পদ্মা নদীর একাল-সেকাল
লেখক- মো: আব্দুল উকিল
প্রতিটি অনুভূতি প্রবন প্রাণীই বয়ে নিয়ে চলেছে জীবন। আর জীবনের সঙ্গে জলের সম্পর্ক বেঁচে থাকার। সেই কারণেই হইত জলের ওপর নাম জীবন। সেই জলের বেশিরভাগই ধারণ করে রয়েছে সাগর - মহাসাগর, নদী। সাগর মহাসাগর পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম হলেও পরিবহন ক্ষেত্রে নদীর গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। শুধু পরিবহন কেনো, মৎস্য আহরণ করে জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রেও বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করে নদী। এমনই এক নদী হলো পদ্মা। আর পদ্মা হলো গঙ্গার একটি শাখা নদী যার উৎপত্তি মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান থেকে। যত সম্ভব লোটাস ফুল থেকেই পদ্মা নামকরণ। লোটাস দেখতে যেমন সুন্দর, অনুরূপ পদ্মা নদীও তার সৌন্দর্যে ভরপুর। আর এই সৌন্দর্যের কারণেই হয়তো কিছুটা অভিমানী পদ্মা। কেননা তার চলার পথকে কখনো সময়ে-অসময়ে সংকীর্ণ করেছে আবার কখনো কখনো প্রসারিত করেছে সে নিজেই।
এই পদ্মা এখন তিনটে অংশে বিভক্ত হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রবাহিত হচ্ছে বললে হইতো কিছুটা ভুল হবে। কারণ এখন আর পূর্বের মতো জল বহন ক্ষমতা নেই। অনেকটাই কর্মক্ষম বৃদ্ধ বয়সের মতো। অথচ এক সময় বিশেষ করে বর্ষার সময়ে তিনটি ভাগই একটিতে পরিণত হতো। সরাসরি নদীপথেই যাওয়া যেত এপার বাংলা থেকে ওপার বাংলায়। দেখা যেত পালতোলা নৌকার আনাগোনা, ধীবরদের মৎস্য সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। বর্ষার সময় সিক্ত হয়ে প্রায় প্রতি বছরই দুকূল ছাপিয়ে প্লাবিত হতো আখেরিগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চল। শুরু হতো মানুষের আনাগোনা। নদী দূরবর্তী অনেক মানুষের মন উজ্জীবিত হয়ে যেত। কেননা বর্ষার সময় তেমন কাজ কর্ম না থাকায় সাময়িকভাবে মাছ ধরাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিত। দেখা যেত বৈচিত্রময় মাছ ধরার পদ্ধতি। ধৃত মাছ দেখতে আসতো দূরদূরান্তের অনেক মানুষ। একদা এই নদীতে এত বেশি মাছ পাওয়া যেত যে গামছা দিয়েও মাছ ধরা যেত। টিনের তৈরি ডিঙি নৌকা নিয়ে উপকূলের প্লাবিত এলাকায় মাছ ধরতে বিচরণ করে বেড়াত ধীবররা। কাঠের নৌকো, ডিঙির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলত কলার ভেলা। এই ভেলা করে মাছ ধরার পাশাপাশি গ্রামের বাচ্চারা বিচরণ করে বেড়াতো প্লাবিত নদীর বিভিন্ন অংশে। কিন্তু জল কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ ধরার পদ্ধতিও পরিবর্তন হয়ে যেত। যেমন ছোট ছোট ফাঁস জাল, শোলা কাঠি, ডুগরি ইত্যাদি পদ্ধতিতে মাছ ধরতো। এই নদীতেই পাওয়া যেত রুপোলি ফসলরূপে মাছের রাজা ইলিশ। আর ইলিশের জন্যই পদ্মা অনেকটাই গৌরবান্বিত। জেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এক সময় এই ইলিশ মাছ ক্রয় করতে আসতেন।বলতে গেলে এই সময় এত বেশি মাছ পাওয়া যেত যে এলাকাকে মৎস্য নগরী বললেও বলা যেতে পারতো।কিন্তু আজ তার প্রাপ্তি মেলা ভার। অনেক প্রচেষ্টার পর হয়তো কিছুটা ভাগ্যক্রমে ধীবরদের জালে ধরা পড়ে।
পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ে একসময় পালতোলা নৌকা আন্দোলিত হত। অনেক সময় ঢেউয়ের আঘাতে কত যে নৌকাডুবি ঘটেছে এই নদীতে তার শেষ নেই।শুধু তাই নয়, বাণিজ্য কারণে এই নদী পথ দিয়েই চালিত হতো বড় বড় জাহাজ।চলত নিরাপত্তাজনিত কারণে নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর স্পিড বোর্ড। স্পিড বোর্ডের যা গতি তাতে খুব অল্পসময়ের মধ্যেই চোরাকারবারীদের ধরা সক্ষম হতো।যারা ধরা পড়তো তাদের বেশিরভাগই খুব গরিব শ্রেণীর মানুষ। পেটের দায়ে অগত্যা এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হতো। চলত অকথ্য অত্যাচার। এই নদীপথ দিয়ে পার হতো গরু, মহিষ, চামড়া, কিসমিস, রিংয়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন বর্ণের পাথরসহ আরো অনেক কিছুই।এই পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করেই এক শ্রেণীর মানুষ বড় বড় অট্টালিকা গড়ে তুলেছে, ব্যাপক অর্থ ভান্ডার গড়ে তুলেছে, সেইসঙ্গে গড়ে তুলেছে বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েকটি বাড়ি।বর্ষার সময়ে এই পদ্মাকে পদ্মা বলে মনে হতো না। মনে হতো সীমানাহীন কোন এক সমুদ্র।ঠিক এই সময়ে বিভিন্ন সমুদ্র সৈকতের মতো ভিড় জমতো পদ্মানদীর উপকূলে। কখনও কখনও পদ্মার সমুদ্ররুপী রূপ দেখে মানুষ আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত, আবার কখনো কখনো পদ্মার ত্রাসে আত্মীয়দের ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়া দেখে চোখের জল নিয়ে ফিরে যেত হত।এই পদ্মাই নিঃস্ব করেছে অনেক মানুষের জমি-বাড়ি তথা বিভিন্ন সম্পদের। চিনিয়েছে মানুষকে বিপদের সময় কতটা সে মানবিক।বর্ষার প্রাদুর্ভাব হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নদীর চওড়া কমে যেত। আর ঠিক তখনই নদীর বুকে মৎস্যজীবীরা মাছ ধরার লক্ষে তীর বিদ্ধ করতো বাঁশ দিয়ে। স্রোতের পদ্মায় নিমিষেই মানুষ সাঁতার কেটে পার হয়ে যেত এপার থেকে ওপার। পদ্মা বর্ষার জলে পুষ্ট হওয়াই প্রায় প্রতি বছরই দুকূল ছাপিয়ে প্লাবিত হতো আবার বর্ষার শেষে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসতো।কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষিতে দেখলে পদ্মা আর পূর্বের মত নেই। নিজেকে অনেক পরিবর্তন করে নিয়েছে। হয়তো কিছুটা অভিমানেই।
মানুষের অমানবিক হস্তক্ষেপ,কৃষকদের অবৈজ্ঞানিকভাবে উপকূলবর্তী অঞ্চলে চাষাবাদ এবং সর্বোপরি ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের মধ্য দিয়ে পদ্মার গ্রিবাকে চেপে ধরা প্রভৃতি কারণে এক প্রকার বাধ্য হয়েই নিজেকে পরিবর্তন করে নিয়েছে। অভিমানেই হইত পদ্মা শক্তি তেমন আর প্রদর্শন করতে চাই না। তাই শক্ত মাটির সামনে নিজেকে প্রশমিত রেখে এঁকে বেঁকে প্রবাহিত হচ্ছে।পদ্মা নিজেকে গুটিয়ে রাখার কারণেই হয়তো আজ নদীবক্ষে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার একর জমি। প্রাথমিক ভাবে বালিতে পরিপূর্ণ হলেও আজ সেই বালুরাশি পরিণত হয়েছে পলি মৃত্তিকায়।নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার হওয়ার কারণে অনেক কৃষকই আজ আবারো স্বপ্নে বিভোর।কারণ এই পুনরুদ্ধারকৃত জমিতেই চাষ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফসল।যেমন ধান,পাট,কলাই আরো অন্যান্য ফসল।নদীর বুকে গড়ে ওঠা নদীচরেই আজ গড়ে উঠেছে বসত বাড়ি। তৈরি হচ্ছে যোগাযোগের জন্য রাস্তা। তৈরি হয়েছে ফ্লাড সেন্টার। আজ পায়ে হেঁটেই মানুষ নদীর বুক চিরে যাতায়াত করে এপার-ওপার। আজ প্রয়োজন হয় না আর সাঁতার কাটার।বর্ষা এলেও আর দেখতে পাওয়া যায় না সেই সমুদ্ররুপি পদ্মাকে, দেখতে পাইনা পাল তোলা নৌকা, দেখতে পাইনা বাণিজ্যের জন্য বড় বড় জাহাজ চলাচল, দেখতে পায়না মাছ ধরার জন্য প্রতিযোগিতা, দেখতে পাইনা কলার ভেলা করে বাচ্চাদের বিচরণ,দেখতে পাইনা মাছ ধরার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি, দেখতে পায়না রুপোলি ফসল ইলিশকে, দেখতে পাইনা দূর-দূরান্তের মানুষের আনাগোনা।
যে নদীকে কেন্দ্র করে এই এলাকাকে ভাবা হতো মৎস্য নগরী, আজ হয়তো বাস্তবের প্রেক্ষিতে সবই মিথ্যা, কাল্পনিক এক গল্প।পদ্মা বড্ড বেশি অভিমানী। আর অভিমানের কারনেই নিজেকে পরাজিত করলো মানুষের কাছে। আজ রাত্রির একান্তে নীরবে-নিভৃতে পদ্মা কাঁদে। আজ এই কান্না হইত কেউ শুনতেও পাইনা। পদ্মানদীর কষ্টে হইত বা মৎস্যজীবীদের একাংশ নিজেদেরকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে ফেলেছে। পদ্মা প্রাণ ধীবরদের অনেকেই পদ্মার এহেন অবস্থায় অন্য পেশায় নিজেকে অভিযোজিত করেছে।সার্বিকভাবে আজকের দিনের বাচ্চাদের কাছে গল্প বা স্বপ্নের মত মনে হতে পারে।কিন্তু এগুলি স্বপ্ন নয়,পদ্মার বাস্তব রূপ।দেখা যেত রাজশাহী বাজারের তারার মত মিটমিট করে জ্বলা আলোক সজ্জা। আজ সেই আলোক সজ্জা নিভে গেছে পদ্মাবুকে জেগে ওঠা বনস্পতির আড়ালে। ক্ষীণ হয়েছে সম্পর্ক দুই বাঙ্গলার।বেশিরভাগ অংশেই জলপথ পরিণত হয়েছে কর্দমাক্ত স্থলপথে।তবুও যতটা সম্ভব চোরাপথে এখনো আতিথিয়েতার সঙ্গে সঙ্গেই আর্থিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে এপার ওপার বাংলার।
প্রতিটি অনুভূতি প্রবন প্রাণীই বয়ে নিয়ে চলেছে জীবন। আর জীবনের সঙ্গে জলের সম্পর্ক বেঁচে থাকার। সেই কারণেই হইত জলের ওপর নাম জীবন। সেই জলের বেশিরভাগই ধারণ করে রয়েছে সাগর - মহাসাগর, নদী। সাগর মহাসাগর পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম হলেও পরিবহন ক্ষেত্রে নদীর গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। শুধু পরিবহন কেনো, মৎস্য আহরণ করে জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রেও বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করে নদী। এমনই এক নদী হলো পদ্মা। আর পদ্মা হলো গঙ্গার একটি শাখা নদী যার উৎপত্তি মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান থেকে। যত সম্ভব লোটাস ফুল থেকেই পদ্মা নামকরণ। লোটাস দেখতে যেমন সুন্দর, অনুরূপ পদ্মা নদীও তার সৌন্দর্যে ভরপুর। আর এই সৌন্দর্যের কারণেই হয়তো কিছুটা অভিমানী পদ্মা। কেননা তার চলার পথকে কখনো সময়ে-অসময়ে সংকীর্ণ করেছে আবার কখনো কখনো প্রসারিত করেছে সে নিজেই।
(লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)






MD ABDUL UKIL
ReplyDelete