বিস্মৃত এক বাঙালী চিকিৎসক


লেখিকা- তোর্সা দে

প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে বহু ঘটনা ঘটে যা আমরা লক্ষ্য করি না বা  গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না যতক্ষন না পর্যন্ত কেউ সেটা আমাদের চোখে আঙ্গুল  দেখিয়ে  দেয় । যদিও  সেসব অনেক ঘটনাই আমাদের জীবন কে পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। অনেক সময় জন জাগরণকারী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে চলচিত্র ।
১৯৯১ সালে বাংলার সনামধন্য চিত্রপরিচালক তপন সিংহ বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক রামাপদ রায়চৌধুরীর কাহিনী “অভিমন্যু” অবলম্বনে একটি হিন্দি ভাষায় চলচিত্র নির্মান করেন “ek doctor ki maut” (Death of a Doctor)।( https://en.m.wikipedia.org/wiki/Ek_Doctor_Ki_Maut)  জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত এই চলচিত্র বাংলার এক উপেক্ষিত বিস্মৃত ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায় এর জীবনকথা তুলে ধরে, যাঁকে ছাড়া বাংলা তথা ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস রচনা অসম্ভব।
২০ ই জুন, ১৯৮১ আনন্দবাজার পত্রিকার শিরোনামে ছিল একটি বিয়োগান্তক সংবাদ।১৯ শে জুন শিক্ষিকা নমিতা মুখার্জি স্কুল থেকে তাঁদের দক্ষিণ কলকাতার flat এ  ফিরে এসে দেখেন স্বামী সুভাষ মুখোপাধ্যায় এর ঝুলন্ত মৃতদেহ! পাশে রাখা suicide note-“ I can’t wait everyday for a heart attack to kill me.” – কেন অকালে নিজেকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিলেন এই চিকিৎসক? কেন হলো তাঁর কাহিনী র এমন মর্মান্তিক সমাপ্তি (https://en.m.wikipedia.org/wiki/Subhash_Mukhopadhyay_(physician)
ছত্রিশগড়ের হাজারিবাগ জেলার এক ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৯৩১ সালের ১৬ ই জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। মেধাবী ছাত্র সুভাষ ISC পাশ কতে প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজে পরে  National Medical College  এ পড়া শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে M.B.B.S. হন ও Gynaecology তে প্রথম হওয়ায় “হেমাঙ্গিনী পদক” পান। ১৯৫৮ সালে অধ্যাপক সচ্চিদানন্দ ব্যানার্জির  তত্ত্বাবধানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Ph.D. করেন। ১৯৬১ সালে বৃত্তি পেয়ে  University of Edinburgh থেকে Reproductive biology and endocrinology নিয়ে চর্চা করেন। ১৯৬৭ সালে দেশে ফিরে তিনি কাজ শুরু করেন নীলরতন সরকার medical college এ ।


Medical college এ কর্মরত অবস্থায় নিজ গবেষণার কাজ কেও এগিয়ে নিয়ে যান। সন্তানহীন দম্পতি দের বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণের উদ্দেশ্যে গর্ভের বাইরে ভ্রুণ তৈরী করে তা পুনরায় গর্ভে পুনঃস্থাপন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রসঙ্গত, এই পদ্ধতি IVF (in vitro fertilisation) নামে পরিচিত। ল্যাটিন “in vitro”শব্দের অর্থ glass. ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছরের গবেষণার সাফল্য আসে ১৯৭৮ সালের ৩রা October কলকাতার আগরওয়াল দম্পতির প্রথম কন্যা সন্তান কানহুপ্রিয়া আগরওয়াল বা দুর্গার জন্মের মধ্য দিয়ে। দুর্গাই ছিলেন এশিয়ার প্রথম Test tube baby.



কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তির কল্যাণে বিয়ের ১৬ বছর পর নিঃসন্তান বেলা আগরওয়ালের সন্তান জন্মের খবর প্রচারিত হয় দূরদর্শনে, সাড়া বিশ্বে আলোড়ন পড়ে যায়।বাংলা তেও আলোড়ন ওঠে কিন্তু সে আলোড়ন ছিল অবিশ্বাস, সন্দেহ ও ষড়যন্ত্রের। চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালে মাত্র ১০ মিনিটে ১০ বছরের গবেষণার বর্ণনা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় ড. মুখার্জি কে। চলতে থাকে অবান্তর প্রশ্নের আক্রমন, যেমন হিমায়িত করে ভ্রুণ সংরক্ষণ এর কথা শুনে তারা বলেন কলকাতায় এতো load-shedding এর মধ্যে ভ্রুণ হিমায়িত হলো কিভাবে!প্রশ্নকারী ডাক্তারদের ভাষা ছিল “বুজরুকি বার করে দেব”, “মেরে সব যন্ত্র গুঁড়িয়ে দেব”!
এরপর গঠিত হলো Fact Finding Committee, সকলের মনে এই ধারণা বদ্ধমুল হয় যে ড.মুখার্জি ভাঁওতা দিচ্ছেন, মানে আমেরিকার, ইংল্যান্ডের ডাক্তার পারলেন না আর ইনি সেই কাজ করবেন,এ যেন অবিশ্বাস্য ।  ফলে কমিটি report এ লেখে, “Everything that Dr.Mukhopaddhay claims is bogus.”
তবে সর্বত্র তিনি অবহেলিত হননি,১৯৭৯ সালে হায়দ্রাবাদ কংগ্রেসে তিনি নিজের কাজ ব্যাখ্যা করেন। জাপানের কিয়েটো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রন পান।যদিও তাকে জাপান যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি,পরিবর্তে তাকে বাঁকুড়া র এক চক্ষু হাসপাতালে নিযুক্ত করা হয়।



তবে হ্যাঁ, ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায় IVF এর প্রণেতা ছিলেন না। এর প্রণেতা ছিলেন ব্রিটিশ physiologist sir Robert Geoffrey Edward ও gynecologist Patrick Christopher Steptoe.
দূর্গার জন্মের ৬০ দিন আগে তারা সাফল্য পান এবং বিশ্বের প্রথম Test tube baby Louise জন্মগ্রহন করেন। এই দুই গবেষক ও ড. মুখোপাধ্যায় এর কার্যকাল এক হলেও কর্ম পদ্ধতি ছিল পৃথক। ড.মুখোপাধ্যায় এর পদ্ধতি ছিল অভিনব ও দুঃসাহসিক। হরমোন প্রয়োগ করে অতিরিক্ত ডিম্বানু তৈরি করে সেই ডিম্বানু সংগ্রহ করে শুক্রাণুর সাথে নিষিক্ত  করে পরবর্তী ঋতুচক্র পর্যন্ত হিমায়িত করে সংরক্ষণ এবং শেষে তা গর্ভে প্রতিস্থাপন। বর্তমানে এই পদ্ধতি ই ব্যবহার হয়ে থাকে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি র ব্যবহারের পরও সফলতার হার থাকে ২০-৩০%।কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বাঙালি কাঁকড়া রা তার কথা শোনার চেষ্টা পর্যন্ত করেনি ।


ড.মুখার্জির মৃত্যুর ১৬ বছর পর ১৯৯৭ সালে T.C.Anand Kumar তাঁর কাজ নিয়ে গবেষণায় তৎপর হন।“Current Science” journal এ “Architect of India’s First Test Tube Baby : Dr. Subhas Mukherji” নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।২০০৩ সালে তিনি ভারতের প্রথম test tube baby দুর্গার  জন্মের ২৫ বছর উদযাপন করেন।২০০৫ সালে পশ্চিম বঙ্গের সরকার তাকে ভারত তথা এশিয়ার প্রথম test tube baby র স্রষ্টা রূপে স্বীকৃতি দেয়। https://www.thebetterindia.com/129159/subhash-mukherjee-doctor-india-first-test-tube-baby/
আজও ড.মুখোপাধ্যায় এর দেখানো পথে হাজার হাজার দম্পতি মহামূল্য সন্তান সুখ লাভ করছে। তবে আমরা কি আজও তার প্রতি সুবিচার করছি?  তাঁর এই মহামূল্য আবিষ্কার ব্যবহৃত হচ্ছে অসাধু অবৈধ কাজে। এটাই কি তার প্রাপ্য ছিল ?   প্রশ্নচিহ্ন টা এখন কিন্তু আমাদের দিকেই।


 

সহায়ক গ্রন্থ –
স্বাতী ভট্টাচার্য,  চক্রব্যূহে বৈজ্ঞানিক, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ

Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস