লালবিহারী দে ও বহরমপুর




                                                

 লেখক-সুদীপ জোয়ারদার  

                                

বাবার ইচ্ছে, ছেলে কলকাতায় গিয়ে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। কিন্তু ছেলের কলকাতা যাওয়ায়  ঘোরতর আপত্তি মায়ের। কালাগোপালকে তিনি কাছছাড়া করতে চান না। সহধর্মিনীকে  ছেলের বাবা  বোঝান, ইংরেজি না জানার জন্য তিনি জীবনে উন্নতি করতে পারেননি কখনও। ছেলের জীবন এমন হোক মা হিসাবে তিনি নিশ্চয়ই তা চান না।   

বোঝানোয় কাজ হল। জ্যোতিষী দিয়ে কালাগোপালের কোষ্ঠী মিলিয়ে দেখা হল শুভদিন। যাত্রাকালে পালন করা হল নানারকম আচার। ন’বছরের কালাগোপাল বর্ধমানের সোনাপলাশী থেকে বাবার হাত ধরে এসে পৌঁছলেন কলকাতায়। কিন্তু পড়বেন কোথায়? কলকাতায় তখন প্রধান ইংরেজি বিদ্যালয় চারটে। হিন্দু কলেজ,জেনারেল  এসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন,হেয়ার স্কুল আর ওরিয়েন্টাল সেমিনারি। হিন্দু কলেজ, ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে পড়তে গেলে বেতন লাগে। বাড়িতে প্রবল দারিদ্র্য। বেতন দিয়ে ছেলেকে পড়ানো  অসম্ভব।

হেয়ার স্কুলে বেতন লাগে না বটে,কিন্তু হেয়ার সাহেব বাছাই করে ছাত্র নেন। সদ্য গ্রাম থেকে আসা ছেলের পক্ষে হেয়ার সাহেবের পরীক্ষায় নির্বাচিত হওয়া কঠিন। সুতরাং সেটাও বাদ। এখন পড়ে রইল  জেনারেল এসেমব্লিজ মানে ডাফ সাহেবের স্কুল। এই স্কুলে  মাইনে লাগে না,পড়াশোনাও খারাপ হয় না। কিন্তু ডাফ সাহেব গোঁড়া খ্রিষ্টান। তাঁর স্কুলে বিদ্যাশিক্ষার পাশাপাশি  খ্রিষ্টধর্মও শিক্ষা দেওয়া  হয়।  উদ্দেশ্য, ছাত্রদের ওই ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা।

অনেকে ছেলের খ্রিষ্টান হয়ে যাবার ভয় দেখালেন। কিন্তু কালাগোপালের বাবার কাছে ডাফ সাহেবের স্কুল   ছাড়া তখন অন্য পথ নেই। ভগবানের ভরসায় ছেলেকে ভর্তি করে দিলেন বাবা রাধাকান্ত। মেধাবী  ছেলে। পড়াশোনায় উত্তরোত্তর উন্নতি হতে লাগল। কিন্তু লোকের ভয়টাই শেষ অব্দি সত্যি হল। বাবা মারা যাওয়ায় কিছুটা অভাব-জনিত পরিস্থিতি আর কিছুটা বাইবেলের প্রতি জন্ম নেওয়া অনুরাগ। কালাগোপাল উনিশবছর বয়সে হয়ে গেলেন রেভারেন্ড লালবিহারী দে।

এই লালবিহারী দের (১৮ ডিসেম্বর ১৮২৪-২৮ অক্টোবর ১৮৯৪) সঙ্গে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর শহরের কিন্তু নিবিড় যোগ। বঙ্কিমচন্দ্র যখন বহরমপুরে সে সময় লালবিহারী দেও এখানে। ১৮৬৭ থেকে ১৮৭২ পর্যন্ত তিনি ছিলেন কলেজিয়েট স্কুলের প্রধানশিক্ষক। লালবিহারী দে মানেই আমরা বুঝি দুটি অসাধারণ গ্রন্থ।‘Folk Tales Of  Bengal’ আর ‘Govinda  Samanta’(যার সম্প্রসারিত রূপ ‘Bengal Peasant Life’)। যে ‘Govinda Samanta’ পড়ে মুগ্ধ চার্লস   ডারুউইন বইয়ের প্রকাশককে চিঠি লিখেছিলেন,সেই বইয়ের সূতিকাগার কিন্তু মুর্শিদাবাদের এই বহরমপুর।  

১৮৭১ সালের কথা। উত্তরপাড়ার জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন, বাংলার গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের সাধারণ জীবন অবলম্বনে ইংরেজি বা বাংলায় শ্রেষ্ঠ উপন্যাসকে পাঁচশো টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। এই ঘোষণার ফলশ্রুতি ‘Govinda Samanta’। সুকুমার সেনের মতে এই পুরস্কারের জন্য লালবিহারীর মত বঙ্কিমচন্দ্রও উদ্যোগী হয়েছিলেন। গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের সমস্যা নিয়ে ‘বিষবৃক্ষ’ লেখা নয়। তবু বঙ্কিমচন্দ্র নাকি এই প্রতিযোগিতায় সামিল করেছিলেন তাঁর ‘বিষবৃক্ষ’কেই। লেখাগুলো বিচারের জন্য জমা পড়েছিল ১৮৭২ সালে। পুরস্কার ঘোষণা হয়েছিল ১৮৭৪ সালে। পুরস্কার জিতেছিল লালবিহারীরই লেখা।

যে ‘Folk Tales of Bengal’ লালবিহারীর এক অবিস্মরণীয় কীর্তি,তা রচনাও কিন্তু এই ‘Govinda Samanta’এরই সূত্রে। ‘Govinda Samanta’ বইতে রয়েছে চাষির ছেলে গোবিন্দ প্রতি সন্ধ্যায় শম্ভুর মায়ের কাছে রূপকথার গল্প শোনে। শম্ভুর মা ছিলেন একজন গ্রাম্য বয়স্ক মহিলা যিনি খুব ভালো গল্প বলতে পারতেন। ‘Govinda Samanta’এর সম্প্রসারিত রূপ ‘ Peasant Life Of Bengal’এ এই ঘটনা পড়ে ক্যাপটেন আর সি টেম্পল লালবিহারীকে অনুরোধ করেন শম্ভুর মায়ের বলা গল্পগুলোকে সংকলিত করার জন্য। কিন্তু শম্ভুর মায়ের গল্পগুলো কি আর সেভাবে মনে আছে গোবিন্দ সামন্ত ওরফে লালবিহারীর? শম্ভুর মাও বহুকাল আগেই পরপারে। কিন্তু প্রস্তাবটা মনে ধরেছিল লালবিহারীর। সুতরাং কিছু স্মৃতি আর  কিছু নানাজনের কাছে আবার নতুনভাবে গল্পগুলো শোনার অভিজ্ঞতা,এই নিয়েই তৈরি হয়ে গেল ‘Folk  Tales Of Bengal’।

বহরমপুরে লালবিহারীর আসাটা কিন্তু বেশ আকষ্মিক। চার্চের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও লালবিহারী বরাবরই লেখালেখি ভালবাসতেন। বেশকিছু পত্রপত্রিকাও তিনি প্রকাশ করেন। বহরমপুরে  আসার আগে তিনি  চালাতেন ‘Friday Review’ নামে একটা ইংরেজি পত্রিকা। ১৮৬৬ সালে উড়িষ্যায় দুর্ভিক্ষ হলে যখন সব পত্রিকা ছোটলাট সিসিল বীডনকে দোষারোপ করছে লালবিহারী তখন তাঁর ‘Friday Review’তে ছোটলাট  সম্পর্কে উল্টো কথা বলেন । এতে ছোটলাটের নেকনজরে পড়েন লালবিহারী। শিক্ষাবিস্তারে লালবিহারীর আগ্রহ  ছিলই,এবার ছোটলাটের সৌজন্যে এল শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবার সুযোগ। ফল,১৮৬৭ সালে কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ।

লালবিহারীর জীবনের আকাঙ্ক্ষা ছিল সাহিত্যক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠালাভ। বহরমপুর-বাস তাঁর কছে সে সুযোগ তৈরি করে দিল। এখানে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি মন দিলেন সাহিত্যরচনায়। বহরমপুরের সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। ১৮৭০ সালে গ্র্যান্ট হল ক্লাব তৈরি হলে সেই ক্লাবের সভাপতি হয়েছিলেন সাবজজ দিগম্বর বিশ্বাস,সহসভাপতি বঙ্কিমচন্দ্র। আর সম্পাদক হয়েছিলেন লালবিহারী দে। 

শোনা যায় বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে লালবিহারীর কিছুটা রেষারেষির সম্পর্ক ছিল। ১৮৭২ সালে বাংলায় ‘বঙ্গদর্শন’ বের হলে অল্পদিনের ব্যবধানে তিনি এর প্রতিপক্ষ হিসাবে বের করেন, ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল ম্যাগাজিন’। দীনবন্ধু বা বঙ্কিম কেউই নাকি তাঁকে প্রীতির চোখে দেখতেন না। দীনবন্ধুর ভাষায় তিনি ‘তোতারাম ভাট’, ‘ঘটিরাম ডেপুটি’। আর বঙ্কিমের ব্যঙ্গকাহিনি ‘মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত’ নাকি লালবিহারীর ‘Govinda Samanta’ পড়ারই বিরূপ প্রতিক্রিয়া।

উনিশশতকীয় এই রেষারেষি বা কোন্দল আজ অবশ্য কালের গর্ভে। লালবিহারী আজও বেঁচে আছেন তাঁর অমর সৃষ্টিতেই। খ্রিষ্টান হলেও তাঁর মাতৃভাষাপ্রীতি ,বাঙালীর সামাজিক জীবন সম্পর্কে তাঁর গভীর অনুরাগ ধরা রয়েছে তাঁর কাজকর্মে। আর আমাদের কাছে শ্লাঘার এটাই যে, এইসব কাজকর্মের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী আমাদের এই জেলারই প্রধান শহরটি।  



তথ্যঋণঃ ‘সেকালের কৃতী বাঙালি’/মন্মথনাথ ঘোষ
      ‘গোবিন্দ সামন্ত’(অনুবাদ)/দেবীপদ ভট্টাচার্য
       ‘Life of Lalbehari Day’/G.Macpherson
       
  (লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)
      

Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস