টাওয়ার অফ সাইলেন্স



  লেখক- অর্ঘ্য দীপ দাস ও সোমেশ মাইতি



সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান কলকাতার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে আছে নানান ইতিহাস। কালক্রমে কিছু ইতিহাস হারিয়ে গেলেও তার কিছু কিছু নিদর্শন এখনো রয়েছে। এরকমই এক বর্ণময় ইতিহাস বহন করে চলছে টাওয়ার অফ সাইলেন্স।
কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা হল বেলেঘাটা মেইন রোড। আগে ছিল তা ডাকাতদের আস্তনা। শিয়ালদা মেইন রোড পেরিয়ে সেই বিরাট ফটকের উঁচু  টাওয়ারটা এখনো ইতিহাস বহন করে চলেছে। শহরের একপ্রান্তে সেই ভূতের রাজত্বের সাক্ষী হয়ে আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একধারে। তার নামের মধ্যেই সেই নীরবতার কথা আছে।
পার্সি সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা রীতি আছে কেউ ইহলোক ত্যাগ করলে তার মৃতদেহ ওই টাওয়ারে রেখে দেওয়া হয়। চিল শকুন এসে সেই দেহের আত্মসাৎ করে। এভাবেই প্রকৃতির মাঝে সেই দেহ মিলিয়ে যায়। বহু প্রাচীন কাল থেকে এই প্রথা চলে আসছে কালে কালে। 
পার্সিদের ভাষায় এই টাওয়ার কে বলা হয় দখমা। বেলেঘাটা অঞ্চলে জঙ্গলের মধ্যে দখমা তৈরির কাজ শুরু হয় ১৮২২ সালে। খরচ পড়েছিল তখনকার দিনে ৩৫ হাজার টাকা। মূল উদ্যোক্তা ছিলেন নওরোজি। সঙ্গে অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও এগিয়ে এসেছিলেন। ১৮২৮ সালের ২৮ জানুয়ারি উদ্বোধন হয় টাওয়ার অফ সাইলেন্স। 
 পূর্ব এশিয়ায় এটাই পার্সিদের প্রথম শেষকৃত্যভূমি। রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর, মালয় থেকেও মৃতদেহ বয়ে আনা হত বহুদিন। এখন আর সেই প্রথা নেই বললেই চলে। 
কলকাতায় পার্সিদের  আগমন  উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে। পার্সি ব্যবসায়ী দাদাভাই বেহরামজি বানাজি সুরাট থেকে কলকাতা এসেছিলেন ১৭৬৭ সালে। মূলত এরা ব্যবসার উদ্দেশে কলকাতায় আসতো। কলকাতায় তাঁদের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল একাধিক এন্টারপ্রাইজ। তবে বাঙলা ও বাঙালির সঙ্গে মিলেমিশে যেতে তাঁদের বেশি সময় লাগেনি। অনেকের তো পদবীর শেষে 'বেঙ্গলি' শব্দটাও যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। তেমনই আর একটি পরিবার সোরাবজি পরিবার। কলকাতার পার্সিদের মধ্যে একজন অগ্রণী ব্যবসায়ী ছিলেন নওরোজি সোরাবজি বেঙ্গলি। এদেশের পার্সি জনজাতির মানুষদের একজোট করতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। 
এখন চিল শকুন দেখতে পাওয়া দুস্কর। উনিশ শতকে কলকাতায় পার্সি মানুষের সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ। আর এখন  কলকাতায় কালক্রমে পার্সি মানুষের সংখ্যাও অনেক কমে গেছে। বড়োজোর ৪০০ হবে। মৃতদেহ এখন আর আসে না। তবু দুশো বছরের ইতিহাস সাক্ষী করে তিলোত্তমা নগরীতে আজও দাঁড়িয়ে আছে টাওয়ার অফ সাইলেন্স। 


তথ্যসূচি :- 
  • প্রহর নিউজ পেপার 
  • আনন্দবাজার পত্রিকা 
  • উইকিপিডিয়া 
  • “সবাই মিলে” ফেসবুক পেজ

      (লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)

Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস