অতীত ছুঁয়ে আছে "আরোরা সিনেমা কোম্পানি "
লেখিকা - প্রিয়াঙ্কা সরকার
আত্মমগ্নতা হলো প্রেরণার ভিত্তিমূল । অবিশ্বাসের দল যখন উপহাসে বেঁধেছে, তখন তাঁরা বিশ্বমানবের কল্যাণে ধ্যানস্থ হয়েছে। প্রতিকৃতিকে নির্বাকের যুগে প্রাণবন্ত করে মানুষের চোখে উজ্জ্বলতার ধারা বর্ষণ, এও কম কথা কি! শিল্পের মাত্রা প্রয়োগের মাঠ পেরিয়ে সাফল্যের সচল আত্মার বহির্প্রকাশ। আসলে হৃদয়ের গহীনে ধ্যানস্থ চেতনা যখন অনুভব করে প্রতিলিপি কালের সাধনা, তখন সাফল্য আর স্বীকৃতি তো বহিঃপ্রকাশ, কৃষ্টি আলোকের আত্মনিয়োগ নিয়েই তো স্বীকৃতি সাফল্য সার্থকতা পায়।
ঐকান্তিক সাধনা কি ব্যর্থ হতে আছে! নির্বাকের মুখে সবাক আলাপ এঁকে দিলেন প্রসার চলচ্চিত্র। যেমন করে কালের হাতে পুতুল হয়েও নিয়তির বুকে স্বর্গত হীরালাল কে ভুলতে নেই, তেমনি স্বর্গত সেনের পরবর্তী স্বর্গত দেবী ঘোষ কেও ভুলতে নেই। হ্যাঁ, আরোরা সিনেমা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। সেদিনের রূপকুমারী মফস্বলের রহস্য শিহরণ। পল্লিতে পল্লিতে প্রদর্শনীর আমেজ, তাঁবুর বাইরে প্রতীক্ষীয়মান অধৈর্য মুহুর্তগুলি, কিন্তু ছবি দেখার নেশা কোনোদিন মেটে নি।
১৮৮৫ - ৮৬ খ্রিস্টাব্দে ২, কাশীমিত্র ঘাট স্ট্রীটে স্বর্গত দেবী ঘোষ জন্মগ্রহণ করেন। প্রাচীন বনিয়াদ বংশ। পিতা স্বর্গত জ্যোতিপ্রসাদ ঘোষ ছিলেন স্বনামধন্য এর্টনি। পিতামাতার ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। প্রথম দিকে ইন্ডিয়ান আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। আর্ট স্কুলের স্বত্বাধিকারী ছিলেন মন্মথমোহন চক্রবর্তী। তাঁর ভ্রাতা শ্যামা চক্রবর্তী ছিলেন ফটোগ্রাফি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক। দেবীবাবুও অঙ্কন ও ড্রাফটম্যানশিপ নিয়ে পড়তে থাকেন। আর্ট স্কুলে দেবী বাবু ৫ বছর শিক্ষালাভ করেন।
সময়টা ১৯০৫ ; লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের বিরুদ্ধে মাতলেন, দেবীলালও। কিন্তু পিতা, ছেলের জন্য চাকরি ঠিক করলেন। তখন আরোরা ফ্লিম কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতার ভ্রাতা স্বর্গত জানকীনাথ
বসুর একটি ফটোর দোকান ছিলো। দেবীবাবু দোকানটির তদারকি করতেন৷ পিতা দেখলেন ছেলের রাজিনীতিতে ঝোঁক৷ চাকরি করবে না বলছে। তাহলে বিত্তশালী সুন্দরী কন্যার সাথে ছেলের বিবাহ ঠিক করলেন৷ সুযোগ বুঝে দেবীবাবু পালিয়ে ভাগলপুরে এক বোনের বাড়িতে উপস্থিত হলেন। সেখান থেকে ফটোগ্রাফার হিসাবে তাঁর যাত্রা শুরু হলো। সেইসময়ের ভাগলপুরের ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন অল্পবয়স্ক এক ইংরেজ ভদ্রলোক, দেবীবাবুর ছবি দেখলেন এবং পছন্দ করে নিলেন। তিনি সরকারি কিছু চিত্রগ্রহণের জন্য দেবীবাবুকে অর্ডার দিলেন। এরইমধ্যে নিউ থিয়েটার্সের রসায়নাগরিক সুবোধ গঙ্গোপাধ্যায়ের পিতা প্রমথবাবুর সাথে বেশ আতিথ্য গড়ে ওঠে৷ বাড়িতেও তাঁর অজ্ঞাতবাসের কথা সকলে জানতে পায়৷ শোনা যায় স্বর্গত অনাদি বাবু মহাশয় তাঁকে আনতে গেলে তিনি বন্ধুর সাহচার্যে আবার পালিয়ে যান৷ অভিজ্ঞতা আর শিক্ষা কে তিনি গ্রামাফোন ও বায়স্কোপের সাহায্যে অনায়াস লব্ধ প্রজ্ঞা জ্ঞান লাভ করে ছিলেন।
এরপর কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের সময়তেই ১৯১১ সালে ৪৭, কাশীমিত্র ঘাট রোড, কলকাতায় গড়ে তুললেন অরোরা সিনেমা কোম্পানি৷ ১৯১২ সালে ১৮ ই ডিসেম্বর মজঃফরপুরে মি ও মিসেস কেনেডির কন্যার বিবাহোৎসব উপলক্ষ্যে আরোরা সিনেমা কোম্পানির প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়৷ হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন গ্যাসের সমন্বয়ে লাইম লাইট নামে একপ্রকার আলোয় এরা ছবি দেখাতেন। ধীরে ধীরে আরোরা কোম্পানির মতো এরাও বায়না নিয়ে চিত্র প্রদর্শন করতেন। তদানীন্তন কালে ভ্রাম্যমাণ চিত্র প্রদর্শক প্রতিষ্ঠানগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরানো ছবি কিনে আনতেন আর এইসব ছবিই তাদের প্রদর্শনের তালিকায় রাখতেন৷
আট বছরের মধ্যেই একটি প্রদর্শন মেশিন থেকে আটটি মেশিন ক্রয় হয়৷ কিন্তু দুর্ভাগ্য যে অগ্নিসংযোগ হলো, এবং প্রভূত ক্ষতির মুখে পড়লেন তাঁরা। তবুও এই কম্পানি কখনও নিজের স্বার্থ দেখে নি। ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে এদের কাছে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থই সবচেয়ে বড়ো ছিলো। শেষ পর্যন্ত তৈরি হলো টুরিং সিনেমা৷ শুধু সিনেমা নয়, এখানে নাট্যাভিনয়, ম্যাজিক, কলির অর্জুন সবটুকু দেখানোর ব্যবস্থা ছিলো। কলকাতার তদানীন্তন ভেনাস থিয়েটার এঁদের সঙ্গে থাকতেন। এরপর ধীরে ধীরে বিষবৃক্ষের খন্ড চিত্র তৈরি হয়। ১৯২১ সালে পূর্ণাঙ্গ নির্বাক চিত্র "রত্নাকর " মুক্তি পায়।
এইসময়ে ম্যাডান থিয়েটারের সর্বপ্রথম বাঙালি চিত্রশিল্পী হিসাবে স্বর্গত জ্যোতিষ সরকারের নাম চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯২১ সাল হলো সিনেমার খুঁটিনাটি পরীক্ষা নিরীক্ষার সময়কাল।
বিদ্যাসুন্দর " নির্মিত হয় ১৯২২ সালে। চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় সুরেন্দ্রনারায়ণ রায়। চিত্রগ্রহণ দেবী ঘোষ। নায়িকা চরিত্রে ছিলেন শ্রীমতি দুর্গারানি। এরপর মুক্তি পায় " কেলোর কীর্তি "; ১৯২৬ সালে কৃষ্ণসখা " মুক্তিলাভ করে। রত্নাকর ছবিটি ছিলো ৭ রিলের, কৃষ্ণসখা ৮ রিলের, বিদ্যাসুন্দর ১০ রিলের, এবং কেলোর কীর্তি ১০ রিলের। সামগ্রিক চিত্রে ইতিহাস আজ কেবলমাত্র তথ্য সম্বৃদ্ধ নয়,এ হলো উত্থানের গল্প, অনুপ্রেরণায় ইতিহাস এবং লৌকিক প্রাঙ্গনের চলচ্চিত্র কথা।
(লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)

Comments
Post a Comment