দমদম এর বিখ্যাত চায়ের দোকানের ইতিহাস

                                                  
লেখকঃ- অর্ঘ দীপ দাস ও সোমেশ মাইতি



এই সেই দোকান

উত্তর কলকাতার এক প্রসিদ্ধ অঞ্চল হল দমদম। দমদম শব্দটি এসেছে প্রাচীন ফার্সি শব্দ দমদমা থেকে, যার অর্থ উঁচু ঢিবি বা টিলা। এখানকার ঘুঘুডাঙ্গা অঞ্চলে একটি এরকম টিলা দেখতে পাওয়া যায়। প্রাচীন ব্রিটিশ সৈনিকদের ঘাঁটি ছিল এখানে। এখানে একটি মিলিটারি সৈনিকদের ঘাঁটিও পাওয়া যায়। 
এই দমদম অঞ্চল বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ এখানে অবস্থিত এয়ারপোর্ট আর রেলস্টেশন এর জন্য। আজ থেকে প্রায় ১৬০ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৬২ সালে দমদম স্টেশন তৈরী হয়। যা তৎকালীন খুলনা যা বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থিত তার সাথে যুক্ত ছিল। 
শিয়ালদহ ডিভিশনের অন্যতম ব্যস্তপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ জংশন হল দমদম। একদিকে মেইন লাইন চলে গেছে কৃষ্ণনগরের দিকে, অন্যদিকে বনগাঁ, আবার আর এক লাইন ডানকুনির দিকে সম্প্রসারিত। তা এই দমদমের দুই আর তিন নম্বরের প্লার্টফর্ম এর মধ্যিখানে রয়েছে একটি চায়ের দোকান। দমদম এর যারা নিত্যযাত্রী তারা অনেকেই হয়তো দেখেছে এই চায়ের দোকান। সেই দোকানের চায়ের কাপ থেকে শুরু করে আসবাবপত্র সব কিছুতে রয়েছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। এই চায়ের দোকানের ইতিহাসের সাথে জড়িত আছে ব্রিটিশদের নিপীড়ণের কাহিনী।  
এই দোকানে গেলে চোখে পড়বে টিনের পাতের ওপর এনামেল প্রিন্টে ছাপা কয়েকটি চা-বিষয়ক ব্রিটিশ আমলের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের দাবি – ‘ইহা খাইতে বেশ সুস্বাদু, ইহাতে কোনও অপকার হয় না, ইহা জীবনী শক্তির উদ্দীপক ও সর্বোপরি ইহাতে মাদকতা শক্তি নাই।’ এসবের সঙ্গেই, চায়ের অতিরিক্ত উপকারিতা বোঝাতে আরও জোরালো ভাবে জানানো হয় যে- ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড‌, কলেরা, আমাশা, প্লেগ এবং মানসিক অবসাদ দূর করতেও নাকি এই চায়ের ভূমিকা অকল্পনীয়।
বিজ্ঞাপনে ভারতীয়দের কাছে চা-কে শুধুই আমেজ বা মেজাজের তৃপ্তি সহায়ক পানীয় হিসেবেই তুলে ধরা হয়নি। রেলপথের যাত্রীরা চা-য়ের ফ্লেভারের বদলে চা-য়ের উপকারিতাকেই বেশি করে জেনেছিলেন এই জাতীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। হয়তো ভারতীয়দের কাছে চায়ের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হল এই সমস্ত বিজ্ঞাপন। 
এবার ফিরে দেখা যাক এই দোকানের ইতিহাস। তখন ১৮৯২ সাল। ‘আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে’-র রেলপথ পাতা শুরু হল পাহাড়ের বুক চিরে। কুমিল্লা, বদরপুর, আখাউরা-র পর দেখা গেল রেলপথ বাঁক নিয়েছে লামডিং-র দিকে। আর সাথে সাথে ব্রাঞ্চ লাইন এগিয়ে গেল একদিকে তিনসুকিয়া আর অন্য পাশে গৌহাটি পর্যন্ত। এর প্রধান কারণ হল আসামের চা বাগান। সেই ১৮২৩ থেকে চলছে এই বাগান আবিষ্কারের কাহিনি। চার্লস ও রবার্ট ব্রুস মুনিরাম দেওয়ানের খাস তালুকে আবিষ্কার করে ফেলেছে “ক্যামেলিয়া সিনেনসিস” যেটি চায়ের বিজ্ঞানসম্মত নাম। কলকাতার বোটানিক্যাল বাগানের কর্তারা জানিয়েছেন ওটি আসলে চা-পাতা। সেই সুবাদেই এই রেলপথের প্রসার হচ্ছে। এর পর শুরু হল শ্রমিক নিয়ে যাওয়ার পালা। বিহার আর ওড়িশা থেকে দলে দলে চা-বাগানের পথে পাড়ি দিল শ্রমিকেরা।
এরই মাঝে শুরু হল নয়া জুলুম। চা-বাগানে শ্রমিকদের জীবনকে পরিণত করা হল ক্রীতদাসের জীবনে। ১৯২১ সালে শ্রমিকের মাইনে দৈনিক ৫০ পয়সা আট আনা। হ্যাট-কোট পড়া সাহেবদের অত্যাচারের খবর এবং চা-বাগানে কাজ করতে যাওয়ার হাতছানি দুই-ই হাজির হল উত্তর বাংলার লোকগানে। অবশেষে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব পড়ল চা-বাগানে। কুলিরা অহিংস পন্থায় ধর্মঘট শুরু করল। দলে দলে দেশে ফেরার চেষ্টা শুরু করল কুলিরা। চা-শিল্পের মালিকদের সাথে হাত মিলিয়ে রেল দপ্তর শ্রমিকদের টিকিট দেওয়া বন্ধ করে দিল, যাতে তারা দেশে না ফিরতে পারে। তখন পায়ে হেঁটে দেশে ফিরতে চেষ্টা করল অসহায় শ্রমিকেরা। যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, নেলি সেনগুপ্ত প্রমুখরা এই বিষয়ে বিস্তরভাবে কাগজে প্রচার শুরু করলেন আর সাথে সাথে আন্দোলনও চলতে থাকলো। টিকিট বাতিল, নিজেদের দেশে ফিরে আসতে না দেওয়ার মধ্যেই থিম থাকেনি তাদের এই নৃশংসতা। সালটা ১৯২১ তারিখ ২০-শে মে, গোয়ালন্দ স্টিমারঘাটে ঘুমন্ত কুলিদের ওপর গুলি বর্ষিত হলো।
প্রতিবাদের ঢল নামল গোটা দেশ জুড়ে। আসাম বেঙ্গল রেলের শ্রমিকেরা রেল রাস্তা অচল করে দিল। তরুণ ব্যারিস্টার তুলসীচরণ গোস্বামী এগিয়ে এলেন। নির্যাতিত কুলিদের পাশে দাঁড়ালেন রবীন্দ্রনাথের সহযোগী সি. এফ. অ্যানড্রুজ। বাঙালির মন ব্যাথায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। এরকম এক অবস্থার মধ্যে সাহেবরা বুঝলেন, বিজ্ঞাপনে কথার ভাঁজে চায়ের গন্ধ, চায়ের আমেজ বা চায়ের তৃপ্তির প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে চা-কে অন্যভাবে পেশ করতে হবে। আর তখনই উঠে এল ম্যালেরিয়া-টাইফয়েড-কলেরা-আমাশা-প্লেগ-মানসিক অবসাদ দূর করার অলীক প্রচারশব্দ। আশ্চর্যের বিষয় পরবর্তীতে অবশ্য এর কিছু কিছু সত্যি প্রমাণিত হয়। 
রেলের ইংরেজ আমলের ক্যাটারিং কনট্রাক্টর এইচ. সি. দে দমদমের এই দোকানটি চালাতেন। তিনি বিনা পয়সায় চা দিতেন রেলযাত্রীদের। তাঁর সময় থেকেই বিজ্ঞাপনগুলি রয়ে গিয়েছে এখানে। কিন্তু তাতে আজও লুকিয়ে আছে ইংরেজদের ব্যবসায়িক কূটনৈতিক যুক্তি, কথার চাতুরি আর এক নির্মম ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি।
 (লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)


সময় সাক্ষী হয়

Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস