের খেলেই কাক, কা - কা করে।

 

 এবার ভাস্করের বিশ্বাস লাভ করতে গঙ্গাজল ও তুলসীপাতা দিয়েই শপথ করানো হয়৷ এরপর সন্ধি হয় যে, উভয় পক্ষ নিরস্ত্র থাকবে৷ এতো গেলো ঘোষণা,  এবার সন্ধির সভা স্থান হলো

মানকরা গ্রাম৷ সেখানেই তৈরি হলো একাধিক বাহারি পটমন্ডপ। চারপাশে সুচতুর কৌশলে ডবল কানাত দিয়ে দেওয়াল তৈরি হলো। সেখানে লুকিয়ে রাখা হলো নবাব সৈন্যদের। এই হলো আলিবর্দি ; যতই গালিচা পেতে রাস্তা হোক, তাঁবু হোক, কিন্তু আলিবর্দি তো বশ্যতা স্বীকার করবেন না৷ ভাস্করের সঙ্গে এলো ২১ জন সেনাপতি৷ ভাস্কর জানতেন, যে আলিবর্দির উপর বিশ্বাস রাখা মানে অতিরিক্ত বিশ্বাসে খাল কেটে কুমীর আনা। তবুও বিশ্বাস করলেন, রয়ে গেলেন পলাশির বর্গিঘাঁটিতে৷ পলাশি থেকে ভাস্করের দূরত্ব ১৮- ২০ কিমি ; রঘুজি গাইকোয়েড বললেন, তাঁর শরীর খারাপ। কারণ অজুহাত ছাড়া তখন তাঁর মন আর কিছুতেই সায় দিচ্ছিলো না। ভাস্কর এলেন পটমন্ডপে। সাদর অভ্যর্থনা দিলেন মুস্তাফা খাঁ ও জানকীরাম।  তারপরে একটু গুছিয়ে নিতেই নবাব আলিবর্দি আদেশ করলেন, " হত্যা কর এই কাফেরদের! " তথ্যসূত্র বলে, আলিবর্দির আদেশে সৈন্যরা কচুকাটা করছিলো  ভাস্কর বাহিনচম। ভাস্করের মুন্ডচ্ছেদন করলো আলিবর্দির বাহিনী।  বাংলার আকাশে রক্তের স্রোতে শান্তি নেমে এলো। নবাব খুব আনন্দিত হয়ে ১০ লক্ষ টাকা বিতরণ করলেন ; স্থিমিত হলো বর্গিরাজ..। শান্ত  বাংলা আবার।।

 

"At the Rani's Tank, west of.....  a severe battle was fought, in which the Marathas were defeated and driven back with heavy loss, their rear guard was cut off and half their baggage plundered.(Fall of the Mughal

Empire vol1j.n Sarkar) হ্যাঁ, এই পাড়েতেই মারাঠা ও নবাব বাহিনীর যুদ্ধ হয়৷

 

সময়টা ১৭৪৫ সালের ডিসেম্বর মাস ; এই সময়েই শুরু হয় সেপাইদিঘির যুদ্ধ৷ সিপাইদীঘির পুরাতন নাম রানিদীঘি। ক্ষেত্রসমীক্ষা বলে, পশ্চিমে জাজিগ্রাম ও ন - নগর গ্রামের মাঝেতেই এই বিরাট  সরোবর। সিপাইদীঘির পূর্বনাম রানিদীঘি। তখনকার সময়ে ভাগবত পাঠক  এবং কথক শ্রীনিবাস এখানেই বসবাস করতেন। আর সময়ের পরিপ্রেক্ষিত অবলোকন করতে হলে,  পূর্বপাঠের কথক হয়ে উঠতে হয়। রাঙা মাটির তাপ, যেন দহন।

নিস্তব্ধের প্রহর গুনছে রাজপথ। প্রাসাদের গোপন কক্ষে দুই ব্যক্তি এখনও জেগে। একজন সুদৃশ্য আসনে আসীন,  রাজা  হাম্বির মল্লদেব; অপরজন রাজজ্যোতিষ বিপ্র শিবদাস৷ অধির আগ্রহে রাজা অপেক্ষা করছেন কি বলছে গণনা!  এলো উত্তর;  রাজজ্যোতিষ বললেন, " অধীর হবেন না মহারাজ, শীঘ্রই আপনার সম্মুখে সুবর্ণ সুযোগ উপস্থিত হবে। "

 

রাজা মানেন, যে, রাজজ্যোতিষ সব সত্য কথা বলেন। গুপ্তচর বলল,তিনটি গো শকট সুদূরের রাজ্য থেকে আসছে।  তাহলে, তো সঙ্গে থাকা অলংকার কম নয় ; একবারে নিরস্ত্রে পাবে তাদের অরণভুমি। তাই আর বিলম্ব নয়। রাজজ্যোতিষ এর কথা এবার ফলতে বসেছে। লুন্ঠনের চিন্তা তাঁকে মোহিত করলো ; অযথা উত্তেজনাময় হাম্বিরের বিস্মৃতি তো নেহাত কম নয়৷ জীবনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে পরিবর্তন সার্থক হবে তাঁর৷ হ্যাঁ, এতো উল্লাসের সময়। অট্টঠাসির উন্মাদনা এটাই তো প্রাপ্তি। একটু অবাক হচ্ছেন!  অবাক হবার কিছু নেই!  তৎকালীন সমাজে এমনটা চলতো৷ বাগদি, ঢাল, সড়কিধারী, কে নেই সেখানে। গগন সর্দার এসে উপস্থিত হলেন।

 

 তিনটি গোশকটে তিন গাড়োয়ান ছাড়া আরো চার। যেই সেই গোশকটগুলো ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হলো, গগন সর্দার ভাবলেন, এই তো!  এই তো!  এইবার সময় এসেছে লুঠ৷ পেটিকা গুলো চুরি করলেন তিনি। আর  নিদ্রা ভাঙলেই পেটিকার সন্ধান করলেন সেই মহান তিন ব্যক্তিত্ব। আচার্য শ্রীনিবাস, আচার্য শ্যামানন্দ আর নরোত্তম ঠাকুর। স্তম্ভিত তাঁরা,  হারানো বেদনা নয়, এতো জীবন মুহ্যমান ;  তাঁরা যে এ পেটিকা সুদূর বৃন্দবন থেকে আনছেন, তাই খুঁজে না পেয়ে বিষ্ণুপুর ছাড়বেন কি করে!  বৃন্দাবনের গোস্বামী অনেক যত্ন করে তাঁদের দিয়েছিলেন, কিন্তু পেটিকা তিন লুঠ হয়ে গেলো৷ ভেঙে পড়লেন শ্রীনিবাস।

 

 এদিকে গগন ঠাকুরকে রাজা  হাম্বির মল্লদেব আদেশ করলেন, গুপ্ত কক্ষ থেকে এক এক করে নিজের হাতে সেই রত্ন পেটিকা খুলে ফেলো। কিন্তু কি দেখলেন তিনি!  এতো পুঁথি!  তবে যে রাজজ্যোতিষ

বললেন তাঁর জীবন পরিবর্তন হবে৷ রাজা  হাম্বির মল্লদেব, ক্রোধে জ্বলে রাজজ্যোতিষকে ডেকে পাঠালেন৷ অশান্তি  হলো প্রবল৷ রাজজ্যোতিষ শিবদাসকে ডাকা হলো। তিনি তখন অসুস্থ। রাজজ্যোতিষ শিবদাস বললেন, তিনি যা দেখেছেন, তাই তো বলেছেন৷  কিন্তু, কই রত্ন!  শিবদাস অসুস্থ আর সত্যবাদী হিসাবে রাজমান্যতা পেতেন, তাই রাজা তাঁকে ছেড়ে দিলেন। অপমানে, সেদিন শিবদাস বলেছিলেন যে তিনি রাজার আর অন্যায় মেনে নেবেন না। সময় গড়িয়ে চলল, ক্রমে শ্রীনিবাস আচার্য এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে আস্তানা গেড়েই নিজের প্রচার করলেন কর্মের মাধ্যমে ;

 

সময়ের তালে তালে তাঁর জ্ঞান, কথক রূপে ভাগবত পাঠে মানুষ মুগ্ধ হলো। তিনি রাজা হাম্বির মল্লদেবের ডাক পেলেন। গীতার পাঠ, ভাগবত ব্যাখ্যা শুনে হাম্বির মুগ্ধ হলেন। হাম্বির বললেন যে, শ্রীনিবাস আচার্য তাঁর স্থানে এসে প্রজাদের ধন্য করেছেন। তাই রাজা তাঁকে ভূমি, অর্থ দান করতে চাইলেন। শ্রীনিবাস তাঁর সেই তিন পেটিকা বইয়ের কথা জানালেন। গগন সর্দারের লুঠের কথা তিনি আদৌ জানতেন না৷ রাজা তৎক্ষনাৎ তাঁর সেই তিন পেটিকা ফেরত দিলেন, এবং এই দস্যুবৃত্তিতে যে তিনিই যুক্ত ছিলেন তা স্বীকার করলেন। রাজা মল্লদেব বৈষ্ণব অনুরাগী হয়ে উঠলেন। মদনমোহন প্রতিষ্ঠা হলো বিষ্ণুপুরে৷ সস্ত্রীক দীক্ষা নিলেন। নতজানু হয়েই রাজস রাজজ্যোতিষের কাছে ক্ষমা চাইলেন। কারণ সত্যিই তাঁর জীবন পরিবর্তন হয়েছে৷

 

পরবর্তীকালে  রাজা মল্লদেবের নির্দেশেই হাম্বির জাজিগ্রামের পাটবাড়ির কাছেই খনন করা হয় রানিদীঘি সুবৃহৎ এক সরোবর। পরে এই সিপাইদীঘির যুদ্ধে বর্গি আক্রমণে জাজিগ্রামটি একপ্রকার ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তী পুনর্নিমাণে নামকরণ হয় ন- নগর।।

" ভাঙা গড় গড়াইবো, জলপূর্ণ করি

জলশূন্য পরিখায়, ধনুর্বাণ ধরি দ্বারিগণ

আবার রক্ষিবে দ্বার, অতিকুতূহলে।। "

"পঞ্চকোটস্য রাজ্যশ্রী আর পঞ্চকোট বিদায়সংগীত ";

কিংবদন্তী বলে,   সময়টা ৯০ খ্রিস্টাব্দ ; রাজা দামোদর শেখর ছিলেন পঞ্চকোটের রাজা। শোনা যায় যে, ঝালদা অঞ্চলের পাঁচ আদিবাসী সর্দার নিয়ে এই রাজত্ব তৈরি হয়। ", গড় " শব্দটির অর্থ দুর্গ, "পঞ্চ" মানে পাঁচ, "কোট" মানেই গোষ্ঠী। চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য,  মন্দির, নিয়েই এই স্থান। বর্গি আক্রমণের এক ভয়াবহ চিত্র, এই গড়পঞ্চকোট

জুড়ে শিহরণ জাগায়।

 

১৭৪২ সালে ভাস্কর পণ্ডিত চল্লিশ হাজার সেনা নিয়ে বর্ধমানে প্রবেশের পূর্বে গড়পঞ্চকোটে তীব্র আঘাত করে। একপ্রকার নবাব বাহিনির আঘাতের বদলা নিতেই এই তীব্র আক্রমণ। লুঠপাট ও নির্বিচার হত্যায়  রক্তের রঙে রাঙা হয়েই গড়পঞ্চকোটে আক্রমণ। রাণীমহলে তখন ১৭ জন সুন্দরী স্ত্রী। সঙ্গে থাকতেন দাসী সুন্দরী পরিচারিকারা। নারীলোলুপ বর্গিরা সুন্দরীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। উন্মাদের মতো গণধর্ষণ রোধকারীদের স্তন তলোয়ার দিয়ে আক্রোশে কেটে ফেলে। আর বাকিরা!  কি করবে, তারা!  তারাও প্রাসাদে রাখা কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ ও ইজ্জত বাঁচায়। তবে বর্তমান গাইডরা বলেন যে, রাণীরাও নাকি এইভাবেই গহীন কুয়ায় মরণ ঝাঁপ দেয়।

 

মৃত্যুর এই ভয়াবহতা এবং লুন্ঠনের রূপ দেখে, মানুষজন পালাতে থাকে। অবস্থা এমন হয় যে, এই মানুষজন গড়পঞ্চকোট থেকে ৩০ কিমি দূরে কাশীপুর থানার একটি গ্রাম সোনাথলি গড়ে তোলে। উল্লেখ্য এই সোনাথলিতে সিংদেও রাজ এস্টেটের ম্যানেজার হয়েছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত।আজ খুব জানতে ইচ্ছা করছে কেমন ছিলো " গড়পঞ্চকোট" ;

 

পঞ্চকোট ছিলো সুন্দরী ; ছায়া নিকটে আবেগ নিত্য গৌরব ; ছোট্ট ঢিপি ছুঁলেই হাত বাড়িয়ে সৌন্দর্য মেঘমালা ; বুনোফুল, খুবলে খাওয়া পাথর, সিধে পাকা রাস্তা ছুঁয়েই আছে পাহাড়ের কোল ; পুরাণ বলছে একসময় নাকি জৈন সাধকেরা এখানেই সাধন ভজন করতেন ; এই ২১০০ ফুট উচ্চতায় পাঁচটি চুড়ো বিদ্যমান৷ নীল হলুদের মেঘ চাদর সুখে সবুজ ছায়া আভরণ গড়পঞ্চকোট। বর্ষাকালে প্রকৃতি সুখ তো অপার৷ শাল, মহুয়ার,  অর্জুন সুখের আবাস যদি কেউ খুঁজে পেতে চায়, তবে সবুজের বুকে একটু দেহ এলিয়ে দিলেই হয়তো অতীতকে আগলে নিয়ে সবুজ সমারোহে মন মাতিয়ে দিনাতিপাত করাটা একান্তই উপভোগ্য।

 

 দুপাশের সারিবদ্ধ সবুজের তলপেটে হারিয়ে যাওয়াতেই তো ইতিহাস খুঁজে নেবে বেনামী ভ্রমণপিয়াসী মন। ঝরে পড়া পাতার আদর, আগন্তুক সংকোচ মিটিয়ে দেয় বৈভবে। অনুগত করেই সুখ বইতে হয় ;তাই বুঝে প্রেম আরোপের মহালীলা মত্ততা..  এই গড়পঞ্চকোট ;  ইতিহাস বলে, ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে এই গড়পঞ্চকোট, রাজধানী হিসাবে পরিত্যক্ত হয়৷ দূর অতীত বলে, এর নাম ছিলো তৈলকম্প। আসলে তেলকূপি নামে একটি গণ্ডগ্রাম আজও আছে। পালসম্রাট রামপাল একাদশ শতকে কৈবর্তরাজ ভীমের হাত থেকে পিতৃরাজ্য বরেন্দ্রভূমি পুনরুদ্ধার করেন। ১৮৭২ - ৭৩ ডি, বেগলার সাহেব নাকি ভ্রমণ করেছিলেন ; তিনি ২৫ থেকে ২৬ টি প্রস্তরখন্ড দেখেছিলেন ; একলা পথে মন রাঙানো বাস্তব কদর যদি আধুনিকতা হয়, তবে অতীত তার গৌরব স্মারক রেখেছে মন্দিরগুলিত,  আর কর্তৃত্বের শাসনে বলি হয়েছে কাল ;

 

তথ্যসূত্র বলে, বেগলার সাহেব লিখেছেন, " There are four sets of walls, each within the other, surrounding the kot on the west, south and east, the north being defended by the hill itself. ( Report of a tour) ১৮ বর্গকিমি জুড়ে এই গড়পঞ্চকোট নিরাপত্তায় ছিলো পাকা। নিরাপত্তার জন্য সুদৃঢ় প্রাকার ও গড়খাত কাটা হতো। পাহাড়ের ঝর্ণাগুলি থেকে নিঃসৃত হয়ে জলধারা খাতগুলিকে পরিপূর্ণতা দিতো। বাইরের সংযোগের জন্য আঁকদুয়ার, খাড়িবাড়ি, দেশবন্ধদুয়ার ইত্যাদি কয়েকটি দরজা ছিলো।  দরজার পরেই বেশ কয়েক খন্ডহর  পুকুর আছে৷ ষোড়শ শতকের শেষার্ধে রাজা হাম্বির্র রাজ্যভুক্ত ছিলো এই গড়পঞ্চকোট।  এই গিরির ৬০০ ফুট উঁচুতে ছিলো প্রহরীদের বাস৷ এছাড়াও আছে গুপ্ত পথ, রাজঅট্টালিকা আর দেবদেউল, তবে সবই আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত। রত্না, পীড়া ও চালরীতি নামে এই গড়পঞ্চকোট তিন শ্রেণিতে বিভক্ত। তবে মন্দিরগুলিতে সাবেকি পীড়ারীতি নজর কাড়ে।

 

সময়টা খ্রিস্টীয় প্রথম শতক। পঞ্চকোটে সিংদের রাজত্ব তখন৷ কিংবদন্তী বলে, মধ্যপ্রদেশের ধর থেকে আগত রাজা জগৎ দেও আর তাঁর গর্ভবতী স্ত্রী  পুরীতে জগন্নাথ দর্শনে যাচ্ছিলেন। তাঁরপর  পুরুলিয়ার জঙ্গলেই ঝালদায় তিনি পুত্র সন্তান প্রসব করেন৷ রাজা রাণী ভাবলেন সন্তানটি মৃত। কারণ অসুস্থ শিশুটির  তীব্র আর্তনাদ তাঁরা শুনতে পেলেন না। আদিবাসীরা কুড়িয়ে নিলো শিশুটি। শিশুটির নাম দিলো দামোদরশেখর। পরবর্তীকালে সেই হলো আদিবাসীদের রাজা৷ ইতিহাস বলছে সেন যুগে এই বংশের কল্যাণশেখর নাকি বল্লাল সেনেরই জামাই ছিলেন ; যৌতুকে দেওয়া হয়েছিলো কুলদেবী  শ্যামারূপাকে৷ পালযুগে ইছাই ঘোষের ধর্মমঙ্গলের আরাধ্যা  শ্যামারূপা ছিলেন কেঁদুলির দক্ষিণে পাহাড়ি গ্রামে। সেই দেবীকেই  এই গড় পঞ্চকোটে আনা হয়। ভগ্নপীড়ার সেই দেউল আজকের কল্যাণেশ্বরী আদি মন্দির ; কোথাও যেন বিজন উদ্যান ছুঁয়েই বিস্ময় পরিবর্তন কল্যাণেশ্বরী ; আবেগের ভরা বুকে দীর্ঘ ছায়ায় হয়তো আগাছা এই বুনো বর্গি হাঙ্গামা

 

 

রাঢ় - এর মধ্যমণি বর্ধমান, তৎকালীনে এক উজ্জ্বল অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সাহিত্যকে সেই মুহুর্তে বিচার করলে, বলতে হয় " কালানৌচিত্য দোষ "। সৃজনে কেবল শূন্যতা, তাই লুন্ঠনের শরীরে কালি কলম মন রিক্ত এটাই বলা যায় ; সময়টা ১৭৪০- ৪৪ ; তখন বর্ধমানের রাজা কীর্তিচন্দ্রের পুত্র চিত্রসেন মসনদে ; এই সময়েই বর্ধমান রাজ্যের আয়তন নাকি সর্বাধিক।

 

 তিনি মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহের কাছ থেকে রাজা উপাধি পান ; চিত্রসেন নিঃসন্তান ছিলেন ; তিনি মারা গেলে, তাঁরই খুল্লতাতের পুত্র তিলকচাঁদ জমিদারি প্রাপ্ত হন। তাঁর পুত্র তেজচাঁদ  ছিলো উৎশৃঙখল এবং বিতর্কিত উত্তরাধিকারী। উল্লেখ্য যে, চিত্রসেনের আমলে বর্ধমানে পর পর তিনবার বর্গি হাঙ্গামা হয়। তথ্যসূত্র বলে, ১৭৪২ সালের ১৫ ই এপ্রিল পর পর দশ থেকে বারোদিন বর্ধমান লুঠ হয়। নগরবাসী ভয়ে পলায়ন করে ; চিত্রসেন নিজে অধুনা বাংলাদেশের যশোরের পশ্চিমে নলডাঙার গড়বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে অবশ্য তিনি ব্যারাকপুর মহকুমায় কাউগাছি মূলাজোড়ে তিনি বসবাস শুরু করেন ;

 

দীনেশচন্দ্র সেনের " বৃহৎ বঙ্গ" বলে যে কাউগাছি মূলাজোড়ে বর্ধমান রাজাদের তৈরি একটি মাটির দূর্গ ছিলো। কাউগাছির পরিচিতি ছিলো সামনে গড়। এই শব্দের বিকৃত উচ্চারণে নাম হয় শ্যামনগর।  এর আয়তন ছিলো প্রায়  চার মাইল। বলা হয় বর্ধমান রাজা নিজেই নলডাঙায় এসে গড়বেষ্টিত বাড়িতে বহুদিন বসবাস করেন।  বর্গিহাঙ্গামায় চিত্রসেনের অস্থায়ী রাজধানী ছিলো কাউগাছি।

 

চিত্রসেনের সভাকবি ছিলেন বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার।  তাঁর "চিত্রচম্পূ",  রাজা চিত্রসেনের চরিতকাব্য।  তবে শুধুই চরিতগাথা নয়,  বর্গি অত্যাচারের অমানুষিক ছবি,  নারীধর্ষণ উঠে এসেছে ; শোনা যায়, প্রজাদের   নিদারুণ কষ্টের মুখগুলি দেখে, কবি বাণেশ্বর, চিত্রসেনের বিপুল বাহিনী দিয়ে ভূমন্ডলকে আচ্ছাদিত করে ফেলেছিলেন৷ শুধু তাই নয়,  প্রজাগণকে দক্ষিণ প্রয়াগ ও গঙ্গাসাগরের বিশালা নাম্নী নগরীতে উপস্থিত হন ; এই আক্রমণের সময় চিত্রসেন সহজ জীবন যাপন করতেন ; তাঁর এক গঙ্গা নামে গাভী ছিলো। তিনি এতটাই গো বৎসল  ছিলেন যে, নিজের হাতে গঙ্গার পরিচর্যা করতেন।।

 

অতীত বলে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ছিলেন ভারতচন্দ্র ; রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই উপাধি লাভের পর ১০০ থেকে ৬০০ টাকার রজস্ব দেওয়ার শর্তে মূলাজোড়ে ভূ সম্পত্তি পান ; এই গ্রামেই হস্তীশালা করার জন্য তিনি পত্তনী পান ; তবে তিনি তা অমাত্য রামদেবের নামেই দিয়েছিলেন৷ অম্বিকা কালনায় যিনি সিদ্ধেশ্বরী বাটিতে যে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন, সেই তিনিই রামদেব নাগ ; অবশ্য নাগ মশাই ভীষণ ক্রুর ছিলেন ; আর এই ক্রুরতার কথা তিনি " নাগাষ্টক " কাব্যে লিখে যান ; বসতবাড়ির তেমন চিহ্ন না থাকলেও, তাঁর নামাঙ্কিত গ্রন্থাগার আজও দ্রষ্টব্য ;

 

মূলাজড় আসলে এইসময় কুখ্যাত জয়চন্ডীর জঙ্গলের অংশ ছিলো ; নৈহাটি থেকে আজকের শ্যামনগর পর্যন্ত ভয়াবহ জঙ্গল গড়ে ওঠে। জয়চন্ডী মানেই অঘোর কাপালিকদের অবাধ চলাচল। এই জঙ্গলের জয়চন্ডী দেবীর কাছে ডাকতেরা প্রতিদিন নরবলি দিতো। বৃটিশ রা এদেশে শাসনভার গ্রহণ থেকে এই জয়চন্ডীর রূপ বদলে যায়। তাছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বন কাটা শুরু হয়। এই জঙ্গলেই ঠাকুর গোপীমোহনের হাতেই প্রতিষ্ঠা পান ব্রহ্মময়ী কালীকামূর্তি। বলা বাহুল্য বিখ্যাত উপন্যাস " পরকীয়া " এই পটভূমিকাতেই তৈরি হয়।

 

ঠাকুর পরিবারের জ্যেষ্ঠ আনন্দীরামের পুত্র ইতিহাসে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর।  অপরদিকে দর্পনারায়ণের পুত্র গোপীমোহন  ছিলেন কালিভক্ত। তাঁর এক আদরের দুহিতার নাম ছিলো ব্রহ্মময়ী ; একবার ব্রহ্ময়ীকে নিয়ে মেয়েরা কলকাতার গঙ্গার স্নানে গেলে এই ব্রহ্মময়ী জলে ভেসে যায়। আর এই ভাসা দেহ ফুলে ফেঁপে গঙ্গায় পুনর্বার দেখা যায়। পিতা গোপীমোহন মায়ের কাছে আছড়ে পড়েন। হঠাৎ এক দৈব বাণী আসে যে,  " বাবা আমি মূলাজোড়ের  গঙ্গার ধারে আছি, আমাকে নিয়ে যাও। " বাবা, পাগলের মতো ছুটে গিয়ে মেয়েকে আঁকড়ে ধরেন৷ কিন্তু,  দেখে যে, মেয়ের নিথর দেহের পাশে অপূর্ব এক কালী মূর্তি। ঐ বিগ্রহটিকে সন্তান স্নেহে আঁকড়ে নিয়ে তিনি ব্রহ্মময়ী নাম দেন। তারপর ধীরে ধীরে দুপাশে ছয়টি শিবমন্দির ও নাটমন্দির গড়ে ওঠে৷ এই দেবীপুজো চালানোর জন্য তৈরি হয় সংস্কৃত কলেজ৷ আর এই কলেজেই অধ্যায়ন করেন রামকুমার চট্টপাধ্যায়। এই দেবীকে জোড়া মুলো দিয়্র পুজো দেওয়ার রীতি পরিলক্ষিত হয়।

 

সময়টা ১৭৪৪; চিত্রসেনের আকস্মিক মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর কোনো উত্তরাধিকার না থাকায়, মিত্রসেনের পুত্র তিলকচাঁদ মাত্র এগারো বছর বয়সেই অভিসিক্ত হয়। শোনা যায় বর্গিদের হাত থেকে তিলকচাঁদের মা ও রক্ষা পান নি। পরে বহু বছর তিনি  ছেলের সাথে দুর্গে থেকে যান। ইতিহাস পরবর্তী আরো কথক হবে তিলকচাঁদ রায়। তিলোকচন্দ্রপুর তাঁর নামেই অষ্টাদশ শতকে প্রতিষ্টিত। দেবশালা, রাজগড় সব নিয়েই আগামী আলোচনার কেন্দ্রীয় চরিত্র রাজগড় কথা।

 

দূর্গম নদী, টিলা, শাল - পিয়ালের আকুতি নিয়েই বাঁকুড়া। এই ভৌগোলিক অবস্থান বহুবার বাঁকুড়াকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেছে ; ব্রিটিশ শাসনের সূচনা বললে, অষ্টাদশ শতকেই ধরা হয়। আর এই সহস্রাধিক বছরে বাঁকুড়া - বিষ্ণুপুরে  যে রাজবংশের  রাজত্বের নাম পাওয়া যায়, তা হলো মল্লরাজবংশ। এখন প্রশ্ন আসে যে,মুসলিম রাজশক্তির যে ক্রমশ বিস্তার তা কি এই মল্লদের ঠেকাতে পেরেছিল!  উত্তরটা অনায়াসেই বলে দেয় যে, " না,  কোনো প্রভাব পড়ে নি। " মোগল আমলে আভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায় মোগলদের কোনো প্রভাবই খাটে নি। অষ্টাদশ শতকে রাজা কীর্তিচাঁদ, বিষ্ণুপুর রাজশক্তির প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। শ্রদ্ধেয় রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন যে, একসময় কীর্তিচাঁদ যদিও বা বিষ্ণুপুরাধিপতিকে পরাজিত করেছিলেন, কিন্তু রাজ্য গ্রহণে অসমর্থ হন ; 

 

আদিমল্ল ছিলেন মল্লবংশের প্রতিষ্ঠাতা ; কিংবদন্তি আদিবল্লকে বাগদিরাজা বললেও, তাঁর পুত্র জয়মল্ল রাজধানী লাউগ্রাম থেকে সরিয়ে বিষ্ণুপুরে স্থানান্তরিত করে। মল্লরাজবংশের ঊনপঞ্চাশতম রাজা বীর হম্বির। তিনি মোগলসম্রাট আকবরের সমসাময়িক।  প্রাথমিক জীবনে বীর হাম্বির আগ্রাসী মনোভাব তাকে সাম্রাজ্যবাদী শাসক রূপে আখ্যা দেয়। কিন্তু প্রখ্যাত বৈষ্ণবসাধক শ্রীনিবাসের সংস্পর্শে তাঁর জীবনে আকুল পরিবর্তন হয়। ষড়গোস্বামীদের অন্যতম  শ্রীজীব গোস্বামী তাঁর নতুন নামকরণ করেন চৈতন্যদাস।  উল্লেখ্য এই যে,  বাঁকুড়ার রাজপরিবার বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার ফলে বাঁকুড়াতে বৈষ্ণব মন্দির প্রতিষ্ঠার জোয়ার আসে ; আর সেই সময়েই গড়ানহাটি কীর্তন প্রচার শুরু হয়। শোনা যায় যে,  বাঁকুড়া ও বিষ্ণুপুর মিলে মোট তৎকালীন সমাজে কয়েক হাজার কৃষ্ণমন্দির তৈরি হয়। আজও বৈষ্ণব ভক্তদের কাছে বিষ্ণুপুর " গুপ্ত বৃন্দাবন " হিসাবে পরিচিত।।

 

বীর হাম্বির পুত্র ছিলেন রঘুনাথ। একবার বাংলার শাসককে কর দিতে না পারায় রঘুনাথকে অবরুদ্ধ করা হয়। এদিকে একদিন একটি বুনো ঘোড়াকে পনেরো জন সামাল দিতে না পারায়, রঘুনাথ জানায় যে, " কেমন করে বুনো ঘোড়াকে সামাল দিতে হয় তা তার জানা।! " নবাবের  কানে সে কথা যাওয়া মাত্র, নবাব তাঁকে মুক্তি দেন এবং রঘুনাথের ওস্তাদি খেলায় বুনো ঘোড়া তখন পোষা কুকুরে পরিণত হয়৷ নবাব খুশি হয়ে তাঁকে "সিংহ " পদবি  দেন। এই প্রথম কোনো মল্লরাজা "সিংহ " পদবি পান। তাঁর বীরত্ব দেখে নবাব তাঁর রাজত্ব ফিরিয়ে দেন৷ বিষ্ণুপুরের রজইতিহাসে তিনিই প্রথম বড়ো দুর্গ নির্মাণ করেন।

১৬৫৮ সালে তিনি লালাজি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর পুত্র দুর্জন সিংহ  ছিলেন পিতার বিপরীত।  তাঁর আমলেই মদনমোহন মন্দির প্রতিষ্ঠা পায়। বরোদার   চেতুয়ার রাজা শোভা সিংহের সুন্দরী কন্যা চন্দ্রপ্রভার সাথে তাঁর বিবাহ হয়। যৌতুকে তিনি সোনার  বিশালাক্ষ্মী মূর্তি পান৷ রাজকুমারী চন্দ্রপ্রভার সাথে আসে একমাত্র অপূর্বা নারীদাসী  লীলাবাঈ। আর এই লীলাবাঈ চন্দ্রপ্রভার জীবনে অন্ধকার নিয়ে আসে।

 

রঘুনাথ সিং, লীলাবাঈ এর সৌন্দর্যে মেতে ওঠেন। রাজকাজ ছেড়ে তিনি উদ্দাম ভালোবাসার মোহে কামার্ত হয়ে লালবাঁধের গহীনে নৌকা ভাসায়৷ জোছনার ধার বেয়ে যখন চুঁইয়ে পড়তো পরতে পরতে প্রেম তুফান, তখন নৌকায় মেহফিল ছিলেন লালবাঈ৷ এদিকে চন্দ্রপ্রভা স্বামী পা জড়িয়ে বলতে থাকেন, "ওগো তুমি আমায় ছেড়ে যেও না, যেও না!  তুমি ফিরে এসো! " রঘুনাথ দীপ্ত কন্ঠে জানায় যে, সব কিছু ছেড়ে দিলেও, সে কখনও লালবাঈকে ছাড়তে পারবে না। কিন্তু যেখানে তীব্র আকর্ষণ সেখানেই বিকর্ষণ।  চন্দ্রপ্রভা অপমানে প্রতিশোধ প্রিয় হয়ে ওঠে৷ নিজের স্বামী ও লালবাঈকে গুপ্ত হত্যা করবে বলে মেতে ওঠেন। রাজা রঘুনাথকে হত্যা করে ও পিয়ারিকে লালবাঁধের গভীর জলে ডুবিয়ে শ্বাসরোধ করে ; লালবাঁধে ৩০ হেক্টর জলাভূমি আজও কাঁদে ; রঘুনাথের চিতায় চন্দ্রপ্রভা সতীরূপে আত্মবিসর্জন দেয়৷

 

একই বংশে ভাই গোপাল সিংহ এক অনন্য ব্যক্তিত্ব৷ তিনি  ছিলো ধার্মিক ও মদনমোহনের ধ্যানে ডুবে থাকা মানুষ। হরিনাম যে বড়ো মধুর, তাই ইহকাল, পরকাল জুড়ে জীবনদেবতাকে আঁকড়ে ধরেই তিনি দিনাতিপাত করেন। তাঁর সন্ন্যাস জীবন, প্রজাদের মধ্যেও দাগ কেটে যায়৷ জেলা গেজেটিয়ায় বলা হয়েছে " It was characteristic of this Raja that he issued an edict that all the people of Mallabhum should count their beads and repeat the name of God every evening at sunset... "

 

সময়টা ১৭৪২ ; খতরনাক বর্গি সেনারা পুজোর  নিতোল আনন্দে আত্মহারা ; বিষ্ণুপুরের রাজবাড়ির দিকে পা বাড়ায় হিংস্র দল। বিষ্ণুপুরের দুর্ভেদ্য গড়খাত বাধ সাধে৷ দলমাদলের দাগ কাটলেন দলমাদলের কামান। কামানটি ৩.৮ মিটার লম্বা। চওড়া ৩০ ইঞ্চি ; ওজন প্রায় কয়েক কুইন্টাল। আর দাগ কেটেছিলেন স্বয়ং মদনমোহন৷ প্রচলিত মত বলে, বর্গিরা যখন আক্রমণ করে,  রাজা গোপাল সিংহ নাকি বলেছিলেন, " এসো!  হরিনাম করি!  প্রতিরোধ করার দরকার নেই। লড়াই করবেন স্বয়ং মদনমোহন। কথিত আছে প্রজারা হরিনামে মত্ত হয়ে উঠলে মদনমোহন নিজে কামানের দাগ ধরেন৷ যুক্তিবাদীরা বলে, " The Maratha cavalry were unable to pierce the strong fortification and retired, leaving the Rajas lcvies to plunder their abandoned camp. " তবে বনবিষ্ণুপুরের  মদনমোহনের মাহাত্ম্যগাথা বলে,

" আমার সহায় কেবল মদনমোহন।

অন্তর্যামী মদনমোহন অন্তরে জানিল।।

বর্গি তাড়াইতে দেখি আমায় যেতে হলো।

দলমাদল কামান লালবাঁধের ধারে ছিলো।

আশীমান বারুদ ঠাকুর তার ভিতরে দিলো।। "

 

তবে গোপালের পুত্র চৈতন্য সিংহ এর সময়েও বর্গিহানা হয়৷ চৈতন্য সিংহের খুড়তুতো ভাই, দামোদর সিংহ এর ষড়যন্ত্রেই বিষ্ণুপুর পুনর্বার আক্রান্ত হয়৷ পরে অবশ্য চৈতন্য সিংহ সপরিবারে  পলায়ন করে। শোনা যায় তিনি মদনমোহনকে তৎকালীন কোন্নগরের লবণ ব্যাবসায়ী গোকুল মিত্রের কাছে বন্ধক দিয়েছিলেন৷ গোকুল মিত্র,  মদনমোহন কে সৌভাগ্যের প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠা করেন। চৈতন্য সিংহ,  রর্বাট ক্লাইভের সহযোগিতায় পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার করলেও মদনমোহনকে আর ফিরে পান নি। গোকুল মিত্র,  তাঁকে  আইনের ভয়ে নকল মূর্তি গড়ে দেন৷ ধার করা সব টাকা মেটালেও  গোকুল মিত্র ফেরত দেয় নি। পরে এই মদনমোহন শোভাবাজার রাজবাড়িতে ঠাঁই পায়। চৈতন্য সিংহ আসল ভেবে নকল মদনমোহন বিষ্ণুপুরে প্রতিষ্ঠা করে৷ আর কলকাতায় আসলটি রয়ে যায়৷ হান্টারসাহেবের কথায়..  "Gakul received the money but refused to restore the idol. Gakul caused a second idol to be made, exactly resembling the original, and presented it to the Raja. "

 

ইতিহাস কথক হয় ; স্মৃতি মধুর তবু কাল স্বাক্ষর রেখে যায়।

 

"

গোশাঞ্চি মহান্ত যত চোপালা এ চড়িয়া।

বোচকা বুচকি লয়ে জা এ বাহুকে করিয়া।। "

 

না, শুধু গোঁসাই নয়, মহান্ত নয়  বর্গিহানা থেকে দেববিগ্রহও রেহাই পায় নি। আসলে বৈরাগ্য ও মহান্ত পদবিধারী বৈষ্ণবসম্প্রদায়ের মানুষেরা বারে বারে নির্যাতিত হয়েছেন। কিংবদন্তী বলে মোগল আমলে বৈষ্ণব পাটবাড়ি বা আখড়াগুলি নিশ্চিন্তে ধর্মচর্চা শুরু করে। আর এই ধর্মচর্চার সাথে সাথে তারা  প্রভূত ভূসম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠে। বর্গিরা ছিলো প্রবল বৈষ্ণব বিরোধী। এমনকি তারা বৈষ্ণবকে পুড়িয়ে মারে ও বিষ্ণু মণ্ডপ ধ্বংস করে দেয়। ইতিহাস সালার এর কথা ও সুপুরের আনন্দ চাঁদের কথাতেই বর্গিদের বৈষ্ণব বিদ্বেষমূলক আচরণের প্রামাণ্য দলিল রেখে যায়। কিন্তু, মানুষের সহ্যের যখন সীমা লঙ্ঘন হয়ে যায়, তখন মানুষের অসি ধরে, অনুরূপে এমনটাই করেছিলো বৈষ্ণব সমাজ৷

 

আজ বলবো দেববিগ্রহের স্থানান্তরের কাহিনি। নদিয়া জেলার আড়ংঘাটার যুগলকিশোর ছিলেন বর্ধমান জেলার সমুদ্রগড়ে। তথ্যসূত্র বলে, বৈষ্ণব মহান্ত গঙ্গারাম দাস কিশোর গোপিনাথের মূর্তি এনে সমুদ্রগড়ে পূজার্চনা করে। বর্গিরা আক্রমণ করলে, গোপিনাথকে নিয়ে গঙ্গারাম, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সিপাই রামপ্রসাদের কাছে আশ্রয় নেয়৷ রামপ্রসাদ অবশ্য চালার ঘর তৈরি করে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে। একদিন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নাদেশ পান, যে, তাঁর রাধিকা বাড়ির ভূগর্ভে অবস্থান করছেন; এবার সেই রাধিকাকে কৃষ্ণচন্দ্র তুলে গঙ্গারামকে সমর্পণ করেন। গা ঘেঁষে চূর্ণি নদী বেয়ে,  বজরা করে রাধিকাকে কৃষ্ণচন্দ্র  এনেছিলেন। শোনা যায়, এক প্রাচীন বকুল তলায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রাধিকা ও গোপীনাথ মূর্তির মিলন ঘটান ; তিনি প্রথমে ২০ বিঘা ভূসম্পত্তি প্রদান করেন ;

 

১১৭০ সালে গঙ্গারাম প্রয়াত হন ; পরে আখড়ায় মহান্ত হন যশোদানন্দ, চরণদাস মহান্ত, হরিদাস মহান্ত, শুকারাম, রঘুনাথ, অনন্ত দাস, রামদাস অনিরুদ্ধ দাস এবং বর্তমানে শ্যামদাস৷ কিংবদন্তি বলে, বর্গিরা সমুদ্রগড় পুড়িয়ে দেয় ; জমিদার বাড়ি পুড়ে ছারখার হয়ে যায়৷ অনেকে গঙ্গা পেরিয়ে পালাতে থাকে ; ঠিক তখনই এই মূর্তি স্থানান্তর।  কিন্তু কি ছিলো এই কিশোর কিশোরী প্রেক্ষাপট!  আসলে নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের যে কৃষ্ণবিগ্রহ পুজো করতেন, তা ছিলো চিরকিশোর ; বর্ধমানের রাজা তিলোকচাঁদ দাঁইহাটেতে কিশোর কিশোরীর মন্দির স্থাপন করেন।

 

উল্লেখ্য যে, সপ্তদশ শতকে দুই গোষ্ঠীর কৃষ্ণ সাধক ছিলেন। এক, স্বকীয় এবং দুই হলো পরকীয়া পন্থী। শোনা যায় যে, স্বকীয়রা কেবল কৃষ্ণমূর্তি পুজো করবে ; আবার পরকীয়া পন্থী মতে,

" পরকিয়া বিনা নাহি রসের উল্লেস।

ব্রজবিনা ইহার অন্যত্র নাহি বাস "।। স্বকীয়রা তর্কে পরকিয়া পন্থীদের কাছে হেরে যায়। যেমন বর্ধমানের রাজাদের জামাই হলেন কালনার সুপ্রসিদ্ধ লালাজি বিগ্রহ।  কথিত আছে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নাকি পাঁচ ফল সোনা রুপা তামা প্রভৃতি ধাতুর চুবড়ি আলতা সাজিয়ে রাধিকা ও গোপীনাথ মূর্তির বিবাহ দেন ;প্রথা ও বিবর্তন সময়ের হাত ধরে পালটানো গেলেও বিশ্বাস এখনও অটুট।

 

 j.H.E Garrett সাহেব এর মতে, " Among the Visitors females predominate, owing to the belief that any women who visits the Temple will escape widowhood or she be already a widow, will be spared from the fate in her next birth. "

 

অন্তিমে আজ পর্বভিত্তিক "বঙ্গে বর্গি আক্রমণ "।  তাই সুপ্ত কথায় লুপ্ত ইতিহাসের পর্ব আঁকবো, এটা বলা বাহুল্য। আজ স্বীকার করবো কিছু কথা। বাংলা সাহিত্যের এই অন্ধকারময় যুগের কথকতা আমার কাছে সত্যিই দুষ্প্রাপ্য ছিলো৷ আমি যবে থেকে চেয়েছি আমি বিষয়ের প্রেক্ষিত গড়বো নিজের মতো করে এবং ইতিহাসের আলোকে প্রাচীনত্বকে তুলে ধরবো, সেদিন থেকে আমি শ্রদ্ধেয় দাদা নবারুণ মল্লিকের কাছে কৃতজ্ঞ হয়েছি। আমি লিটিল ম্যাগাজিনে যখন যাই, তখন ওনার দুষ্প্রাপ্য বইগুলিকে হাত দিয়ে ছুঁতেই প্রথমে উপস্থিত হই। মনে আছে, যেদিন ওনার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়, সেদিন আমি ওনার দুষ্প্রাপ্যের সম্ভারে একইদিনে পাঁচ বার গেছি। কি পাই নি আমি!  উনি আমাকে "মহারাষ্ট্র পুরাণ",  এবং " প্রবাসী ভারতবর্ষ পত্রিকায় প্রকাশিত সবটুকু দিয়ে সম্যক ভাবে সাহায্য করেছেন। যখন যেভাবে বই চেয়েছি, পেয়েছি তাই, আজ তাঁর অবদান ভুলতে পারবো না। এরপর আসি শ্রদ্ধেয় স্যার স্বপনকুমার ঠাকুরের লেখা " বঙ্গে বর্গিহাঙ্গামা " ইতিহাস ও কিংবদন্তি বইটির তথ্য,  যা আমি আমার লেখায় তথ্যভাণ্ডার স্বরূপে নিয়েছি। নবারুণ দাদা আমাকে বলেছিলেন, তিনি এই বইটির তথ্য সম্পূর্ণ রূপে ওয়াকিবহাল, যা আমাকে আরো অনুপ্রাণিত  করেছে। যেদিন গড়পঞ্চকোট " লিখেছিলাম, নবারুণ দাদা বলেছিলেন, তিনিও এই গড়পঞ্চকোট ভ্রমণের সময় শ্রদ্ধেয় স্বপনকুমার ঠাকুর স্যারের সাথে ছিলেন। এমন তথ্যসূত্র সম্বলিত বই তো আমাদের কাছে সম্বৃদ্ধ হবেই ; কারণ দুই ব্যক্তিত্ব  যেখানে উপস্থিত, আমাকে আরো বেশী উৎসাহিত করে। তাই সে ঋণ স্বীকার তো অবশ্যই। এরপর আসি শ্রদ্ধেয় তিলক দাদাভাইয়ের কথায়। দাদা আমাকে প্রতি পর্বে আমার "knowledge share " কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। প্রতি মুহুর্তে এমন সৎ, স্বাধীনচেতা মানুষ আমার শ্রদ্ধার। তাই আজ অন্তিমে দিনলিপির মতো করে সাজিয়ে নিলাম কৃতজ্ঞতার ডালি ; হয়তো বারে বারে এমন অনেক তথ্যসমৃদ্ধ হবো এবং কলম কথক হয়ে আসবেই, কিন্তু অবদান স্বীকার করতেই হয়। আর এখানে ব্যক্তি সম্মান বরং বেড়ে যায়, এটাই প্রাপ্তি আমার।।

 

"নানান দেশে নানান ভাষা

বিনা স্বদেশি ভাষা পুরে কি আশা

কত নদী সরোবর কিবা ফল চাতকীর

ধরজল বিনে কভু ঘুচে কি তৃষা? "...  ( স্রষ্টা রামনিধি গুপ্ত) 

 

আখড়াই গানের আদি পুরুষ রামনিধি গুপ্ত। সময়টা স্থানান্তরের কাল। যতোবার ভেবেছেন গঙ্গার পশ্চিমতীর থেকে পূর্বতীরে যাবেন,  ততবার উল্টো কহিনি সাজিয়েছেন বিধি। বাবা হরিনারায়ণ গুপ্ত ছিলেন কুমোরটুলির আদি বাসিন্দার। শতেক চেষ্টাতেও লুঠরাজের কৌশলে পরিবর্তিত হয় নি নিয়তি।। কিন্তু পাঠকবর্গের মনে হতেই পারে, কেন,  আজ অকস্মাৎ পরিবার তুলে ব্যক্তিত্ব কলমে তুলেছি!  হ্যাঁ, কারণ আমি বর্গিহাঙ্গামায় ক্ষতিগ্রস্ত সম্ভ্রান্ত  পরিবারগুলিকে তুলতে চেয়েছি। তথ্যসূত্র বলে,  রাজা নবকৃষ্ণ দেবের পরিবারের কথা৷ শোভাবাজারের কাহিনি সেই সময় শুরু, যখন আধুনিক কলকাতার কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। ইতিহাসবিদ পি থাঙ্কপ্পন নায়ারের মতে,  এই " শোভাবাজার " এর নেপথ্যে আছে " সুরাহর বাজার " ; বসাক " নামে এক ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের আদি নিবাস ছিলো সপ্তগ্রাম। তাঁরা বসতি উঠিয়ে সূতানুটিতে বসবাস শুরু করে৷ ১৭৫৭ সালে এই বসাক পরিবারের বেশ নাম হয়৷।  শোনা যায় যে, তৎকালীন কর্তা শোভারাম বসাকের নামেই এই " শোভাবাজার " নাম!  এই শোভাবাজারের রাজবাড়ির  কর্তা ছিলেন নবকৃষ্ণ দেব। রামশরণে কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন নবকৃষ্ণ। রঘুজি ভোঁসলে একসময় ওড়িশা দখল করে রামশরণকে হত্যা করে। নবকৃষ্ণ মায়ের উৎসাহেই তিনি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা উত্তমরূপে আয়ত্ব করেন। শোনা যায়,  সিরাজ - উদ - দৌল্লার পতনের পর যে ষড়যন্ত্র তাতে নবকৃষ্ণ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।

 

অষ্টাদশ শতকের  চারের দশকে বর্গিহাঙ্গামা বাড়লে রেভা লালবিহারি দে এর পিতামহ কেও স্থানান্তরিত হতে হয় ঢাকায়। এটা ছিলো এক অনন্য অধ্যায়। তথ্যসূত্র বলে দীনবন্ধু মিত্র তাঁর সুরধনী কাব্যতে রেভারেন্ড লালবিহারী দে ' কে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন " খৃষ্টধর্ম অবলম্বী ধর্ম সুধাপান / অভিলাষী দিবানিশি দেশের কল্যাণ। "

 শোনা যায় যে ডাফ সাহেবের ইচ্ছাই ছিলো ধর্মান্তরিত করা।  আর সেই ডাফ সাহেবের সাহচার্যে পরবর্তী কালে রেভা লালবিহারি দে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।  এক প্রান্তিক মানুষ হয়েও সংস্কারকে তিনি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রেম, স্বজাতি গর্ব, আত্মমর্যাদা ছিলো তাঁর প্রবল। এমনকি কৃষকের দুঃসহ অবস্থা তুলে ধরতেও তিনি একবারো কুন্ঠাবোধ করেন নি৷

 

"নারীর তবে কি হয় বিধান?

বামন চিনে পৈতা প্রমাণ,

 বামনী চিনি কিসে রে।। "

না তিনি হিন্দু বা মুসলিম এটা বড়োকথা নয়,  বড়ো কথা হলো মান ও হুঁশের সমন্বয়ে তো মানুষ। জাতিগত ভেদ ছেড়ে যিনি মানবতার জয়গান গেয়েছিলেন। মোহ মুক্তিতে যাকে চেনা যায়,

 সেই

 " আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা

মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা।

তার উপরে সদর কোঠা

আয়না মহল তায়।। " ( লালন ফকির) 

 

আমাদপুরের চৌধুরী পরিবারো নাকি মুর্শিদাবাদ থেকে চলে আসেন। কিন্তু পরে বর্গিহাঙ্গামার সময় রায়পরিবার গৃহদেবতা নারায়ণশিলা নিয়ে বেহালাতে উঠে আসে তারপর থেকে দুর্গোৎসব শুরু হয়। আজও সেই সাবেকিয়ানা দেখতেই মানুষ ছুটে যায়৷ এমন করেই বিজয়নগরের বক্সিপরিবার মুর্শিদাবাদ থেকে চলে আসে৷ এরা ছিলেন নবাব আলিবর্দির খাস অর্থসচিব৷ একসময়ে মির হাবিবের নেতৃত্বে আক্রমণে এরা খাজুরডিহিগ্রামে চলে আসেন৷ কিন্তু কাটোয়াতেও বর্গিহাঙ্গামা নিস্তার নেই দেখে তাঁরা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বিজয়নগরে বসতি স্থাপন করেন৷ কিন্তু আশ্চর্য এই যে, কালীঠাকুর এই বর্গিদের পরম প্রিয়৷ কারণ রাঢ় ভূমির শ্মশান, রাস্তাঘাট, বন জঙ্গলে এরা যেখানেই কালীঠাকুর দেখেছে, পুজা করেছে৷ আবার ভাস্কর পন্ডিতের শিবের প্রতি আকর্ষণ ছিলো তীব্র।  কথিত আছে ভাগীরথীর তীরে এরা শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করে। তবে সাল, তারিখ আর কথিত ইতিহাস রঙ্গনাথ পন্ডিতকেই নির্দেশ করে৷ শোনা যায় ষোড়শ উপাচারে এরা কাটোয়ার ঝুপোমা অর্থাৎ বৃক্ষদেবীকে পুজো করেছে৷ তথ্যসূত্র মতে, এখানকার জঙ্গলের আমবাগানেই পড়েছিলো ক্লাইভের ইংরেজদের তাঁবু৷

 

একাধারে প্রেক্ষাপট, সংঘাত, আক্রমণ আর আরো একদিকে পাশবিক বলাৎকার ও অত্যাচারের কথা৷ কেবল মানুষ নয়, প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে কোথাও ধ্বংস লীলাও মারাত্মক। অন্ধকার যুগের পশ্চাতে বর্গি এঁকে গেছে অভিশাপ৷ এ আলেখ্য ও স্মৃতিকথা অনেকটাই পরম্পরা৷ তাই তো চাপাকান্নার সুরে সময়ের আলাপন ছুঁয়ে আজও বয়ে আসে সুর..

" ধান ফুরালো পান ফুরালো খাজনা উপায় কি! 

আর কটা দিন সবুর করো রসুন বুনেছি।।

 

তথ্যসূত্রঃ

 ১) বঙ্গে বর্গিহাঙ্গামা ইতিহাস ও কিংবদন্তি..

 স্বপনকুমার ঠাকুর

২) কৃতজ্ঞতা স্বীকার " ব্লগ "

https://blogs.eisamay.indiatimes.com/aditibhattacharya/a-story-of-forgotten-history/

৩) ভক্তিরত্নাকর " শ্রী নরহরি চক্রবর্তী "

৪) "গিরিয়ার প্রথমযুদ্ধের গ্রাম্যকবিতা " মুর্শিদাবাদ কাহিনি, নিখিলনাথ রায়

৫)  ইন্টারনেট  উইকিপিডিয়া

৬) বর্ধমান সহায়িকা

৭) অন্নদামঙ্গল কাব্য

৮)  প্রচলিত লোকগাথা

৯) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস

১০) "মহারাষ্ট্র পুরাণ"

১১) "বণিক বার্তা " ( ইন্টারনেট) 

১২) "বঙ্গদর্শন " ( ইন্টারনেট) 

১৩) ইতিহাস অভিধান

১৪) পলাশির অজানা কাহিনি,  সুশীল চৌধুরি

১৫) "বঙ্গদর্শন ইতিবাচক বাংলা"

১৬)  bengali koulal.com

১৭) আইন-ই- আকবরী

 ১৮) গড়পঞ্চকোট ( ajanapathe.com)

১৯) ebela.in  ও  sobBanglay.চম

২০) বিবিসি.  নিউজ

 

 

  প্রিয়াঙ্কা সরকার পুর্ব বর্ধমানে বসবাস করেন।তিনি বাংলায় মাস্টার্স করেছেন ২০১০এ তার পর ২০১১ তে লাইব্রেরী সায়ন্সে এবং ২০১২তে এনভাইরনমেন্ট সায়ন্সে ২০১৩ তে কমিউনিকেটিভ ইংলিশে পিজি ডিপ্লোমা সম্পূর্ণ করেন এবং ২০১৪ তে তিনি বি.এড ডিগ্রি লাভ করেন।ইতিহাস নিয়ে তার ভালোলাগার অন্ত নেই।তার মনের মধ্যে ইতিহাস যেন সদা জাগ্রত।ইতিহাসের নেশায় তিনি সর্বদা বুঁদ হয়ে থাকেন।ইতিহাস নিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের নানান অনলাইন  ও অফলাইন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখে চলেছেন।এছাড়াও তিনি বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে ভালবাসেন,কবিতা লেখেন,আবৃতি করেন,গান করেন,সেই সাথে তার আরও একটি ভালোলাগার বিষয় পারলোক চর্চা।এই বিষয়ে তিনি সমানে গবেষণা করে চলেছেন।


Comments

  1. খুবই তথ্যবহুল।

    ReplyDelete
  2. খুবই তথ্যবহুল।

    ReplyDelete
  3. এ জুয়েল ইন দা ক্রাউন। এর বেশি বলার দরকার পরেনা।

    ReplyDelete
    Replies
    1. প্রাপ্তি দাদাভাই আমার

      Delete
  4. অনবদ্য আলোচনা পাঠে মুগ্ধ হলাম । অজানা অনেক তথ্য তোমার লেখা পড়ে জানলাম। এই ভাবেই লিখতে থাকো প্রতি মূহুর্ত।।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস