শ্রীমন্ত সওদাগরের পুজিত দেবী ‘বড়দুর্গা দেবী '
লেখক- অভিষেক নস্কর
সমগ্র
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় এমন কিছু স্থান আছে। যেগুলো অনেক প্রাচীন ইতিহাসের
উপাদান লুকিয়ে রয়েছে। এইসব অঞ্চলের সঠিক সমীক্ষা না চালালে সবকিছু
বিবর্তনেে হারিয়ে যাবে। এইরকম এমন একটি অজানা প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ অঞ্চল
হল ‘ বড়দুর্গা '। এটি একটি বহু প্রাচীন গ্রাম। এই প্রাচীন ক্ষেত্রে আসতে
গেলে শিয়ালদহ - লক্ষীকান্তপুর ট্রেনে সূর্যপুর স্টেশনেে নেমে অটোয় বলবলিয়া
মোড়ে থেকে যাওয়া যায়, অথবা বারুইপুর - চরণগামী অটোয় উঠে বলবলিয়া মোড়ে
থেকে প্রায় দেড় কিমি দূরত্বে অবস্থিত বড়দুর্গা গ্রাম।
গ্রামের
প্রবেশ পথের ঠিক বাঁদিকে একটি সাইনবোর্ড চোখে পড়লো, বোর্ডে লেখা আছে
'বড়দুর্গা গ্রাম ' বড়দুর্গা মন্দিরে যাবার পথ। আর এখান থেকে মিনিট দুয়েক
হাঁটলে চলে যাওয়া যায় বড়দুর্গা মন্দিরের প্রাঙ্গনে। এই গ্রামের লোকদের
মুখে শোনা যায় যে, এই গ্রামে উত্তরে দিকে একটি বড় নদী ছিল। এই নদীটি হল
প্রাচীন আদিগ, বর্তমানে খাল বা ডোবায় পরিণত হয়েছে। আদিগঙ্গার গতিপথ ছিলো
বারুইপুর - পুরন্দরপুর, কল্যাণপুর, শাসন, সুর্যপুর - নাচনগাছা হয়ে পশ্চিম
দিকে বেঁকে গিয়ে সুর্যপুর ব্রিজের কাছে থেকে পিয়ালী নদী থেকে ডানদিকে
বেরিয়ে এসে একটি শাখা সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই পিয়ালী নদীর স্রোতের ধারা
নাচনগাছা কাছে দক্ষিণে বাহিত হয়ে একদিকে ' টেঁকা ' অন্যদিকে ' বলবলিয়া '
থেকে সম্পূর্ণ পশ্চিম দিকে চলে গিয়েছে। এই যুক্ত সোজা গিয়ে উঠেছে মুলটি
পর্যন্ত। এরপরে বারাসাত, জয়নগর ইত্যাদি ভিতর প্রবাহিত হয়ে গিয়েছে।
একটা
প্রশ্ন থাকতে পারে যে, বড়দুর্গা বা বড়দুর্গ গ্রামের নাম উৎপত্তি কিভাবে
হল। এইবিষয় জানা যায় যে, প্রাচীন এইসব আদিগঙ্গার গতিপথ কে কেন্দ্র করে অনেক
সওদাগর বিভিন্ন ব্যবসা - বানিজ্য চালাত, এনাদের থাকার জন্য ছোট ছোট কুটীর
বা দুর্গ স্থাপন করত। সেই দুর্গ থেকে 'বড়দুর্গ ' গ্রামের নাম হয়েছে। অনেকে
বলেন বড়দুর্গা মন্দির থেকে বড়দুর্গা গ্রামের নামের উৎপত্তি। তবে বর্তমানে
গ্রামের লোকেরা বড়দুর্গা বলে ডাকেন। এর প্রমাণ স্বরূপ এই গ্রামে আজও ছোট
ছোট দুর্গের ধংসাবশেষ ও ইটের ঢিপি দেখা যায়। মঙ্গলকাব্যেেে বিশিষ্ট কবি '
কৃষ্ণরাম দাসের ' রচিত 'রায়মঙ্গল' কাব্য (১৬৮৬ খ্রীঃ) এই গ্রামটির নাম
উল্লেখ আছে।
মন্দিরে
প্রবেশ করলাম, চোখে পড়লো বামদিকে বাঁশবন, উঁচু উঁচু বিস্তৃত অঞ্চল, আর
ডানদিকে দুর্গামন্দির। মন্দিরে পাশেই প্রাচীন বৃক্ষাদি। মন্দিরে পিছনের
দিকে বড় পুকুর (বামনে পুকুর) চোখে পড়লো। একটু এগিয়ে গেলেই আদিগঙ্গা বিশাল
মজাখাদ, প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছে। তবে গ্রামের লোকেদের কথায়, এই মন্দিরটি
ভূগর্ভে কোন সুপ্রাচীন ইটের মন্দিরের ধংসাবশেষের উপরে তৈরী। এখন বর্তমানে
মন্দিরের দশফুট মত একটি সমতল ছাদ বিশিষ্ট। দক্ষিণে দরজা সামনে চারপাশে
বারান্দা। মন্দিরে সামনে একটি বড় দালান মন্দির অর্থাৎ নাটমন্দির অবস্থিত ।
নাটমন্দিরটি ঁনিমলচন্দ্র দত্তের পুত্র ঁবলাইচন্দ্র দত্তের স্মৃতি
উদ্দেশ্য ' শ্রীমাধব চন্দ্র দত্ত সংস্কার করি দিয়েছিলেন। মূল মন্দিরগর্ভে
কক্ষে প্রবেশপথে ঠিক মাথায় মন্দিরের প্রতিষ্টা লিপি রয়েছে। লিপিতে লেখা আছে
' বড়দুর্গা মন্দির ' স্থাপিত - বঙ্গাব্দ ৯৫৫ সাল '। হিসাব করলে প্রায় ৪৭১
বছরে পুরানো মন্দির। মন্দিরে পুরোহিত দুর্গা মন্ত্রে পুজো করেন। পুরোহিত
মশাই বলেন যে, মন্দিরের কালো পাথরে বেদী পাওয়া গিয়েছে পাশের এই বামনে
পুকুরে থেকে (মন্দির সংলগ্ন পুকুর)। স্থানীয়দের কথায় পুরোহিত ঠাকুরের
পূর্বপুরুষরা স্বপ্নদেশ পেয়ে এই পুকুর থেকে প্রস্তর খন্ড গুলি পেয়েছেন।
মন্দিরের ভিতরের তিনটি প্রস্তর বেদী আছে। এর মধ্যে বাঁদিকে প্রস্তর খন্ডটি
কালো রং এর, এটি খুব আলগা অবস্থায় বসানো। বাকি দুটি প্রস্তরখন্ড একসময়
কালো ছিলো, কিন্ত মেটে সিঁদুর মাখিয়ে লাল রং-এর রঞ্জিত হয়েছে। আর ভিতরের এই
প্রস্তরখন্ড পিছনের দিকে একটি পাতকুয়ো আছে।
গ্রামবাসীদের
মতামত অনুযায়ী মনে করা হয় মন্দিরটি প্রতিষ্টা কার্য করেছিলেন 'শ্রীমন্ত
সদাগর' নামে এক বণিক। এটি একটি ছোট্ট ইতিহাস আছে, তা বর্ণনা করা হল -
মন্দিরের নিকট দিয়ে একটা সময় প্রবাহিত হত গঙ্গা যা ছিল গঙ্গাবিড়ি
অন্তগর্ত। প্রত্নবিদদের মতে মন্দিরের অদূরে ঐ গঙ্গার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলো
পিয়ালী নদীর শাখা। সেখানে উত্তাল স্রোত বইতো। কিন্তু আজ সে সব গল্পে পরিণত
হয়ে গিয়েছে। এইসময় এখনে বসত হাট। কথিত আছে এই নদী পথে শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু গিয়েছিলেন লীলাচলে পুরীধামে। এই পথ দিয়ে বাণিজ্য করতে যাতায়াত
করত সওদাগরের নৌকা, শোনা যায় যে, শ্রীমন্ত সওদাগর নৌকা মন্দির প্রাঙ্গনে
অবস্থিত এক বিশাল ডুমুরগাছে বাঁধা হত। সেই নৌকার শিকলের দাগ আজও অক্ষত
অবস্থায় রয়েছে। সম্ভবত শ্রীমন্ত সওদাগর (বণিক) এখানে নেমে দেবী দুর্গাকে
পুজা দিয়েছিলেন। অন্যান্য বণিকরাও তাদের বাণিজ্যতরী ওই ডুমুরগাছে বেঁধে
এই মন্দিরে পুজো দিত। বর্তমানে এই ডুমুরগাছটি কল্পতরু হিসাবে পুজিত হয়।
এখানে লোকেরা তাদের মনস্কামনা পূণ্য করার জন্য মানত করেন। অনেকে ফল
পেয়েছেন। প্রতিবছর অন্নপূর্ণা ও বাসন্তী পুজোয় জমজমাট হয় । প্রতি
অমাবস্যায় বিশেষ ভাবে পুজো হয়।
(লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)
(লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)




Comments
Post a Comment