'সঙ্গ-ই-দালান' এক ঐতিহাসিক প্রাসাদের ভৌগোলিক বৃত্তান্ত

 লেখক-সুব্রত বিশ্বাস



পুরানো মতিঝিলের পরিত্যক্ত প্রধান ফটক
বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁন উত্তর যুগের সূচনা হয়ে গিয়েছে। মসনদে তখন নবাব সরফরাজ খাঁন। তৎকালীন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার  সর্বাধিপতি। অন্যদিকে বিহারের পাটনায় তখন শাসক আলীবর্দী খাঁন। এরইমধ্যে আলিবর্দি খাঁনের বাংলার মসনদে বসার ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠলে, সূচনা হয় দেখো নবাব সরফরাজ খাঁন ও আলীবর্দী খাঁনের দ্বন্দ্ব। বলা যায়, এক প্রকার শঠতার আশ্রয় নিয়ে গিরিয়া প্রান্তরে আলীবর্দী খাঁন মুখোমুখি হন নবাব  সরফরাজ খাঁনের। যুদ্ধের ফলাফল যেন ছিল পূর্বনির্ধারিত। যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয় ঘটে নবাব সরফরাজ খাঁনের, মৃত্যুবরণ করেন তিনি। পরবর্তী নবাব হিসেবে বাংলার মসনদে বসেন আলীবর্দী খাঁন।

      তবে আলীবর্দী খাঁন নবাব হবার আগের আর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো তার জেষ্ঠা কন্যা  ঘসেটি বেগমের বর্তমান বাংলাদেশের তদানীন্তন শাসক নওয়াজিশ মোহাম্মদের সঙ্গে বিবাহ। প্রাথমিক স্তরে, বিবাহ সূত্রে ঘর বাংলাদেশ নওয়াজিশ মোহাম্মদের প্রাসাদের চলে গেলেও, আলীবর্দী খাঁন নবাব হবার পর তার তৎকালীন বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে আগমন ঘটে। বলা ভালো, নবাব আলীবর্দী খাঁনের ইচ্ছেতেই জ্যেষ্ঠা কন্যা ও জামাইয়ের জন্য নিজামত কেল্লা উপকণ্ঠে  মতিঝিলের পাশে গড়ে তোলা হয় 'সঙ্গ-ই-দালান'। ছোট্ট একফালি জলাশয়ের পাশে গড়ে ওঠা এই প্রাসাদটি ছিল অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। জানা যায়, একসময় এই জলাশয় হতো মুক্ত চাষ। নবাবী  ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই সঙ্গ-ই-দালান।

      সময়ের সঙ্গে নানা উত্থান-পতনের সঙ্গী এই দালানের ভগ্নদশাও আজ বিলুপ্ত। সামনের দিকে একা তথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়ে থাকা প্রধান ফটকের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। রাজ্য সরকারের অধীনে সমগ্র স্থানটিকে 'প্রকৃতি-তীর্থ' নামে উপস্থাপন করা হলেও, স্বভাবতই মতিঝিল তথা সঙ্গ-ই-দালানের অতীত গৌরব এর কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

      যাইহোক, এবারে আমাদের জেনে নেবার পালা ঐতিহাসিক সঙ্গ-ই- দালানের এরূপ অর্ধচন্দ্রাকৃতি জলাশয় এর মধ্যবর্তী স্থানে গড়ে তোলার কারণকে। আলীবর্দী খাঁন বাংলা সুবার নবাব হয়ে আসার কিছু বছরের মধ্যেই শুরু হয় বর্গী আক্রমণ। অন্যদিকে কেল্লার বাইরে  সুরম্য পরিবেশে এই প্রাসাদটিকে বানাবার পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন, তাই এই  অর্ধচন্দ্রাকার ঝিলটির মধ্যবর্তী স্থান অপেক্ষা  নিরাপদ জায়গা তখন আর বললেই চলে। আর এখানেই নবাব আলীবর্দী খাঁনের  ভৌগোলিক জ্ঞান সামরিক বিচক্ষণতার কথা বোঝা যায়।
বর্তমান ও অতীত মতিঝিলের মানচিত্র
 অর্ধচন্দ্রাকার এই ঝিলটি প্রকৃত পক্ষে ভাগীরথী নদীর ছেড়ে যাওয়া  একটি প্রাচীনপথ। এক সময়ে নদী উপত্যকার অন্তর্গত নাব্য এই অংশটি, তৎকালে মজে যাওয়া একটি ঝিলে পরিণত হয়েছিল। প্রাকৃতিক উপায়ে ঘোড়ার ক্ষুরের ন্যায় সৃষ্টি হওয়া এই ধরনের ঝিল সমূহের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- ঝিল মধ্যস্থ স্থলভাগটি তিন দিক জল দ্বারা বেষ্টিত সম্মুখের একটি অংশ প্রধান বা মূল ভূখণ্ডে উন্মুক্ত। আর সঙ্গ-ই-দালানকে তৈরি করা হয়েছিল স্থলভাগের মূল যোগাযোগের স্থান থেকে অবতল বাঁকের সর্বাপেক্ষা দূরবর্তী বিন্দুতে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, সম্মুখভাগের একমাত্র স্থল উন্মুক্ত খন্ডটিকে প্রধান  ফটক ও রক্ষীবাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত করতে পারলে, ঝিলের অবতল অংশে স্থিত সঙ্গ-ই-দালান যে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে অনেকটাই নিরাপদ তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। কারণ সে ক্ষেত্রে বাকি তিন সীমা জলভাগ দ্বারা বেষ্টিত- যা মূলত দুর্গের বাইরে স্থিত পরিখার করতো।
চিত্রকরের হাতে আঁকা মতিঝিল ও সাঙ্গ ই দালান
এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায় মতিঝিল প্রসঙ্গে। কারণ কারো কারো মতে এটি মানুষ দ্বারা কর্তিত একটি পরিখা। কিন্তু তত্ত্বটি কে সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত না বলে ত্রুটি যুক্ত বলা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে  ঝিলটি প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্ট। কিন্তু নাব্যতা কম  থাকায়, ভেতরে স্থিত স্থলভাগ সংলগ্ন ভূমিভাগকে  হাতে কেটে আরো গভীর করা হয়েছিল এটির দূর্গমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। প্রসঙ্গত, যেকোনো প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্ট জলাশয়ের কোন জ্যামিতিক আকার থাকে না; অন্যদিকে মনুষ্য সৃষ্ট যেকোনো কাঠামোতে জ‍্যামিতিক আকার লক্ষনীয়।

      এবারে আসা যাক প্রামাণ্য বিষয় সম্পর্কে। ব্রিটিশ লাইব্রেরী থেকে প্রাপ্ত ১৮৭৫ সালের মুর্শিদাবাদ জেলা মানচিত্রও তৎকালীন কার ছবিতে মতিঝিলের জ্যামিতিক আকৃতি হীনতা লক্ষ্য করা  গেলেও পরবর্তীতে ঝিলের অভ্যন্তরভাগে  রৈখিকতা লক্ষ্য করা যায়। সত্যিই তৎকালীন নবাবী চিন্তা-উৎকর্ষতার কোন জবাব হয়না। সেই দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে- তদানীন্তন বাংলা সুবার রাজধানী মুর্শিদাবাদের যেন দুইটি দুর্গ ছিল।  প্রথমতঃ সম্পূর্ণ মনুষ্যসৃষ্ট ভাগীরথী তীরবর্তী কেল্লা নিজামত এবং দ্বিতীয়তঃ আধা প্রাকৃতিক দুর্গ সঙ্গ-ই-দালান ও তদসংলগ্ন এলাকা।
ব্রিটিশ লাইব্রেরী থেকে প্রাপ্ত মানচিত্রে তৎকালীন মতিঝিল
এই প্রাসাদটির সামরিক গুরুত্ব যে কতটা ছিল, তা  পরবর্তীতে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সমকালীন কিছু দিকে তাকালেই সুস্পষ্ট হয়ে যায়। জানা যায়, এক সময় সিরাজ সঙ্গ-ই-দালানের  প্রতি  ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজের জন্য আরেকটি প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন 'হিরাঝিল' যেন মোতির থেকেও দামি। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারেন, তার বিরুদ্ধে সঙ্গ-ই-দালানে ঘষেটি বেগম ও তার অনুগামীরা রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে গোপনে ষড়যন্ত্র করছে, তখন তিনি ঘসেটি বেগমকে বন্দী করে জিঞ্জিরা প্রাসাদে প্রেরণ করেন ও নিজে  'হিরাঝিল' ত‍্যাগ করে 'মতিঝিলে' চলে আসেন। নিরাপত্তায় ঘাটতি থাকলে তখনো এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না।  উপরন্তু, আর একটি বিশেষ ঘটনা হলো- নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা এই সঙ্গ-ই-দালান তথা মতিঝিল থেকেই পলাশীর যুদ্ধ যাত্রা করেছিলেন। অর্থাৎ এর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ছিল এটি।

      পরিশেষে বলা যায়, নতুন রূপে সেজে উঠলেও আজও মতিঝিল ও আন‍্যান‍্য স্থাপত্যকীর্তি অনেক  জানা-অজানা তথ্যের জানান দেয়। নবাব আলীবর্দী খাঁনের  জামাতা নওয়াজিশ মোহাম্মদ নির্মিত মতিঝিল সংলগ্ন মসজিদটি আজও অমলিন। আর তদসংলগ্ন গুপ্ত কক্ষ টি যেন রহস্যের এক নতুন দিগন্ত। অনুমান করা হয়, সঙ্গ-ই-দালান ও এই গুপ্ত কক্ষটি একসময় সুরঙ্গ পথে সংযুক্ত ছিল। বিভিন্ন অনভিপ্রেত কারণে এই গুপ্ত কক্ষের রহস্য পর্দা আজও পরেই রয়েছে। শুধু থেকে গিয়েছে স্থানটির অতীত রাজকীয়তা।
অতীতের ভগ্নপ্রায় স্মৃতি নিয়ে বর্তমানের মর্মর ঘসেটি বেগম

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস