পৃথিবীর তিনটি রহস্যময় প্রত্নকীর্তি
লেখক- অভিষেক ঘোষ
আজ
যা বর্তমান — আগামীকাল তা অতীত । আর এই নিয়মেই অবিরত দীর্ঘ হয় মানবসভ্যতার
ইতিহাস । রচিত হয়, বিবর্তিত হয়, রূপান্তরিত হয়, সংযোজিত হয়, তেমনি
বিস্মৃত-ও হয় । ইতিহাসের নানা পর্ব কালের নিয়মে, মানুষের উদাসীন অবহেলায়
হারিয়ে যায় । এভাবে লুপ্ত হয়ে যাওয়া ইতিহাসের ফাঁকগুলোতেই ভবিষ্যতের মানুষ
বারেবারে বসিয়েছে কল্পনার নুড়ি-পাথর, সত্যের ফাঁকগুলো ভরাট করতে । আর
এভাবেই জন্ম হয়েছে উপকথার । তার কিছুটা ইতিহাস আর বাকিটা অনুমান-নির্ভর
কল্পনা মাত্র । কিন্তু এই বিরাট পৃথিবী-জুড়ে এমন অজস্র ঐতিহাসিক নিদর্শন
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, যার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের কল্পনা স্তব্ধ হয়ে যায়,
অনুমানক্ষমতা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে অবিশ্বাসে, প্রত্যয় পরিণত হয় দ্বিধায় । এই
নিবন্ধে আমরা তেমনই তিনটি রহস্যময় প্রত্ন-নিদর্শনের মুখোমুখি হবো ।
১
/ স্টোনহেঞ্জ : ইংল্যাণ্ডের উইল্টশায়ার অঞ্চলে অবস্থিত, বৃত্তাকার ভারী
পাথরে নির্মিত প্রাগৈতিহাসিক এই প্রত্ন-নিদর্শন আজ যেন এক রহস্যঘন বিস্ময় ।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনুমান, নব্য প্রস্তর যুগের অন্তিমপর্বে নির্মিত মূল
স্টোনহেঞ্জ-টি আদতে আরো বিস্তৃত ছিল । বর্তমান আয়তনের অন্তত ১৫ গুণ বড়ো ছিল
সেটি । এর বলয়াকার নির্মাণ দেখলে প্রথম দর্শনেই মনে হবে, এটি নির্ঘাত কোনো
উপাসনাস্থল । বস্তুত এটি ছয়টি পর্বে নির্মিত হয় । প্রথম পর্বে (আনুমানিক
৩০০০-২৫০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ) ‘ড্রুইডস্’-নামধারী এক প্রাচীন কেল্টিক
যাজক-শ্রেণি সূর্য উপাসনা ও দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ-স্থান রূপে এর নির্মাণ
শুরু করেন — সপ্তদশ শতকের খ্যাতনামা প্রত্নবিদ জন অব্রে অন্তত তেমনটাই
দাবি করেছিলেন । বর্তমানে হেঞ্জের সবচেয়ে বড়ো পাথরগুলির নাম দেওয়া হয়েছে,
‘সার্সেনস্’ । এগুলি গড়ে ৩০ ফুট লম্বা, ৭ ফুট চওড়া এবং একেকটির ওজন ২৫ টন ।
কিন্তু এগুলি নেহাৎ-ই স্যান্ডস্টোন বা, বেলেপাথর । ২০-৩০ মাইল দূরে
অবস্থিত আজকের ইংল্যাণ্ড থেকে সলিসব্যুরি প্লেইন অবধি পাথরগুলিকে বহন করে
আনা হয়েছিল বলেই অনুমান । রহস্য হলো এর ‘ঘোড়ার নাল’-আকারের অন্তর্বর্তী
বলয়ের নীলচে পাথরগুলি । ছোট পাথরগুলো অর্থাৎ নীল পাথর (blustone)-গুলোর ওজন
প্রায় ৪ টন পর্যন্ত । পাথর গুলোর নাম ‘ব্লু-স্টোন’, কারণ সেগুলো ভাঙলে বা
ভেজালে নীলচে একরকম আভা দেখা যায় । এই পাথর গুলো আগ্নেয় পাথর, ১৬০ মাইল (
প্রায় ২৬০ কিলোমিটার ) দূরে অবস্থিত পশ্চিম ওয়েলস-এর বিভিন্ন স্থান থেকে
আনা হয়েছিল বলেই অনুমান । কিন্তু এখনও অজানা যে, প্রাগৈতিহাসিক পর্বে কোন
প্রযুক্তি ছাড়া কিভাবে এই পাথর গুলো তারা এত দূর থেকে এনেছিল ! অন্তিম
অর্থাৎ ষষ্ঠ পর্বে ( ১৬৪০-১৫২০ খ্রি.-পূ. ) এর নির্মানপর্ব সমাপ্তির আগেই
বৃত্তাকারে নীল পাথরগুলি সংস্থাপন শেষ হয় । প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর সাহায্য
ব্যতীত ঐ বিপুল ওজনের পাথরগুলি অতদূরে বহন করে নিয়ে যাওয়া সেযুগে
অবিশ্বাস্য মনে হয় । আর সেজন্যই জন্ম নিয়েছে এলিয়েন-দের আগমনের তত্ত্ব ।
ভিন গ্রহের প্রাণিরা নাকি হেঞ্জ নির্মান করেছিল, প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে
রোগ-নিরাময় কেন্দ্র রূপে । কর্কট সংক্রান্তি ও মকর সংক্রান্তি-তে
সূর্যালোকের বিক্ষেপ দেখলে এমন সন্দেহ খুব অমূলক মনে হবেও না । সুতরাং
জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত কাজ-কর্মের কেন্দ্র হিসেবেও স্টোনহেঞ্জের ভূমিকা
অস্বীকার করা যায় না । তবে আধুনিক গবেষকদের মনে হয়েছে, বন্যা অথবা
হিমবাহের প্রবাহে পাথরগুলি হয়তো কোনোভাবে ঐ স্থানে বাহিত হয়ে আসে, যা
সেযুগের নির্মাতাদের কাজ সহজ করে দেয় । এবং নির্মাণকালের শেষ পর্বে
স্টোনহেঞ্জের ব্যবহার মূলত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে পবিত্র সমাধি ক্ষেত্র হিসেবে ।
প্রমাণ হিসেবে সম্প্রতি কয়েক বছরে স্টোনহেঞ্জে ৬৩ টি মানব-শরীরের হাড়ের
টুকরো খুঁজে পাওয়া গিয়েছে । সম্ভবত দূরবর্তী এলাকা থেকে লোকজন এই পবিত্র
সমাধিস্থলে উপাসনার জন্য-ও আসতো । শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের জন্য এর
প্রসিদ্ধি ছিল । তাছাড়াও সে-যুগে এটি মানমন্দির এবং ঋতু নির্ণয়ের কাজে
ব্যবহৃত হতো । সূর্যাস্তের মুহূর্তে হেঞ্জের নীল পাথরগুলির রোগ-নিরাময়
ক্ষমতালাভের কাহিনি অবশ্য ভিত্তিহীন । ১৯৮৬ সালে ইউনেসকো এই স্থানটিকে
“ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট” হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ।
স্টোনহেঞ্জের
গঠন বেশ জটিল । প্রাথমিক পর্যায়ে যখন এই স্তম্ভের নির্মাণ কাজ শুরু হয় তখন
প্রথমে এর বাইরের অংশে গভীর করে খাল খনন করে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল ।
তারপর এই বাঁধের ভেতরে বৃত্তাকার ভাবে পাথর গুলো স্থাপন করা হয় । প্রথমে
ব্লু-স্টোন গুলো সাজানো হয় এবং এর প্রায় কয়েকশো বছর পরে সারসন নামক পাথর
গুলো স্থাপন করা শুরু হয় । এই বৃহদাকার পাথর গুলো কে খাড়া ভাবে স্থাপন করা
হয় এবং পাশাপাশি দুটো পাথরকে যুক্ত করতে আরেকটি পাথরকে আড়াআড়ি ভাবে স্থাপন
করা হয় তার মাথার উপর দিয়ে । এভাবেই গড়ে উঠে স্টোনহেঞ্জের মূল স্তম্ভ ।
স্টোনহেঞ্জ বৃহদাকার একটি পবিত্র স্থানের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, যেখানে কাঠ
এবং পাথরের তৈরি আরও অনেক কাঠামো এবং সমাধি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রয়েছে
। সলিসব্যুরি প্লেইন-নামক বিস্তীর্ণ ঢেউ-খেলানো মূলত সবুজ অঞ্চল-টি জুড়ে
ছড়িয়ে রয়েছে আরো নানা বিস্ময় । এবং প্রায় দশ হাজার বছর পূর্ব থেকেই এই
স্থান সেকালের মানুষজনের কাছে পবিত্র স্থান রূপে পরিচিত ছিল । স্টোনহেঞ্জ
নির্মানের বহু আগে থেকেই তাই ঐ অঞ্চলে বিভিন্ন উপাসনা এবং পূজা অর্চনা হয়ে
আসছিলো, ঈশ্বরের কাছে কিছু চাইলে আগে উৎসর্গ বা কোরবানি(sacrifice)-র প্রথা
প্রচলিত ছিল । আধুনিক ড্রুইডরা এখনো উত্তর অয়নান্ত দিবস বা কর্কট
সংক্রান্তি উপলক্ষে মাথা ঢাকা সাদা পোষাক পরে স্টোনহেঞ্জে সমবেত হয় উপাসনার
জন্য । বস্তুত সাহিত্য, পুরাণ, কিংবদন্তি থেকে শুরু করে শিল্পের নানা
ক্ষেত্রে স্টোনহেঞ্জের রহস্যঘন উপস্থিতির প্রভাব প্রায়শই লক্ষিত হয় ।
নিঃসন্দেহে আরো অনেক অজানা তথ্য লুকিয়ে আছে ওই বিরাট পাথরগুলির শরীরে, যা
হয়তো চিরকাল অজানাই থেকে যাবে ।
২/
ইস্টার আইল্যান্ড : উইক-এন্ডে সোজা লং ড্রাইভে বেরিয়ে, রাজারহাটের ইকো
পার্ক-স্থিত ‘সেভেন ওয়ান্ডার্স’-এ গিয়ে পৌঁছালে, দেখা যাবে গোমড়া-মুখো
খান-চল্লিশ মূর্তি পরপর সাজানো আছে । এরা আদতে ‘মোয়াই’ । প্রশান্ত
মহাসাগরের বুকে, দক্ষিণ আমেরিকার চিলি থেকে ২,২০০ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত
‘ইস্টার আইল্যান্ড’ হলো এই ‘মোয়াই’ বা, প্রস্তর মূর্তি-দের ঘর । আজ
বিশ্বজুড়ে যেকারণে উক্ত দ্বীপ-টি তুমুল কৌতুহল উদ্রেক করছে, তার এক ও
একমাত্র কারণ এই মোয়াই, কালের নিয়মে যা বিলুপ্তির দিন গুনছে । বস্তুত গোটা
দ্বীপটি বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে এবং এখানকার স্বাভাবিক আবহাওয়া অনেকাংশে
পরিবর্তিত হয়েছে । পর্যটন শিল্পের দরুন জনসংখ্যা পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে
দ্বীপটিতে । ২০১৭-র আদমশুমারি অনুযায়ী এখানকার মোট জনসংখ্যা ৭,৭৫০ । যার
মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ আজো নিজেদের ‘রাপা নুই’ অর্থাৎ দ্বীপটির
প্রকৃত উত্তরাধিকারী বলে মনে করে । আনুমানিক ১২০০ খ্রিস্টাব্দে
পলিনেশিয়ান-রা এসে পৌঁছেছিল এই আগ্নেয়-দ্বীপে, জনবসতি স্থাপন করেছিল ।
তারাই দ্বীপের নাম রাখে ‘রাপা নুই’ । তারাই আগ্নেয় পাথর খোদাই করে বানায় ঐ
দৈত্যাকার মূর্তিগুলি । বহন করে আনে কোনো আশ্চর্য উপায়ে ‘রানো রারাকু’-নামক
জলাভূমির চারিপাশে । বেশ কিছু মূর্তি বহনকালে আকস্মিক পতনের ফলে পড়ে গিয়ে
ভেঙে যায় । সেগুলি আজও তেমনভাবেই পড়ে আছে । কিন্তু গত কয়েক দশকে ছত্রাক ও
শৈবালের সহাবস্থান অর্থাৎ ‘লাইকেন’-এর প্রভাবে মূর্তিগুলো দ্রুত কাঠিন্য
হারাচ্ছে । পাথর ক্ষয়ে কাদা-কাদা আস্তরণ তৈরি হচ্ছে মূর্তির গায়ে । বাকি
কাজটুকু করে দিচ্ছে সমুদ্রের জলরাশির একটানা ঝাপটা আর প্রচন্ড আর্দ্রতা ।
চিলির ন্যাশনাল ফরেস্ট কর্পোরেশনের (CONAF) কর্তা তাহিরা এডমন্ডসের মতে, আর
বড়োজোর একশো বছর । তারপর হারিয়ে যাবে এই মোয়াই । হারিয়ে যাবে বিরাট এক
রহস্য, কেন তৈরি হয়েছিল মোয়াই ? কি করেই বা দ্বীপের সাধারণ কৃষিজীবী মানুষ
অমন বিরাটাকার ২৫০ টন ওজনের মূর্তিগুলো সেযুগে প্রযুক্তিগত সুবিধা ছাড়াই
যত্র-তত্র বয়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল ? ঐ মোয়াইগুলো আদতে কী ?
দ্বীপের অতন্দ্র প্রহরী নাকি আরাধ্য দেবতা, নাকি নিছকই শিল্পকর্ম ?
প্রথমে
১৭২২ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল এক দুঃসাহসী ডাচ আবিষ্কারকের নজর পড়ে রাপা
নুইয়ের ওপর । সেদিনটি ছিল রবিবার, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র দিন
ইস্টার সানডে । সেই পবিত্র দিনটির নামেই উনি এর নামকরণ করলেন ইস্টার
আইল্যান্ড । তিন হাজার অধিবাসী অধ্যুষিত সেই দ্বীপে ডাচ দলপতি জ্যাকব
রগ্গেভীন তিনটি গোত্রের মানুষের সন্ধান পান । সেই তিন গোত্রের লোক ছিল পৃথক
গাত্রবর্ণ বিশিষ্ট — একদল ছিল গাঢ় কৃষ্ণ বর্ণ, আরেকদল লালচে রঙের যা রেড
ইন্ডিয়ানদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় । আর শেষ দল-টি ছিল লাল চুলওয়ালা শ্যামলা
গাত্রবর্ণ-বিশিষ্ট । দ্বীপটিতে তিনি আখ, কলা, ডুমুর ইত্যাদি শস্যের সন্ধান
পেয়েছিলেন বলে তাঁর লেখায় উল্লেখ আছে । তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক যে বস্তুটি
তিনি দেখতে পান তা হলো দ্বীপের প্রান্ত ঘেঁষে সমুদ্রের দিকে পেছন ফিরে
সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো অদ্ভুত মানব চেহারা বিশিষ্ট শত শত দৈত্যাকার
পাথরের মূর্তি বা মোয়াই । কঠিন আগ্নেয় শিলা খোদাই করে তৈরি এই মূর্তিগুলোর
সংখ্যা ছিল ৮৮৭টি । বস্তুত দ্বীপভূমিটি তখন অনেক বেশি সবুজ ছিল । বিখ্যাত
ব্রিটিশ নাবিক এবং আবিষ্কারক জেমস কুক ১৭৭৪ সালে ইস্টার আইল্যান্ডে গিয়ে
দেখতে পান, অল্প সংখ্যক মূর্তিই তখন দাঁড়ানো অবস্থায় রয়েছে । বেশিরভাগ
মাটিতে শায়িত অবস্থায় পড়ে আছে দ্বীপের চারদিকে, কিছু অর্ধনির্মিত আর কিছু
ছিল মাটিতে আংশিক বা পুরোটাই প্রোথিত । এখন প্রশ্ন হলো কারা এই দ্বীপে এত
বিশাল বিশাল মূর্তি তৈরি করেছিল ? কৃষক শেণির পলিনেশিয়ান-রা কি সত্যিই এত
ভালো খোদাইকর ছিল ? সেখানে যদি না তৈরি হয় তবে তা সুদূর জনবিচ্ছিন্ন দ্বীপে
কীভাবে এলো ? কারা নিয়ে এসেছিল সেই টন টন ওজনের মূর্তি ? যদি সেখানেই
বানানো হয় তবে সেই লোহার মতো শক্ত পাথর খোদাই করার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি
তারা কোথায় পেয়েছিল ? নাকি নিজেরাই সে সব আবিষ্কার করেছিল ? নাহ্, এর কোনো
সঠিক উত্তর আজও মেলেনি । উত্তর রয়ে গেছে অজানা আর তা জানার জন্য আজও চলছে
বিস্তর গবেষণা ।
লোকবিশ্বাস
দুরকম, একদল মনে করে, এ হলো ভিনগ্রহবাসীর কাজ । তাদের এমন ধারণার পেছনে
ছিল রাপা নুই দ্বীপে আবিষ্কৃত কিছু শিলালিপি যা ‘রোংগো-রোংগো’ নামে পরিচিত,
আর পাথরের গায়ে স্পেস স্যুট পরা বেশ কিছু হাতে আঁকা ছবি । সে সময় প্রশান্ত
মহাসাগরীয় অঞ্চলের জনগণ লিখতে জানত না । তা হলে কি করে সেই জনবিচ্ছিন্ন
দ্বীপ ‘রাপা নুই’-এর লোকেরা লিখতে শিখেছিল ! তাদের সে লেখার পদ্ধতি ছিল
একেবারেই স্বতন্ত্র । লেখাগুলির অর্থ আজও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি । তবে, কে
তাদের লিখতে শিখিয়েছিল ? কোথা থেকে তারা এই অভিনব লেখা শিখে এসেছিল ? এমন
লেখা তো পৃথিবীর আর কোনো অঞ্চলে দেখা যায় না । প্রশ্ন উঠে তা হলে কি সেই
ভিনদেশি গ্রহবাসীই তা শিখিয়েছিল দ্বীপবাসীকে ! রাপা নুই দ্বীপ বা ইস্টার
আইল্যান্ডের হারিয়ে যাওয়া বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা আর দ্বীপের চারদিক ঘিরে
দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বিশাল পাথুরে মূর্তি নির্মানের ব্যাপারটি সত্যি রহস্যময়
। অপর দল মনে করে, পলিনেশিয়ান-রাই মোয়াই বানিয়েছে পাথরের তৈরি অমসৃণ
অস্ত্র দিয়ে । আর তারা মূর্তিগুলোকে বয়ে নিয়ে যায় নি । বরং, মূর্তিগুলো
নিজেরাই পায়ে হেঁটে স্ব-স্ব স্থানে পৌঁছেছিল । যে মূর্তিগুলি দ্বীপবাসীদের
নিরাপত্তা দিতে অক্ষম ছিল, সেগুলিই কেবল পথের মাঝে উলটে পড়ে রয়েছে । বস্তুত
মূর্তিগুলি-কে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া যে অসম্ভব নয় তার প্রমান, ডেভিড
অ্যাটেনবরো নির্দেশিত বি.বি.সি-র জন্য নির্মিত তথ্যচিত্র The Lost Gods of
Easter Island(2000), যাতে দেখানো হয়েছে বিপুল লোকবল ও সুদীর্ঘ গবেষণার পর
মূর্তিগুলির স্বাভাবিক গড়ন, ফোলা পেট ও তলদেশের কৌণিক ঢাল ইত্যাদি কাজে
লাগিয়ে দড়ি বেঁধে সেগুলিকে হাঁটিয়ে (দুলিয়ে দুলিয়ে) নিয়ে যাওয়া সম্ভব ।
হয়তো সেভাবেই দ্বীপবাসীরা তাদের প্রিয় মোয়াইদের হাঁটিয়েছিল ।
দ্বীপের
আবক্ষ মূর্তিগুলির গড় ওজন ১৪ টন এবং উচ্চতা ১৩-১৪ ফুট। অবশ্য একটি
অসম্পূর্ণ মূর্তি পাওয়া গেছে যার উচ্চতা ৬৯ ফুট ও ওজন ২৭০ টন। এ পর্যন্ত
৮৮৭ টি মোয়াই সম্পর্কে জানা গেছে, কিন্তু বর্তমানে ৩৯৪ টি মোয়াই দেখা
যায় । মূর্তিগুলোর মাথার অবস্থান মাটির উপরে এবং বাকি অংশটুকু মাটির নিচে ।
হাওয়াই ইউনিভার্সিটির টেরি হান্ট এবং ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির
কার্ল লিপো-র নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের সাথে মিলে
পরীক্ষা করে দেখেছেন, ১৮ জন মানুষ একটি ৫ টন ওজনের ১০ ফুট লম্বা মোয়াই ৩ টি
শক্ত রশি এবং নির্বাচিত বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া দ্বারা মাত্র কয়েক’শ মিটার
পর্যন্ত সরাতে সক্ষম । এবার কি চিন্তা করা যায় যে, ৩৩ ফিট লম্বা ৮২ টন
ওজনের মোয়াই কিভাবে সরিয়েছিল সে সময়কার মানুষ ? বিস্ময়কর বিষয় বটে !
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন মূর্তিগুলো দেশের অভ্যন্তরভাগের দিকে
মুখ করে বানানো হয়েছে ? গবেষকরদের মতে, তখনকার অধিবাসীরা মনে করতো তারা
বাদে এই পুরো জগতে আর কোন মানুষ নেই । তাই আক্রমণকারীরা সমুদ্র পথে আসবে না
বরং দ্বীপের বাসিন্দাদের মধ্যেই কেউ সংকটের কারণ হবে, যার কারণে
মূর্তিগুলোকে ভেতরের মুখ করে রাখা হয়েছিলো দ্বীপ রক্ষার জন্যে, বা বলা ভালো
দ্বীপবাসীদের নজরে রাখার জন্য । ১৭ হাজার একরের এই দ্বীপটিতে বছরে প্রায়
৫২ হাজার পর্যটক আসেন । ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো এই দ্বীপকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ
সাইট হিসেবে ঘোষণা করে । সমুদ্রবক্ষ থেকে দ্বীপের দিকে তাকালে মনে হবে,
দৈত্যাকার দ্বীপবাসীরা যেন সারিবদ্ধভাবে কিসের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ।
এর মধ্যে বেশ কিছু মূর্তি দেখা যায়, যাদের মাথায় থাকে হ্যাট বা টুপি, যার
পোশাকি নাম ‘পুকাও’। যা পলিনেশিয়ার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের পরিহিত লাল
পালকের আবরণের কথা মনে করায় । অনেকেই এটাকে শক্তি ও আভিজাত্যের বহিঃপ্রকাশ
বলে অভিহিত করেছেন । আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত, প্রচুর বৃক্ষচ্ছেদন,
পক্ষী-নিধন (ফলস্বরূপ, প্রাকৃতিক উপায়ে উদ্ভিদের বীজের ব্যাপ্তি সংকোচন)
রোগজীবাণু ও ইঁদুরের আগমন (গাছের মূল ও বীজ-সমেত ফল খেয়ে ফেলে, দ্রুত
বংশবৃদ্ধি প্লেগ ডেকে আনে) দ্বীপবাসীদের জীবনধারণ দুর্বিষহ করে তোলে ।
অনেকে দ্বীপ ত্যাগও করে । আজকের ইস্টার আইল্যান্ডের প্রকৃত বাসিন্দা আসলে ঐ
মূর্তিগুলোই, ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ যার সামগ্রিক বিলুপ্তি নিশ্চিত করে তুলেছে
।
৩
/ মাচুপিচু : এবার আমরা রওনা দেব দক্ষিণ আমেরিকার চিলি থেকে পেরু-তে,
মাত্র ৪,২১৫ কিলোমিটার দূরে ( বিমানে চার ঘন্টার রাস্তা )। কারণ, এই পেরু
থেকেই আমরা যাব, এক লুপ্ত সভ্যতার স্মারক, মাচু-পিচু নগরী-তে । পেরুর
রাজধানী লিমা থেকে ৩৫৭ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে ইনকাদের প্রাচীন রাজধানী কুচকো
অবস্থিত । কুচকো থেকে ৫০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে দুটি ক্রমোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের
মধ্যবর্তী উচ্চ উপত্যকা অর্থাৎ শৈলশিরা-সংলগ্ন উপত্যকায় এই প্রাচীন শহরটি
তৈরি করা হয়েছিল । কলম্বাসের অভিযানের পূর্বে, ইনকা-দের সমৃদ্ধ সভ্যতার
চূড়ান্ত উৎকর্ষের প্রমাণ এই প্রাচীন নগরী, যার স্থাপত্য ও নির্মাণ-শৈলী আজ
এক বিস্ময় । মোটামুটিভাবে ১৪৩৮ থেকে ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইনকা সভ্যতার
সময়সীমা । ইতিহাসে একে প্রাক-কলম্বিয়ান যুগ বলা হয়ে থাকে । চারটি যুক্ত
প্রদেশের সমষ্টি এই সভ্যতা সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছায় ১৫২৫ খ্রিষ্টাব্দে ।
সেইসময় ফ্রান্সিসকো পিজার্রো আর ভাস্কো নুনেজ দে বালবোয়া সম্মিলিতভাবে
দক্ষিণ সমুদ্রে শ্রমিক ও ক্রীতদাসের সন্ধান চালাচ্ছিলেন । সেসময়
অভিযাত্রীদের কাছে পেরু ছিল এক নতুন ভুবন । ১৫৩২ সালের ১৫ই নভেম্বর
পিজার্রো ও তার ভাইয়েরা মিলে ইনকা-দের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত নগরগুলিতে আক্রমণ
চালিয়ে লিমা অবধি পৌঁছে যান । তৎকালীন ইনকা সম্রাট ‘আতাহুয়ালপা’ পরদিনই
স্প্যানিসদের ফাঁদে পা দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন । অসংখ্য ইনকা-জনজাতি প্রাণ দেয়
। সভ্যতার পতন ঘটে । কিন্তু মজার ব্যাপার হল, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায়
২,৪০০ মিটার (৭,৮৭৫ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত মাচু-পিচু কুয়াশা ও মেঘের অন্তরালে
আত্মগোপন করে থাকায়, তা শত্রুদের নজরেই পড়ে নি । ফলে বিরাট ধ্বংসের হাত
থেকে বেঁচে যায় এই ঐতিহাসিক শিল্প-কীর্তি ।
অধিকাংশ
প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মনে করেন, পাচাকুটি (১৪৩৮-১৪৭১) ব্যক্তিগত রাজ-তালুক
হিসেবেই এই নগরী নির্মাণ করেন । প্রত্নতত্ত্ববিদ হিরাম বিংহ্যাম দাবি করেন,
দুই মহান ইনকা শাসক পাচাকুটি (Pachacutec Inca Yupanqui) ও তুপাক (Túpac
Inca Yupanqui) দশ-বছর সময়সীমার মধ্যে নগরীর নির্মাণকার্য সম্পন্ন করেন ।
প্রায় ৩২৬ বর্গক্ষেত্র জুড়ে এই নগরী নির্মিত হয় ।
আন্দিজ
পর্বতমালার অন্তর্গত একটি পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত ইনকাদের সেই হারানো শহর
মাচুপিচু । এখন অবশ্য গোটা পাহাড়টিরই নাম হয়ে গেছে মাচুপিচু । শহরটির
অবস্থান ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত । অন্যদের পক্ষে এই শহর খুঁজে পাওয়া যেমন
দুষ্কর ছিল, তেমনি খুঁজে পাওয়ার পর শহরটিতে আক্রমণ করাও দুঃসাধ্য ছিল ।
পাহাড়ের একটা দিক চূড়া থেকে একেবারে ৬০০ মিটার নিচে ‘উরুবাম্বা’ নদীর
পাদদেশে গিয়ে মিশেছে । অন্যদিকে হুয়ানা-পিচু নামের আরেকটি পর্বত খাড়া
ওঠে গেছে আরও কয়েক হাজার ফুট উঁচুতে। সুতরাং দুই দিক দিয়েই শহরটি
সুরক্ষিত ছিল প্রাকৃতিকভাবেই । যেন এক দুর্গনগরী । সেখানকার মানুষজন ছিল
সূর্য উপাসক । এত উঁচুতে কীভাবে তারা একটা আস্ত শহর তৈরি করে ফেলল সেটাই
সবচেয়ে বিরাট রহস্য ! তাও আবার অত বছর আগে ! মাচুপিচু নির্মিত হয়েছিল
১৪৫০ সালের দিকে । এর ১০০ বছর পরেই স্প্যানিশরা ইনকা সাম্রাজ্য আক্রমণ করে
। ধ্বংস করে ফেলে তাদের বেশির ভাগ শহর । যদিও ওরা মাচুপিচু শহরটি খুঁজেই
পায়নি তবুও মানুষজন না থাকার কারণে শহরটিও ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে ।
কয়েক’শ বছর ধরে তো মানুষ এই ঐতিহাসিক শহরটিকে খুঁজেই পায়নি । ১৯১১ সালে
মার্কিন গবেষক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ বিংহ্যাম মাচুপিচু শহরটি আবিষ্কার করেন ।
‘মাচু পিচু’ শব্দের অর্থ ‘প্রাচীন পর্বত’ । শীতকালীন রাজধানী হিসেবে
নগরী-টি ব্যবহৃত হতো । দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিসদের আক্রমণে ইনকা সভ্যতার
পতন ঘটে এবং এদের অধিকাংশ শহর ধ্বংস হয়ে যায় । স্প্যানিশদের আক্রমণে ইনকা
সভ্যতার একটি বিরাট অংশের জন-জাতি নিহত হয় । বাকিরা বিভিন্ন স্থানে
আত্মগোপন করে । ফলে একসময় মাচুপিচু পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হয়ে পড়ে ।
সেইসময়েই বহিরাগত স্প্যানিসদের শিবির থেকে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে ইনকাদের
সাম্রাজ্যে, পরে যা মহামারীর আকার নেয় ও অবশিষ্ট ইনকাদের মৃত্যুর কারণ হয় ।
তারপর ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ২৪ শে জুলাই নগরী-টি আবিস্কৃত হয়, প্রায়
ধ্বংসাবশেষ-রূপে । ১৯৭৬ সাল থেকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে মূল নগরীর
আভ্যন্তরীণ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি ( অর্থাৎ নগরীর তিরিশ শতাংশ )
পুনর্নিমাণ ও সংরক্ষণের কাজ শুরু হয় । ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো এটি-কে ‘ওয়ার্ল্ড
হেরিটেজ সাইট’-এর স্বীকৃতি দেয় । ২০০৭ সালে দুনিয়াজোড়া বিপুল গণভোটে
‘বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যে’র অন্যতম হিসেবে মাচু-পিচু পরিচিতি পায় ।
বর্তমানে
কেবল মাচুপিচুর ঘরের পাথুরে দেয়াল-টুকু পাওয়া যায় । সম্ভবত এর ছাদ ছিল
কাদা ও ঘাস দিয়ে তৈরি । দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ছাদগুলি সম্পূর্ণ
ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে । এই সব বাড়িগুলো পাহাড়ের গা ঘেঁষে ধাপে ধাপে তৈরি করা
হয়েছিল । আর পাশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল সিঁড়ি-পথ । উপত্যকার মাঝের অংশে
ঘিরে ধাপে ধাপে তৈরি করা হয়েছিল কৃষিভূমি। ফলত, মাচুপিচুকে নগরাঞ্চল ও
কৃষিক্ষেত্র - এই দুটি ভাগে ভাগ করা যায় । এর কৃষি প্রান্তকে ছুঁয়ে তৈরি
হয়েছিল কৃষকদের বাড়িগুলি । আর অভিজাত শ্রেণি, সৈনিক, সরকারি কর্মচারীরা
থাকতেন কৃষি প্রান্ত থেকে একটি দূরে বা উঁচু ধাপগুলিতে । মাচু পিচুর বেশির
ভাগ স্থাপত্য নির্মিত হয়েছে আয়তকার পাথরের খণ্ড একটির উপর অপর একটি
নিপুণভাবে বসিয়ে । এক্ষেত্রে চুন, সিমেন্ট বা মাটির গাঁথুনি ব্যবহারই করা
হয় নি । এভাবে শুধুমাত্র দ্বাদশ-কোণ-যুক্ত পাথর গেঁথে তৈরি নির্মাণশৈলীকে
‘অ্যাসলার’ বলে । দেয়ালগুলো ভিত্তি থেকে উপরের দিকে কিছুটা সরু হয়ে উঠেছে,
ফলে একটু হেলানোভাবে তৈরি হয়েছে । এই প্রক্রিয়ায় পাথরের ব্লকগুলোর বাইরের
দিকটা মসৃণ হয় । ভেতরের দিকটা হয় এবড়ো-খেবড়ো । একটা পাথরের সাথে আরেকটা
পাথর এমনভাবে খাপে-খাপে বসানো হয়েছে যে, একটা তীক্ষ্ণ ছুরিও দুটো পাথরের
মাঝখানে প্রবেশ করানো অসম্ভব । কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য অবশ্য তৈরি
হয়েছিল, মাটির গাঁথুনি ব্যবহার করে, যার দরজা জানালাগুলো ঘরের ভেতরের দিকে
খানিকটা হেলানো । মাচু পিচু নগরীতে মোট ১৪০টি পাথরের স্থাপত্য রয়েছে। এর
ভিতরে রয়েছে বাসস্থান, মন্দির, স্যাংচুয়ারি (ধর্মীয় পবিত্র উপকরণ রাখার
জন্য), প্রমোদ-উদ্যান ইত্যাদি । সব মিলিয়ে শহরে একশ'টার মত সোপানযুক্ত অংশ
পাওয়া যায় । এর কোন কোনটি বা হয়তো সবগুলো সোপান একেকবারে, একটাই মাত্র
গ্র্যানাইট কেটে বানানো । ১৬ টি ঝরণা দিয়ে সম্পূর্ণ জল-পরিবহনের ব্যবস্থা
করা হয়েছিল । পাথর ছিদ্র করে পানীয় জল যাতায়াতের পথ বানানো হয়েছিল । প্রায়
আধ মাইল দূরের প্রাকৃতিক জলের উৎস থেকে, মাচুপিচু নগরীতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জল
সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছিল । ২০০টি বাসভবন ছিল এবং সেখানে প্রায় ১০০০
এর মতো মানুষ বসবাস করতো । ধারণা করা হয়, মাচু পিচুতে আবাদযোগ্য অনেক জমি
থাকায় ইনকারা এখানে বসতি স্থাপন করেছিল । কোনো কোনো প্রত্নতত্ত্ববিদদের
মতে, এখানে ইনকা জনবসতি গড়ে উঠেছিল মূলত কোকো চাষের জন্য । কিন্তু মাচু
পিচুর রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে বেড়িয়ে এসেছে ভিন্ন তথ্য — বিশেষ করে ধর্ম
সংক্রান্ত উৎসবাদি এবং অন্যান্য উৎসব পালনের নিমিত্ত নির্মিত হয়েছিল এই শহর
। এই শহরে রয়েছে অনেক ধর্মীয় উপাসনালয়, যেগুলো অত্যন্ত সাবধানতার সাথে
নির্মিত হয়েছিল । তারই মধ্যে একটি হলো, সূর্যদেবের মন্দির । সেটি একটি
নিখুঁত পাথরের কারুকার্যপূর্ণ অর্ধবৃত্তাকার মিনার, যা মানমন্দির হিসেবে
ব্যবহৃত হতো । আরেক বিস্ময় হলো, এখানকার কন্ডোরের মন্দির, ইনকার চিত্রকরেরা
এখানে একটি ত্রিমাত্রিক শকুনের ছবি খোদাই করেছিলো । এর কারণ আজও অজানা ।
এমনকি ঐ মন্দিরের গর্ভগৃহে একটি মমি পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে । বলাই বাহুল্য,
ইনকা-দের অনেক কীর্তি-ই আজ অজানা রহস্যে পর্যবসিত হয়েছে । আর এরকম আরো অনেক
রহস্য ছড়িয়ে আছে দুনিয়া-জুড়ে ।
(লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)
(লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)



Comments
Post a Comment