ভাওয়াইয়া গানে রাজবংশী লোকসমাজ
লেখিকা- তোর্সা দে
![]() |
| ছবি উৎস-https://assamcart.com/traditional-music-instruments |
বহু সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এর পালন ভূমি হলো আমাদের এই বঙ্গ।পশ্চিম বাংলার উত্তর অংশ অর্থ্যাৎ উত্তর বঙ্গের জনগোষ্ঠী তাদের জীবন সংস্কৃতি নিয়ে অনেক গবেষণামূলক কাজ হয়েছে,যা এই অঞ্চল এর অতিত কে অবগুণ্ঠন মুক্ত করেছে।এই উত্তর বঙ্গের একটি বিরাট জনগোষ্ঠী হলো রাজবংশী সম্প্রদায়,এদের বাদ দিয়ে উত্তর বঙ্গের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। বলা হয়, কোনো সমাজ কে গভীর ভাবে জানতে হলে জানতে হবে তাদের লোক সংস্কৃতি কে। যেমন মনের ভাব প্রকাশিত হয় ভাষার মধ্য দিয়ে, তেমনি কোনো সমাজের স্বরুপ প্রকাশ পায় তাদের লোক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে।
রাজবংশী সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি র প্রকাশ মাধ্যম হলো ভাওয়াইয়া গান।প্রখ্যাত অসমীয়া বৈষ্ণব সাধক শংকর দেবের শিষ্য রূপনারায়ন শ্রুতিধর রচিত “কামতেশ্বর কুলকারিকা” গ্রন্থে রাজবংশী দের উল্লেখ পাওয়া যায়।রাজবংশী দের স্পষ্ট উল্লেখ মেলে “কালিকা পুরান” এ। বিশিষ্ট লেখক শ্রী পতিরাম সিনহা র “কামতারাজ্য পৌন্ড্রক্ষত্রিয়”(ইতিহাস প্রথম খন্ড) তে বলা হয়েছে যে পরশুরামের আক্রমণের ভয়ে দক্ষিন বঙ্গ থেকে পৌন্ড্রক্ষত্রিয় জনগোষ্ঠী রত্ন পীঠে আশ্রয় গ্রহন করে। এদের নৃতাত্ত্বিক গঠনে মোঙ্গলয়েড ছাপ থাকলেও জনজীবনে আর্য সংস্কৃতি প্রভাব প্রবল।
যেকোনো জনজাতির আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা,জীবন জীবিকা,প্রেম প্রকৃতি, সুখ দুঃখ জীবন সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে তাদের লোক সংস্কৃতি। এই লোকায়ত জীবন যাত্রা কে নিজেদের মৌলিক ভাষা ও সুরের দ্বারা গেঁথে যে সংগীতজগৎ সৃষ্টি হয়,তাই হলো লোক সংগীত। আঞ্চলিক জীবনের হৃদ স্পন্দন ধ্বনিত হয় তাদের সংগীত এর মধ্য দিয়ে। রাজবংশী জনজীবনের প্রকাশ ঘটে ভাওয়াইয়া সংগীতের মধ্য দিয়ে। ভগবান শ্রীচৈতন্য দেবের উত্থান কালে উত্তর বঙ্গে কামরূপী উপভাষায় এই লোক সংগীত এর জন্ম হয় বলে ধারনা করা হয়।একটি মতানুসারে “ভাওয়াইয়া” শব্দের উৎপত্তি “ভাব” থেকে অর্থাৎ যে গান শ্রোতার মনকে ভাবে বিভোর করে। তবে উত্তর বঙ্গ ও আসামের গোয়াল পাড়া অঞ্চলে “ভাব” কথার অর্থ প্রেম। আবার অনেক স্থানে “ভাওয়াইয়া” শব্দের অর্থ “উদাস”,তাই বলা যায় ভাওয়াইয়া হলো উদাস প্রেমকাহিনী যা মানুষের মনকে উদাস করে।
এই গান গুলির মধ্য দিয়ে জনজীবনের পূর্ণ প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম ফুটে ওঠে এই গান গুলির মধ্য দিয়ে। মৎসজীবি দের জীবন সংগ্রাম,মধু সংগ্রাহকদের জীবনের ঝুঁকি, বণিকদের অনিশ্চিত জীবন,পশু পালকদের ঘাস এর সন্ধানে চড়াই উৎরাই পার হওয়া,কৃষিজীবিদের প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই স্থান পেয়েছে গানের ছত্রে ছত্রে । এই গানে সবথেকে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে নারীর মর্ম বেদনা। রাজবংশী মাতৃতান্ত্রিক সমাজের ছাপ পাওয়া যায় এর মধ্যে। এই সুর মূলত আদি রস বা যৌন আবেদন আশ্রয়ী।বিষেশত নারীর বিরহ বেদনা,প্রণয়াকাঙ্ক্ষা, হতাশার করুন বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই সব গানে। এরূপ একটি গানের লাইন হলো,
“বন্ধুয়া মোর বনিজ গেইচে উজানিয়ার দ্যাশেরে
সেই না দ্যাশে পুরুষ বান্ধা পড়ে নারীর ক্যাশে রে...”
উনবিংশ শতক থেকে উত্তর বঙ্গে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এই অঞ্চলে উচ্চ বর্ণহিন্দু বসতি বৃদ্ধি পেতে থাকে ও রাজবংশী সম্প্রদায় নীচু জাত রূপে গন্য হতে থাকে।এভাবে উত্তরবঙ্গীয় সমাজে দ্বন্দ্ব এর সূত্রপাত হয়।১৯১১ সালের জনগননায় পৃথক জনজাতি হিসেবে রাজবংশী দের অস্তিত্ব কে অস্বীকার করা হয়।ফলে রাজবংশী সমাজের পরিচায়ক ভাওয়াইয়া গান ও কলকাতা কেন্দ্রিক উচ্চ সংস্কৃতির জগতে ব্রাত্য হিসেবে চিহ্নিত হয়। তবে ক্রমে রাজবংশী দের মধ্যে জাগরণ ঘটে, “সংস্কৃতায়ন” এর প্রভাবে এরা নিজেদের পদবী পাল্টে ও পৈতা গ্রহন করে তথাকথিত জাতে ওঠার প্রয়াস করে। কিন্তু সমাজের মুখপাত্র ভাওয়াইয়া গান এই পরিবর্তন এর সাথে তাল মেলাতে পারেনি,গানের গ্রাম্য আবেগ হারিয়ে যেতে থাকে। অনেক সংগীতশিল্পী এই সংগীতকে বিকশিত করার প্রয়াস করেছেন যাঁদের মধ্যে ধীরেন সরকার,সুরেন দাস,আব্বাস উদ্দিন,হেম লতা ঘোষ,ভূপেন হাজারিকা প্রমুখের নাম করা যায়,এই প্রয়াস এখনোও বর্তমান। তবে যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে রাজবংশী সমাজ যেমন তার নিজস্বতা হারিয়ে ফেলতে বসেছে তার ছাপ এই সংগীত কেও স্পর্শ করেছে।
“বঙ্গদর্শন” পত্রিকায় ১২৮৭ বঙ্গাব্দে “ বাঙ্গালার ইতিহাস সম্পর্কে কয়েকটি কথা” প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “আইস,আমরা সকলে মিলিয়া বাঙ্গালার ইতিহাস অনুসন্ধান করি। যাঁহার যতদূর সাধ্য,সে ততদূর করুক,ক্ষুদ্র কীট যোজন ব্যাপী দ্বীপ নির্মান করে। একের কাজ নয়,সকলে মিলিয়া করিতে হইবে”।– এই প্রবন্ধটি এইরূপ একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস।
![]() |
| ছবি উৎস-https://www.facebook.com/kochrajbongshicommunitypage/ |




Comments
Post a Comment