সুগন্ধি কিসসা


লেখিকা-মমতাজ শিরীন
 


 বর্তমান যুগে আমাদের প্রসাধনীর অন্যতম অঙ্গ হয়ে উঠেছে বিভিন্ন রকম সুগন্ধির ব্যবহার। সুগন্ধি ছাড়া যেন প্রসাধন অসম্পূর্ণই রয়ে যায়। শুধু বর্তমান যুগ বললে ভুল হবে বহু প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে সুগন্ধির ব্যবহার। মনমাতানো সৌরভে সুরভিত হয়ে আমাদের মন, এ যেন আভিজাত্যের প্রতীক!
পারফিউম শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ "per fumes "  থেকে যার অর্থ হল ' ধোঁয়ার মাধ্যমে '।সুগন্ধি পছন্দ করেনা এমন মানুষ আজকাল পাওয়াই দায়! ধারনা করা হয় সর্বপ্রথম মিশরীয়রায় সুগন্ধি তৈরি করে।বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদের নির্যাস সংগ্রহ করে তাতে চর্বি মিশিয়ে এক ধরনের মলম তৈরি করে তারা গায়ে মাখত বিভিন্ন ধর্মীয় আচারে।মিশরের ফারাও রাজা-রানি সুগন্ধির ব্যাপারে অনেক বেশি সৌখিন ছিলেন। তারা অধিকাংশ সময়ে সুগন্ধি মোমের আকারে ব্যবহার করতেন, এই ধরনের মোম মিশ্রিত সুগন্ধি তারা মাথায় লাগিয়ে নিতেন এবং রৌদ্রের প্রচন্ড উত্তাপে সেই মোম সুগন্ধি গলিত হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ত।তুতেনখামেনের মমিতেও ব্যাবহার করা হয়েছিল  প্রচুর পরিমানে সুগন্ধি। রানি ক্লিওপেট্রা একটা আস্ত সুগন্ধির কারখানায় খুলে বসেন সেখানে তৈরি হত এক বিশেষ ধরনের সুগন্ধি যার নাম " ফিকি ", সুগন্ধির ইতিহাসে ফিকি ই প্রথম সুগন্ধির ব্রান্ড।
তবে বর্তমানে ফরাসিরাই সেরা সুগন্ধি প্রস্তুতকারক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।প্রায় দুশো বছর আগে ফ্রান্সে ট্যানারি শিল্পে প্রসিদ্ধ লাভ করেছিল।চামড়া পচার দুর্গন্ধ দূর করতে তখন থেকেই চাষ করা শুরু হয় সুগন্ধি লতাগুল্মের। ফ্রান্সে  সুগন্ধি শিল্প এতটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠেছিল যে ফরাসি সম্রাট পঞ্চদশ লুইয়ের দরবারকে সুগন্ধির দরবার বলা হত।শুধু ত্বকেই নয় এমনকি কাপড় ও আসবাবপত্রেও ব্যবহার করা হত সুগন্ধির। শোনা যায় ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যুদ্ধে যাবার সময় দুটি জিনিস সব সময় কাছে রাখতেন প্রথম টি ছিল বই আর দ্বিতীয়টি সুগন্ধি। তার প্রিয় সুগন্ধি ছিল জেসমিন। সতেরোশো শতাব্দীর দিকে ইউরোপীয়রা সুবাসের মাধ্যমে রোগ নিরাময় পন্থার প্রচলন ঘটায় এবং প্লেগ ক্ষতিগ্রস্থদের চিকিৎসায় ডাক্তাররা চামড়ার প্যাকেটে লবঙ্গ,দারুচিনি, মশলা ভরে রোগীর নাকে মুখে দেওয়া শুরু করে মনে করা হত এই পন্থা তাদের রোগমুক্তি ঘটাবে।
গ্রীসে প্রথম সুগন্ধির ব্যবহার শুরু করেন আলেকজান্ডার। জানা যায় আলেকজান্ডার সম্রাট তৃতীয় দারাবৌষ কে পরাজিত করে  সুগন্ধি তৈরীর কৌশল শিখে নেন। তারপর সেই কৌশল গ্রীস থেকে ছড়িয়ে পড়ে সারা ইউরোপে। আরবে সুগন্ধির ইতিহাস অনেক প্রাচীন।আরব চিকিৎসক ইবনে সিনা রসায়নের মূলনীতিসমূহ সুগন্ধি প্রস্তুত প্রনালীতে ব্যবহার করেছিলেন। নবম শতকে আরব কেমিস্ট আল কিন্দাস সুগন্ধির উপর একটি বই বের করেন যার নাম " বুক অব দ্য কেমিস্ট্রি  অব পারফিউম  অ্যান্ড ডিসটিলেসনস ",  ধারণা করা হয় এই বইটিই পারফিউম সংক্রান্ত প্রথম বই। আরবদের সুগন্ধি ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল যার উৎকৃষ্ট প্রমান পাওয়া যায় শেক্সপিয়ারের লেখা বিখ্যাত নাটক লেডি ম্যাকবেথের কন্ঠে " the perfume of Arabia  "


আমাদের ভারতবর্ষেও সুগন্ধির ইতিহাস বহু প্রাচীন আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ চরক সংহিতা ও সুশ্রুত সংহিতায় আছে সুগন্ধির উল্লেখ। মহাকাব্য রামায়ণ থেকে পাওয়া যায় তৎকালীন সময়ে পরিষদ বর্গদের চন্দন কাঠের নির্যাস তথা সুগন্ধি দিয়ে সিক্ত করা হত এবং যোদ্ধাদের সুগন্ধিযুক্ত গুড়ো দিয়ে আচ্ছন্ন করা হত,যা ছিল যুদ্ধ শুরু করার এক অন্যতম পর্ব। মোঘল সম্রাট বাবরের ছিল গোলাপের প্রতি অসম্ভব আকর্ষণ  তাই সুদূর ইরান থেকে তাঁর জন্যে আসত বিভিন্ন রকম  বোতল ভর্তি গোলাপের  সুগন্ধি। সম্রাট বাবর ইরানের ইস্পাহান ও ইরাকের বসরা থেকে উৎকৃষ্ট প্রজাতির গোলাপ এনেছিলেন তার বাগানের জন্য। পরবর্তীকালে সেই গোলাপের মাধুর্যতায় ভারতের কিছু বিশেষ গোলাপ ,বসরার গোলাপ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।তবে মোঘল যুগে সুগন্ধি ব্যাপক বিস্তার লাভ করে মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও তার প্রিয়তমা পত্নি নূরজাহানের আমলে।শোনা যায় সম্রাট জাহাঙ্গীর নাকি তার ঘোড়ার লেজেও বিভিন্ন রকম সুগন্ধি মাখিয়ে রাখতেন যাতে ঘোড়াতে তার চলাচলের সময় ঘোড়ার লেজের সুগন্ধির বিচ্ছুরণে চারপাশ সুরভিত হয়ে ওঠে।সৌন্দর্য চর্চায় নূরজাহানের অন্যতম আবিস্কার গোলাপের আতর,যার পোষাকি নাম " ইতরে জাহাঙ্গীরি "।  নূরজাহানের উদ্যোগে বিখ্যাত শালিমারবাগ, নিশাতবাগ উদ্যান তৈরী হয়।
বাংলার নবাব আলিবর্দি খান ও সুগন্ধির প্রতি অনেক সৌখিন ছিলেন। শোনা যায় তিনি যখন যুদ্ধে যেতেন সঙ্গে নিতেন সুগন্ধি, এটা নাকি তাঁর ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতো আবার যুদ্ধে উৎসাহ ও যোগাত।আলিবর্দি খানের দৌহিত্র নবাব সিরাজুদ্দৌলার ছিল সুগন্ধির প্রতি প্রবল মুগ্ধতা তিনি বিভিন্নরকম সুগন্ধি গায়ে মাখিয়ে রাখতেন।বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে হীরা ঝিল প্রাসাদে পায়রা,কাকাতুয়া, টিয়া,ময়ূর ও অন্যান্য পাখি সুগন্ধির তরলে ডুবিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হত প্রাসাদের হলঘরে ফলে সুগন্ধির সৌরভে সুরভিত হয়ে উঠত সমগ্র হীরা ঝিল প্রাসাদ। নবাব সিরাজের বেগম লুৎফুন্নেশাও সুগন্ধির প্রতি আকর্ষণ ছিল।পারস্যের বিভিন্ন সুগন্ধি ফুল ও চন্দন তাঁর প্রিয় প্রসাধনী। সুগন্ধি মিশ্রিত গয়না পরা ছিল সেই সময়কার ফ্যাশন। সেই সব গয়না থেকে চন্দনের ভুরভুরে সুগন্ধ ছড়াত।বেগম লুৎফার পছন্দের সুগন্ধি  চন্দন, কস্তূরী ছাড়াও তিনি জটামাংসী নামে এক ধরনের গাছের শেকড় দিয়ে তার পোষাক সুগন্ধি করিয়ে নিতেন।
আঠেরোশো শতাব্দীর শেষের দিকে প্রাকৃতিক উপাদানের পাশাপাশি সুগন্ধির মধ্যে রাসায়নিক উপাদান এর ব্যবহার শুরু হয় আর তখন থেকেই পারফিউমের বাজারজাত শুরু হয়। প্রথম দিকের কৃত্রিম সুগন্ধি যেগুলি ছিল সেগুলি নাইট্রিক অ্যাসিড এবং বেনজিন থেকে তৈরী হত,এই কৃত্রিম সুগন্ধি একধরনের বাদামের সুগন্ধে ভরপুর ছিল এবং তা সাবানের সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহার হত।পরবর্তীতে বিভিন্ন মিশ্রণে লেবু ও অ্যালকোহলের ব্যবহার সুগন্ধির গুনাগুনের মাত্রা অনেক বেড়ে যায় যা অনেকদিন পর্যন্ত স্থায়ীও হত।

সুগন্ধি তৈরীর কাঁচামাল হিসেবে উদ্ভিদজাত উপাদান বিভিন্ন ফুল যেমন -গোলাপ,লাইলাক,লিলি, ম্যাগনোলিয়ার নির্যাস ছাড়াও  চন্দন, উইক্যালিপটাস,ধনে,এলাচ,দারুচিনি, তেঁজপাতা ও বিভিন্নরকম ফল ও গাছের ছাল এবং প্রাণীজাত উপাদানের মধ্যে হরিণের নাভীর চর্বি, বিভার,সিভেট ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

Comments

  1. Ain-I-Akbari was one of the most important book during the time of Akbar where Abul-Fazal has talked about several kinds of perfumes which were extracted from different types of organic and inorganic materials.

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস