নবদ্বীপের মা ভবতারিণী মন্দিরের ইতিকথা
লেখিকা- রিয়া দাস
বাংলাদেশের ইতিহাসে নবদ্বীপ এর নাম আজ প্রায় হাজার বছর ধরে জড়িত। সাধারণভাবে, নবদ্বীপ মহাপ্রভু চৈতন্য দেবের আবির্ভাব ভূমি নবদ্বীপ ধাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে শতাব্দি থেকে। সেই একাদশ শতকে সেনরাজাদের আমল থেকেই নবদ্বীপ তাই এক বিশেষ মহিমায় আসীন। কিন্তু নবদ্বীপ বাংলার ইতিহাসে এমনই একটি উজ্জ্বল নাম যে একসময় একে মূলত"অক্সফোর্ড অফ বেঙ্গল"বলা হত।কারণ নবদ্বীপ পূর্বাঞ্চলের মধ্যে এক অগ্রগণ্য শিক্ষার স্থান ছিল।তৎকালীন সময়ে বেনারসের পরেই সংস্কৃত শিক্ষা ও চর্চা ভূমি ছিল নবদ্বীপ।
নবদ্বীপ শহর ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে, ভাগীরথী ও জলঙ্গীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত।চৈতন্যদেবের জন্ম ও বৈষ্ণব ধর্মের প্রবক্তা হিসেবে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ার পর নবদ্বীপ প্রধানত বৈষ্ণব তীর্থভূমি হিসেবে অতি পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে অনেকের মতে সেই নবদ্বীপ চলে গেছে অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে, যদিও স্থানীয় লোক এদের মতে নদীয়ার গঙ্গাতীরে নবদ্বীপ এভাবেই তৈরি হয়।
কিন্তু ইতিহাস ও স্থানীয় লোকেদের সাথে আলোচনা করলেই জানতে পারা যায় নবদ্বীপ আশ্চর্যজনকভাবে বৈষ্ণব ও শাক্তের মিলন ভূমি। নয়টি দ্বীপ মিলে একটি শহর ভাবতে যেমন অবাক লাগে তেমনি কিংবা তারও বেশি অবাক লাগে,যখন জানা যায় কিভাবে বৈষ্ণব শাক্ত এবং শৈব ভক্তদের সুন্দর সহাবস্থান ঘটেছে বিদ্যাচর্চার এই পীঠস্থানে।
নবদ্বীপ শহরের মা ভবতারিণী মন্দির প্রায় দ্বিশতাধিক প্রাচীন একটি কালী মন্দির। নবদ্বীপের মা ভবতারিণী দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরের দেবী কে 'ভবতারিণী' বলা হয়। কিন্তু দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠিত দেবীর আসল নাম 'জগদীশ্বরী'। কিন্তু রানী রাসমনির গুরু উমাচরণ ভট্টাচার্য্য দেবের নামে দিয়েছিলেন 'ভবতারিণী'।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে বৃহদ্রথ নামে এক তন্ত্রসাধক ও সিদ্ধ সন্ন্যাসী বাস করতেন নবদ্বীপে। তিনি একসময় এখানকার এক বোনের মধ্যে দেবী কালীকে স্থাপন করেন একটি ঘটে। সেই সময়ে নবদ্বীপের বিখ্যাত পন্ডিত ছিলেন বাসুদেব সার্বভৌম যাঁর পিতামহ ছিলেন বৃহদ্রথের মন্ত্রশিষ্য।তিনি বন থেকে দেবীর ঘরটি এনে নবদ্বীপ শহরের এক বৃক্ষ তলে দক্ষিণাকালীর ঘটটি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে দেবীর সেবার ব্যবস্থা করলেন নদীয়ার রাজবংশ।
বাসুদেব সার্বভৌম প্রতিষ্ঠিত সেই মা কালিকা স্বরূপিনী ঘটে নিত্য পূজা ও ভক্ত সমাগম ঘটত বৃক্ষ তলে। হঠাৎ একদিন প্রচন্ড অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেল বৃক্ষটি, শোনা যায় আগুন লেগেছিল বাজ পড়ে। সেই থেকে দেবী হয়ে গেলেন"পোড়ামা ভবানী"।পোড়ামা দেবীর সঙ্গে এক হয়ে গেছেন দেবী ভবতারিণী। পোড়া মা থানের পাশাপাশি দুটি মন্দির বা রত্ন মন্দির, একদিকে'ভবতারণ'ও অন্যদিকে'ভবতারিণী'।
নদীয়ার সিংহাসনে তখন কৃষ্ণনগর রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদার এর পুত্র রাঘব। রাজত্বের শেষ পর্বে নবদ্বীপের গঙ্গার ধারে মন্দিরসহ প্রকাণ্ড এক গণেশ মূর্তি ও শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করার মনস্থ করেন।১৬৬৯ সালে গণেশ মূর্তি প্রতিষ্ঠা হল। তার অল্পকালের মধ্যেই মারা গেলেন রাঘব। শিব মন্দিরের অসম্পূর্ণ কাজ সমাপ্ত করলেন তাঁর পুত্র রুদ্র রায়। নাম হলো রাঘবেশ্বর শিব। প্রাচীন নবদ্বীপের ইতিহাসে সুরম্য সেই মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়।
প্রায় একশো বছর পর ১৭৬০ সালি নবদ্বীপ পড়ল ভাঙ্গনের কবলে। তখন নবদ্বীপের গঙ্গা শহরের দক্ষিণ দিক দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে বইত। ভাঙ্গনে ওই জোড়া মন্দির নদীর গর্ভে যাওয়ার উপক্রম হল। তখন রাজা দোর্দন্ড প্রতাপ কৃষ্ণচন্দ্র। তাঁর উদ্যোগে দুই বিগ্রহ মন্দির থেকে সরিয়ে আনা হলো নগরের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে। কিন্তু এরপরই শুরু হলো বিতর্ক।প্রকাণ্ড ওই দুই বিদ্রোহ স্থানান্তরের সময় বহু মানুষ স্পর্শ করেছে। তাই অপবিত্র হয়েছে বিগ্রহ। শোধন না করে সেবা পুজো করা যাবে না। কিভাবে শোধন হবে ? পণ্ডিতেরা জানালেন, বারো বছর বিগ্রহ মাটির তলায় পুঁতে রাখতে হবে।
কিন্তু বারো বছর কেটে গেলেও বিগ্রহ তোলা হয়নি।ফের ওই বিদ্রোহের খোঁজ পরল কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপৌত্র মহারাজ গিরিশচন্দ্রের আমলে। কিন্তু এবার আবার অন্য বিপত্তি। মাটি খুঁড়ে তুলতে গিয়ে ভেঙে গেল গনেশের শুঁড়।অঙ্গহানি হওয়ায় মূর্তিপূজার অযোগ্য বলে বিবেচিত হল। বিষন্ন রাজা পণ্ডিতদের শয়নাপন্ন হলেন–কোন উপায় কি নেই ?
পণ্ডিতেরা বিধান দিলেন যদি ওই ভাঙ্গা মূর্তি থেকে অন্য কোনো মূর্তি নির্মাণ করানো যায়, তাহলে সেই মূর্তির পূজা হতে পারে। অজ্ঞাতপরিচয় কোন শিল্পী গণেশ মূর্তি থেকে তৈরি করেন মহারাজ গিরিশচন্দ্রের আরাধ্যা দেবী আনন্দময়ীর মূর্তি। তাঁর নামকরণ হলো ভবতারিণী।নবদ্বীপ পোড়ামা প্রাঙ্গণের একদিকে প্রতিষ্ঠা হল ভবতারিণী এবং অন্যদিকে সেই শিবলিঙ্গ। নতুন নামকরণ হলো ভবতারন শিব। সময়টা হল ১৮২৫ সালে।
পোড়ামা তলা এই দেবী বিগ্রহ এক অনন্য সাধারণ অন্য রুপা। বিশাল ফালা-ফালা চোখ ও লকলকে জিভ হলেও মা বসন পরিহিতা এবং তাঁর হাতে নেই খাঁড়া। মা বাবু হয়ে বসে আছেন শিবের বুকের উপর। দেবীর নিতম্বের নিচে সদাশিব শুয়ে আছেন হাত ও হাঁটু মুড়ে আরাম করে কাত হয়ে শুয়ে থাকার ভঙ্গিমায়।
কান ও জিভের কাছটা লক্ষ করলে আগের গণেশ মূর্তির আভাস পাওয়া যায়। কালী মূর্তির নিচে শায়িত শিবকে ও সাধারণের থেকে একটু আলাদা দেখতে। সুন্দরভাবে সাজানো সেই অপূর্ব বিগ্রহ।
কিন্তু প্রায় দুশো বছরের প্রাচীন মন্দির কে ততোধিক প্রাচীন এক বট গাছের ঝুরি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। কিন্তু ওই বটগাছ নবদ্বীপের গ্রাম্য দেবী পোড়ামা বলে কয়েকশো বছর ধরে পূজিত। ফলে বৃক্ষ দেবতারূপী ওই বট গাছ কেটে মন্দির সংস্কারের কাজ করা সম্ভব নয়।এই অবস্থায় সম্প্রতি স্থানীয় কিছু ভক্ত মন্দিরের সেবায়েত মানিক লাল ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে বট গাছ না কেটে মন্দিরের সংস্কারের কাজ শুরু করেছেন।
মানিকলাল বলেন, "গাছ বাদে মন্দিরের মেঝে, দেওয়াল, বারান্দা, সিঁড়ি, দরজা সবকিছুরই আমূল সংস্কার করা হবে "
।
এইভাবে নবদ্বীপ হয়ে গেছে কৃষ্ণ ও কালী ভক্তদের মিলনস্থল অর্থাৎ বৈষ্ণব ও শাক্ত দুই - এরই পীঠস্থান। বৈষ্ণবদের তীর্থ ক্ষেত্র হিসেবে দোল পূর্ণিমা, রথযাত্রা, রাসযাত্রা তীর্থক্ষেত্রে পোড়া-মার মহিমা এবং প্রভাব এতটাই যে রাসযাত্রা নবমীর দিন সমস্ত শোভাযাত্রার মন্দিরে ঘুরে যায়।
লক্ষণ সেন,বল্লাল সেন আমলের রাজধানী নবদ্বীপের গরিমাময় ইতিহাস মনে না থাকলেও ভক্তি রসের মহাক্ষেত্রে চৈতন্য জন্মভূমিতে পাশাপাশি পোড়া মা ভবানী ও মা ভবতারিণীর দর্শন ক্ষেত্র হিসেবে অজস্র ভক্তের মনে এর আকুতি আকর্ষণ অনেক।
তথ্যসূত্রঃ
১/ নবদ্বীপের ইতিবৃত্ত । নবদ্বীপ, নদিয়াঃ মৃত্যুঞ্জয় মন্ডল। জানুয়ারি ২০১৩,পৃঃ ৩৩৪।
২/ সংবাদদাতা, নিজস্ব ।" ভবতারিণী মন্দির সংস্কারে ভক্তেরাই " । আনন্দবাজার পত্রিকা ।
ছবি- রয়াল সোসাইটি থেকে নেওয়া





Comments
Post a Comment