নবাব সরফরাজ খান এর ফৌতি মসজিদ বা ফুটি মসজিদের খোঁজে একদিন।


লেখক- যোগেন বিশ্বাস






 অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম নবাব সরফরাজ খানের ফুটি মসজিদ বা ফৌতি মসজিদ দেখতে যাব এবং তার চূড়ায় উঠবো।
অবশেষে সেই সুযোগ এল ফৌতি মসজিদ যদি কারো দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা হয় তাহলে দুই ভাবে যাওয়া যায়,প্রথমতঃ মুর্শিদাবাদ রেলস্টেশনে নেমে সোজা লাইন বরাবর প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে গেলেই ১৪৩ নম্বর রেলগেটের পূর্ব পাশে দেখতে পাবেন বৃহদাকার এই মসজিদটি।দ্বিতীয়তঃ কাটরা মসজিদের সামনের রাস্তা পার হয়ে সোজা পশ্চিম দিকে যে পাকা রাস্তা চলে গেছে প্রায় এক কিলোমিটার টোটো তে চেপে গেলেই রেল গেটের পাশে দেখতে পাবেন এই ঐতিহাসিক মসজিদটি।

 তৃতীয়তঃ হাজারদুয়ারি থেকে টোটোতে কুড়ি টাকা ভাড়া দিয়ে চেপে পূর্বদিকে দেড় কিলোমিটার গেলেই ১৪৩নম্বর রেলগেট এর পাশেই দেখতে পাবেন বাংলার তৃতীয় নবাব সরফরাজ খান এর নির্মিত এই বিশাল আকৃতির মসজিদটিকে।
যদিও আমি মোটরসাইকেলে জিয়াগঞ্জ থেকে সোজা কাটরা মসজিদের সামনের রাস্তা দিয়ে পৌঁছে গেলাম ফুটি মসজিদের সামনে।
সত্যি কথা বলতে কি শিয়ালদহ- লালগোলা রেললাইনের পাশেই এই বিশাল আকৃতির মসজিদটি । "তথ্য" অনুযায়ী ১৭৩৯ থেকে ১৭৪০ সাল পর্যন্ত ছিল সরফরাজ খানের রাজত্বকাল। সেই সময় কালের তৈরি মসজিদটি অর্থাৎ ২৮০ বছর আগের এখনো দাঁড়িয়ে আছে আগের মতই।

সে যাক, যে কথা বলছিলাম মসজিদের পাশে এসে দাঁড়ালাম তার দৈর্ঘ্য ৪০ মিটার, প্রস্থ ১২ মিটার এবং উচ্চতা সম্ভবত ১৩ মিটার বা তার চেয়ে কিছু বেশি ।
ভেতরে ঢুকলাম অবাক হলাম এবং দেখলাম মসজিদটি আসলে একটি দূর্গের মত চারপাশে চারটি মিনার আছে এবং তার ভেতর দিয়ে সরু সিঁড়ি আছে যা দিয়ে মাত্র একজন লোক সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে পারে অর্থাৎ মনে হচ্ছে যেন চোরা সিঁড়ি সহজে কেউ বুঝতে পারত না। এটুকু বুঝলাম অনুযায়ী নবাব সরফরাজ খান মুর্শিদকুলি খানের দৌহিত্র তিনি চেয়েছিলেন একটি অক্ষয় কীর্তি নির্মাণ করতে। বিশাল চওড়া গাঁথনি ছোট ছোট ইট এবং প্রবেশপথের যে দরজা তা হচ্ছে কালো পাথরের তৈরি।
প্রথম যখন গিয়েছিলাম সেই সময়ের কথা তখন আমার সাথে অন্য কেউ ছিল না। তাই নিষেধ করারও কেউ ছিলনা আর বহু দিনের ইচ্ছে ছিল যেদিন হোক ওই ঐতিহাসিক মসজিদের চূড়ায় উঠবো। মিনারের গা ঘেঁষে শুরু চক্রাকার সিঁড়ি বেয়ে মসজিদের উপরে উঠতে শুরু করলাম।
উপরে ওঠার সময় সত্যি বলতে একটু ভয়ও পেয়েছিলাম কারণ ৩৮০ বছরের পুরনো মসজিদ পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে যেখানে মানুষের যাতায়াত খুব কম এখানে অবশ্য অবশ্যই বিষধর সাপ বা অন্য কিছুর আড্ডা থাকতেই পারে। আর আমার এইসব কাজ গুলোই ভাল লাগে যেখানে একটু ভয় ভয় ভাব থাকে।

মোবাইল বুকপকেটে ভিডিও অন করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম এরপর গম্বুজের কাছাকাছি যাবার জন্য তৈরি হলাম থেকেই কিন্তু খুব বিপদজনক পরিস্থিতি মাত্র একটি পা রাখার জায়গা আছে, আর সেখান থেকে একবার পা ফসকে গেলে মৃত্যু অনিবার্য। এদিকে প্রচন্ড জেদ হলো মনে এত কাছাকাছি এসেও হেরে গেলে চলবে না অতএব খুব সন্তর্পনে পা ফেলে উঠে গেছিলাম বা উঠতে লাগলাম এরমধ্যে বিপত্তি, একবার পা ফসকেও গেল ।এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম একটাই কারণ, মসজিদের দেওয়াল দেওয়াল ফেটে বেরিয়েছে কিছু গাছপালা একটা সরু গাছ ধরে ছিলাম এবং নিজেকে সামলে নিলাম।
যাইহোক উপরে উঠে মনে হল যেন পর্বত জয় করেছি। ওখান থেকে বেশ কিছু ছবি তুললাম এবং দেখলাম নবাব সরফরাজ খানের স্বপ্নের অসমাপ্ত ফৌতি মসজিদ।
গাঁ কাঁপছিল তবুও গম্বুজের চারপাশে সতর্কভাবে সাবধানে হেঁটে হেঁটে খুব কষ্টে পুরোটাই ঘুরে দেখলাম এবং নিচের বাড়িঘরগুলো অনেক ছোট মনে হচ্ছিল।


সবচেয়ে বড় কথা উপরে উঠার সহজ কিন্তু নিচে নামা আরো বিপদজনক। কি করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না কোথায় রাখি পা? কিছুক্ষণ বসে থাকার পর খুব সাবধানে আবার নামতে শুরু করলাম। অবশেষে নিচে নামলাম আপনারা যারা বাইরে আছেন তারা মুর্শিদাবাদে এলে দেখতে পাবেন অসাধারণ কাজ তার নির্মাণশৈলী বর্তমান সময়ের যথেষ্ট ভাবনার।
এই মসজিদের কারুকার্য অসাধারণ এবং একসাথে বহু মানুষ নামাজ পড়তে পারতেন। এখনো সময় আছে যদি মসজিদটিকে সংস্কার করা হয় এবং ১০ টাকা টিকিট করা হয় তাহলে নির্মাণের টাকা উঠে যাবে, এছাড়া ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে এবং ইতিহাসের একটি নতুন দিগন্ত খুলে যাবে।
বাংলার আনাচে কানাচে বা মুর্শিদাবাদের অলিন্দে যেসব চাপা পড়া ইতিহাস কালের গর্ভে নিমজ্জিত সেগুলো মানুষের জানা দরকার। ইতিহাসকে চাক্ষুষ করলে মানুষের সে তৃপ্তি আলাদা। সরকারের কাছে আবেদন মসজিদটি সংরক্ষণ করা হোক এবং সংস্কার করা হোক।
গিরিয়ার যুদ্ধ শুরু হওয়ার বহু পূর্বেই এই মসজিদের কাজ শুরু হয়েছিল এবং তারপর এর গতিতে কিছুটা ভাঁটা পড়ে যায়, তার কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। আস্তে আস্তে কিছু বিশ্বাসঘাতক ষড়যন্ত্রকারী নবাব সরফরাজ খান কে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য চক্রান্তের শামিল হয়।


উপরে যে কথা বলতে যাব লেখা শেষ করার আগে কিছু ইতিহাস তুলে না ধরলে লেখার সম্পূর্ণতা লাভ করবে না বা আপনাদেরও ইতিহাসের ক্ষুধা নিরসন হবে না। এবার লিখব নবাব সরফরাজ খানের সমকালীন ইতিহাসের দু-চার কথা।
আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর পেছনে ফিরে যেতে হবে আমাদের। এবং শুরু করব মুর্শিদকুলি খাঁ থেকেই।
১৭০৪খ্রিস্টাব্দে ঢাকা থেকে মুর্শিদকুলি খান তার রাজধানী স্থানান্তরিত করেন মুখসদাবাদ।১৭২৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ শে জুন মুর্শিদকুলি খানের মৃত্যু হওয়ার পূর্বেই মুর্শিদকুলি তার দৌহিত্র সরফরাজ খাঁ কে পরবর্তী নবাব হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। এবং নবাব হওয়ার তোড়জোড় চলতে থাকে।
যাইহোক প্রতীকী হিসেবে হলেও ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে একবার নবাবের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরেও তার বাবা অর্থাৎ মুর্শিদকুলি খাঁর জামাই সুজাউদ্দিন খান নবাব হন। পরবর্তীতে ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে সরফরাজ খানের বাবা সুজাউদ্দিন এর মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী নবাব হন তার পুত্র সরফরাজ খান।
সরফরাজ খান এর দুর্ভাগ্য, তিনি তার নিজের ডেপুটি হিসেবে যাকে উড়িষ্যায় নিয়োগ করেছিলেন আলীবর্দী খাঁ কে ।
সেই ৭০ বছর বয়সী আলীবর্দী খাঁ । মসনদে বসবার জন্য বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন সরফরাজ খান কে সরিয়ে নিজে নবাব হওয়ার জন্য।
নবাব সারফরাজ খান সিংহাসন লাভের পর মাত্র সময় পেয়েছিলেন ১৩ মাস, এবং এই ১৩ মাসের মধ্যেই অতর্কিতে বা যা প্রত্যাশিত ছিল না আলিবর্দীর বিপুল পরিমাণে সৈন্যসম্ভার এর ক্ষমতা অনুযায়ী প্রত্যাশিত মত আলীবর্দী নবাব হন।
যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় হাতির পিঠে শত্রুসৈন্যের গুলির আঘাতে মৃত্যু হয় নবাব সরফরাজ খানের।
সরফরাজ খানের মৃত্যুর পরেও তার মৃতদেহ তার সৈন্যরা বহন করে নিয়ে আসে এবং তার মৃতদেহ কবর দেন বর্তমান মুর্শিদাবাদের স্টেশনের পাশে নাগিনাবাদের প্রাসাদ অভ্যন্তরে যা বর্তমানে অত্যন্ত অবহেলায় পড়ে আছে।
নবাব সরফরাজ খানের সময় প্রজারা সুখী ছিল এবং যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছিল তার প্রমাণ রয়েছে অথচ তার নামে অনেক কুৎসা বা অপব্যাখ্যা হয়েছে ইতিহাসের পাতায়।


যুদ্ধক্ষেত্রে সরফরাজের মৃত্যুর পরেও যুদ্ধ থামেনি তার সৈন্যরা যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন কিন্তু অত্যন্ত চতুর আলীবর্দী ওতার বৃহৎ সৈন সম্ভারের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়।
পরিশেষে বলব আলীবর্দী ছিলেন সরফরাজ খাঁর উড়িষ্যার ডেপুটি হিসেবে কর্মরত অথচ নিজের প্রভুকে হত্যা করল অন্যায় যুদ্ধ এবং তার মায়ের কাছে ক্ষমাও চেয়েছে তার কৃতকর্মের জন্য, ব্যস ওইটুকুই।
সারফরাজ খাঁর মৃত্যুর পর তার স্বপ্নের এই মসজিদ যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থায় বা অসমাপ্ত হয়েই রয়ে গেছে।
পরবর্তীতে আলীবর্দী বা সিরাজদৌলা অথবা মীরজাফর মীর কাসিম পরবর্তী নবাবরা এই মসজিদটি নির্মাণের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি এটা বড় দুর্ভাগ্যের।
যে কথা লিখলাম যারা পরস্পর বিরোধী ইতিহাস লিখেছেন বা লিখছেন তারা একটু ভেবে দেখবেন নবাব সরফরাজ খান পরে তার এই বৃহদাকার সুন্দর মসজিদটির ব্যাপারে কেন আগ্রহ দেখাননি?
আসলে সবাই সবার ক্ষমতা নিয়ে ব্যস্ত ছিল আর ব্যস্ত ছিল নিজের গদি টিকিয়ে রাখার।
এটাই ঘটে আসছে কারবালার প্রান্তরের যুদ্ধ, রামায়ণের যুদ্ধ, ভারতের যুদ্ধ এই যুদ্ধগুলোর প্রত্যেকটা উদ্দেশ্য ছিল আসলে ক্ষমতা দখলের লড়াই।
ইংরেজ ক্ষমতায় আসার পর ১৮ দশকের সময় শিয়ালদা- লালগোলা রেল লাইন চালু হয় কয়েক লক্ষ বার ট্রেন যাতায়াত করেছে ঠিক কত বছর চলে গেছে কতবার সূর্য উদয় এবং অস্তমিত হয়েছে, কিন্তু আজও নবাব সারফরাজ খান এর অসমাপ্ত ফুটি মসজিদ বা ফৌতি মসজিদ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এবং প্রমাণ করছে: 

বল বীর, উন্নত মম শির।।

Comments

  1. ভীষণ ভালো লাগলো পড়তে | অজানা
    অনেককিছু জানতে পারলাম | আপনার ভ্রমন আর কলম এগিয়ে চলুক অজানাকে মানুষের দরবারে হাজির করবার জন্য |

    ReplyDelete
  2. অজানা ইতিহাস জেনে খুব ভালো লাগছে ।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস