রাজধানী মুর্শিদাবাদের রাজকীয় ফটকের কথা

লেখক- সুব্রত বিশ্বাস



                                         
                                          নবাবী আমল, বাংলা-বিহার-উরিষ‍্যার
                                                             সমৃদ্ধ এক কথক।
                                                        আর তারই কথা বয়ান করে-
                                                              নিজামতি তিন ফটক।।

                                                                   ত্রিমুখি সেই ফটকগুলি
                                                                      উচ্চে তুলে শির।
                                                                   সগর্বে বলে ওঠে তারা-
                                                                   'মোরাই বঙ্গবীর'।।

                                                              শৌর্যশালি নবাবী বাংলা
                                                              যেন রত্নগর্ভা।
                                                           তিনটি ফটক প্রতিক তারই,
                                                            তারাই সর্বেসর্বা।।

                                                                  আজকের দিনে সবই অতীত
                                                           সুখস্মৃতির ছায়া।
                                                                       নবাবীয়ানাও হতদরিদ্র
                                                             প্রচ্ছন্ন সব কায়া।।

                                                    অযত্নের সেই ফটকগুলি,
                                                       আজি ছড়িয়ে যত্রতত্র।
                                                     ইটের পাঁজরে গেঁথে থাকা কথা
                                                          যেন মলিন ছিন্নপত্র।।

     

 উড়িষ্যা ফটক
মুর্শিদাবাদের বুকে ভাগীরথির তীরে এক ইতিহাস সমৃদ্ধ নবাবি জনপদ লালবাগ। নবাবী আমলের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যমণি ছিল এই শহরটি। এর কেন্দ্রে ছিল কেল্লা নিজামত। আর এখান থেকেই পরিচালনা করা হতো তৎকালীন বাংলা সুবাকে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখা ভালো, বাংলা-বিহার-উরিষ্যা কে নিয়ে গঠিত ছিল সে সময়ের বাংলা সুবা। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নবাবদের শাসনকালে বাংলা পৌঁছেছিল সাংস্কৃতিক কৃষ্টি তথা অর্থনৈতিক বৈভবের এক চরম সীমায়।
      কিন্তু কালের করাল গ্রাসে সেই সকল সোনালী দিন আজ অতীত। অধিকাংশ নবাবি কীর্তি আজ ভগ্নপ্রায়, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে অবস্থান করছে বর্তমানে লালবাগ শহরের বুকে। সামান্য কিছু প্রাচীন প্রাসাদ ও সংলগ্ন অন্যান্য স্থাপত্য ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত হলেও, তা যে প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য- সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই আজও শহরে চলার পথে খেয়াল করলেই দেখা যায় অসংখ্য নবাবী নিদর্শন যারা অযত্নে পরে আছে। প্রহর গুনছে তাদের অন্তিম যাত্রার। সত্যিই ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! সকলেরই গৌরবজ্জল ইতিহাস থাকলেও, ভাগ্য ফেরে কেউ আজ রাজা তো কেউ আজ হতদরিদ্র প্রজার প্রতিবিম্ব।
      ইতিহাসকে একটু অন্যভাবে জেনে নেবার জন্য আজ আমাদের গন্তব্য নিজামতি তিন ফটক। সময় কেড়ে নিয়েছে এই ফটকগুলির নবাবী জৌলুস। ফটকে গজিয়ে ওঠা গাছ যেন প্রাচীনত্বকে জানান দিচ্ছে, আর বর্তমান কে বলছে- 'জেনে নাও আমার ইতিহাস'। নবাব সুজাউদ্দৌলার আমলে তৈরি হওয়া এই ফটকগুলি সম্ভবত অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগে নির্মিত হয়েছিল। এগুলি যথাক্রমে বাংলা ফটক, বিহার ফটক ও উড়িষ্যা ফটক নামে পরিচিত।
      বর্তমানে এদের অবস্থান চক মসজিদ সংলগ্ন এলাকায়। চক বকরি গলির সম্মুখে অবস্থিত বাংলা ফটক, নিজামত কেল্লা হয়ে রওনাক আফজার সামনে দিয়ে চক মুখে উড়িষ্যা ফটক  এবং বর্তমানের সিরাজদৌলা রোড হয়ে এগিয়ে গেলে বিহার ফটক। তৎকালীন নবাবী বাংলার ফটকগুলি প্রধানত দুইটি বৈশিষ্ট্যযুক্ত হতো। প্রধান ফটক গুলির ওপরে থাকত নহবৎখানা। নহবতি সুরের মূর্ছনার মধ্য দিয়ে নবাবরা হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে যাতায়াত করতেন এইসকল ফটক দিয়ে। সেই অর্থে বলা যায় এই ফটকগুলি ছিল রাজকীয় মর্যাদা সম্পন্ন। যেমন রৌনক আফজা, ত্রিপোলিয়া ফটক ইত্যাদি। অন‍্যদিকে অজস্র ছোটখাটো ফটক দেখা যেত নিজামত কেল্লাজুরে। আরম্বরহীন এই ফটকগুলি হল তদানিন্তন নবাব পরিবারের অন‍্যান‍্য সদস‍্য তথা অন‍্যান‍্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের যাতায়াতের মাধ্যম। উল্লেখ‍্য, এই ফটকগুলি ছিল নহবৎখানা বিহীন।
বাংলা ফটক
এবারে আসা যাক বাংলা-বিহার-উরিষ্যা ফটক সম্পর্কে। এদের স্থাপত্য রীতি তথা গঠনশৈলী ও অবস্থান আশ্চর্যজনকভাবে ওপরের আলোচনাকৃত ফটকসমূহ থেকে আলাদা। বলা যায়, আরম্বতার মধ্য পন্থা অবলম্বন করে নির্মাণ করা হয়েছিল নিজামতি তিন ফটককে। নবাবী বাংলা সুবার প্রধান তিনটি অংশ বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার প্রতীক স্বরুপ নির্মিত হয়েছিল রাস্তার ওপর আড়াআড়িভাবে অবস্থান করা এই ফটক তিনটি। নবাবীয়ানার ছোঁয়া থাকলেও এখানে নহবতি ধারণা ছিল অনুপস্থিত। সুতরাং, এর থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে এই ফটকগুলি নির্মিত হয়েছিল বাংলা বিহার উড়িষ্যার সকল জনসাধারণ তথা ওই তিনটি এলাকা থেকে আসা রাজস্বের কথা মাথায় রেখে।
      এখন আমরা জেনে নেবো এর অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে। তৎকালীন স্থাপত্যবিদদের অসামান্য ভৌগোলিক তথা মানচিত্র জ্ঞানের এক অনন্য নিদর্শন এই প্রতীকী তিন ফটক। সেই সময়ের অবিভক্ত বাংলার প্রায় মধ্যভাগে অবস্থান করতো কেল্লা নিজামত। আর দুর্গের প্রায় মধ্যভাগে অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার চক দরওয়াজার নিকটে নির্মিত প্রতীকী ফটক গুলির দিকনির্দেশনা ছিল অত্যন্ত অর্থবাহী।
      লক্ষ্য করলে দেখা যায়, চকের পূর্বদিকে অবস্থিত বাকরিগলির বাংলা ফটক নির্দেশ করে তদানীন্তন বাংলা অংশকে। বর্তমানে সমগ্র বাংলাদেশটি এর অন্তর্গত। অন্যদিকে দুর্গ প্রাচীর বরাবর রৌওণক আফজাকে পাশে রেখে দক্ষিণ-পশ্চিম মুখে অবস্থান করছে উড়িষ্যা ফটক। বর্তমানেও উড়িষ্যা রাজ্যের প্রকৃত অবস্থান ঠিক সেই দিকেই। এই দুই রীতির সামান্য ব্যতিক্রমী হয়ে অবস্থান করছে বিহার ফটক।
তিন ফটকের দিক নির্দেশনা
ভৌগোলিকভাবে নিজামত কেল্লার পেছনে উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত তদানীন্তন বিহার। সেক্ষেত্রে কেল্লার সামনে বিহার ফটকটি কে এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল যাতে, সেই বরাবর বিহারের অবস্থান থাকে। সামগ্রিক অর্থে বলা যায়, সুদূর প্রসারী নবাবি চিন্তাভাবনার এক নিদর্শন এই নিজামতি ফটক ত্রয়ী। নবাবী গরিমার প্রতীক হয়ে যেমন চক দরওয়াজা স্বমহিমায় বিরাজমান, তেমনি তার সামনে স্থিত বাংলা-বিহার-উরিষ্যা ফটক তৎকালীন বাংলার নবাবী প্রভুত্বের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সেই অর্থে চক দরওয়াজা ও  নিজামতি তিন ফটক যেন একাত্ম হয়েছে নবাবী ইতিহাসে। পরিপূরক হয়েছে একে অন‍্যের।
     তবে দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই বর্নময় ইতিহাস থাকা সত্বেও নিজামতি তিন ফটক আজ অবহেলিত। প্রত্যহ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অগণিত পর্যটক যাতায়াত করেন এই ফটকের নিচ দিয়ে। আর বিষন্ন মনে দাঁড়িয়ে থাকা ফটক গুলি তখন যেন নিজেদের শেষ প্রহর গোনায় ব্যস্ত। যাইহোক এখনো সময় রয়েছে এই 'তিন ফটককে' রক্ষা করার। রক্ষা করার আরও একটি জীবন্ত নবাবি ইতিহাসের সলিল সমাধির।
বিহার ফটক


(লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)















Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস