একজন সাধারণ নারীর নগরবধূ হয়ে ওঠার কাহিনী : আম্রপালি
লেখিকা- অচেনা মণ্ডল
কিছু কিছু চরিত্র এমন রহস্যময় হয়ে থাকে, যে সেই চরিত্র গুলি যুগ যুগ ধরে আমাদের দুর্নিবার আকর্ষনে হাতছানি দেয়|প্রাচীন ভারতের এমনই একটি চরিত্র হোলো আম্রপালি, যে চরিত্র টি প্রায় ২৬০০ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও ঐতিহাসিক রহস্য হয়ে থেকে গেছে|
আম্রপালি, যিনি ইতিহাসে আম্বপালিকা বা আম্বাপালি নামেও অভিহিতা হয়ে থাকেন|আম্রপালি খৃষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দে লিচবি প্রজাতন্ত্রের অন্তর্গত বৈশালী(বর্তমান বিহার)তে জন্মগ্রহণ করেছিলেন|আম্রপালির জন্মের বা প্রথম জীবনের কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি তথাপি ১৫০০ হাজার বছর আগে লেখা জাতক গল্প থেকে এই কিংবদন্তী শিল্পীর জন্ম সংক্রান্ত কিছু তথ্য পাওয়া যায়|বৈশালীর শ্রাবস্তী নামক স্থানে এক আম গাছের নিচে এক নি:সন্তান দম্পতি একটি কন্যা শিশুকে খুঁজে পায় আর এরপর থেকেই তারা ঐ শিশুটিকে নিজের কন্যা স্বরূপ লালন করতে থাকেন|সংস্কৃত এ আম্র অর্থাৎ আম এবং পল্লব অর্থাৎ পাতা, যেহেতু শিশুটিকে দম্পতি আম গাছের নীচ থেকে কুঁড়িয়ে পায় তাই শিশুটির নাম রাখা হয় 'আম্রপালি'|
আম্রপালির একজন সাধারণ নারী থেকে বৈশালীর 'নগরবধূ' হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে বিচিত্রময় কাহিনী রয়েছে| খুব অল্প বয়সেই আম্রপালি বৈশালীর সুন্দর বালিকা হিসেবে ঘোষিত হয়েছিলো, বর্ণিত আছে তাঁর মোহনীয় সৌন্দর্য বিভিন্ন রাজ রাজাদের মধ্যে যুদ্ধের পটভূমি তৈরী করতো|
আম্রপালির বৈশালীর নগরবধূ হয়ে ওঠার কাহিনী খুব সুখকর ছিলোনা বরং তা ছিলো হৃদয় বিদারক| আম্রপালির প্রায় এগারো-বারো বছর বয়স থেকেই তাঁর রূপের খ্যাতি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে|এমতাবস্থায় আম্রপালির বিবাহ তাঁর বাল্যপ্রেমিক পুষ্পকুমারের সাথে স্থির করা হয় কিন্তু বিবাহের আগে বৈশালীর রাজা মনুদেব পুস্পকুমার কে হত্যা করেন|অতঃপর আম্রপালির উপর মনুদেব নিজের মালিকানা আরোপ করার স্বার্থে আম্রপালিকে বৈশালীর 'নগরবধূ' করেন অর্থাৎ বহু পুরুষের ভোগ্য|খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় এই সিদ্ধান্ত যে কোনো নারীর পক্ষেই ভীষণ অমর্যাদাপূর্ণ, আম্রপালির পক্ষেও হয়তো মেনে নেওয়া সহজ হয়নি কিন্তু সময়ের প্রেক্ষাপটে তাঁকে এই সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছায় শিরোধার্য করে নিতে হয়েছিলো|সেই দিন থেকেই শুরু হয়েছিলো নতুন আরেকটি অধ্যায়|
'নগরবধূ' পদটিকে বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থে 'জনপদকল্যাণী' বলেও উল্লেখ করা হয়েছে|আমাদের অবশ্যই স্মরণে রাখা দরকার যে, 'নগরবধূ' বা 'জনপদকল্যাণী' কিন্তু সামান্য গণিকা নন, তাঁকে হতে হতো বিভিন্ন শিল্পে বিশেষ করে নৃত্যগীতে পারদর্শী|অভিজাত আদবকায়দায় অভ্যস্ত মোহনীয় একজন নারী| একমাত্র উচ্চ বংশের পুরুষেরাই এই নারীর সঙ্গ পেতে পারতেন এবং নগরবধূ নিজেই নিজের সঙ্গী নির্বাচন করতে পারতেন যদিও নগরবধূ কখনোই কোনো নির্দিষ্ট পুরুষের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে পারতেননা|
আম্রপালির জীবনের বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় কাহিনীগুলির মধ্যে অন্যতম, তাঁর এবং রাজা বিম্বিসারের প্রেমকাহিনী ৫৪২ খৃস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪৯২ খৃষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত মগধ (বর্তমান বিহার)শাসন করেছিলেন|কথিত আছে রাজা বিম্বিসার আম্রপালির বর্ণনা শুনেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, এবং নিজের রাজসভায় রাজনর্ত্যকী হিসেবে নিয়ে আসতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন|মনেকরা হয় এই কারণেই মগধ রাজ বিম্বিসার বৈশালী আক্রমণ করেন, এবং এই সময়ে মিথ্যা পরিচয়ে আম্রপালির গৃহে আশ্রয় নেন|এই সময়ে আম্রপালি ও বিম্বিসার একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং সেই আকর্ষণ এক গভীর প্রণয়ের রূপ নেয়|কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আম্রপালির কাছে সত্য প্রকাশ হয়ে পরে, এই মুহূর্তে আম্রপালির কাছে তাঁর মাতৃভূমির স্বাধীনতাই বড়ো হয়ে দাঁড়ায় এবং তিনি বিম্বিসার কে তাঁর সেনা সহজ ফিরে যেতে বলেন|বিম্বিসারও আম্রপালির কথার মর্যাদা রাখতে মগধ ফিরে যান যদিও এর জন্য রাজা বিম্বিসারকে কাপুরুষ আখ্যা পেতে হয়েছিলো|এর কিছুদিনের পরেই আম্রপালি তাঁর এবং রাজা বিম্বিসারের এক পুত্রের জন্ম দেন, যার নাম দেওয়া হয় বিমলা কোনন্দনা|এর বেশ কিছু সাল পরে বিম্বিসারের পুত্র রাজা অজাতশত্রুও আম্রপালির প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গ কামনা করেন বলাবাহুল্য এই ব্যাপারে আম্রপালি সম্মত হননি, অবশ্যই তিনি জানতেন অজাতশত্রু তাঁরই সন্তানের জনক রাজা বিম্বিসারের পুত্র|এই অবস্থায় আম্রপালির মনের দশা কি হয়েছিলো, তা আজ আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয় তবে এরপর থেকেই আম্রপালির জীবনের আর এক নতুন অধ্যায় শুরু হয় যা তাঁর পূর্ব জীবনের থেকে ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা|
বৈশালী ছিলো গৌতম বুদ্ধের একটি প্রিয় স্থান, একদিন ভগবান বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের সাথে বৈশালী ভ্রমণে আসেন|একথা জানতে পেরে আম্রপালি ভগবান বুদ্ধের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁর গৃহে খাওয়ার জন্য ভগবান বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্য দের নিমন্ত্রণ জানান|ভগবান বুদ্ধ আম্রপালির নিমন্ত্রণ স্বীকার করেন|আম্রপালি ভগবান বুদ্ধের কাছে একটি নতুন জীবন চান এবং তাঁর বর্তমান জীবন থেকে মুক্তির পথ জানতে চান|আম্রপালির অনুরোধে ভগবান বুদ্ধ তাঁকে নিজের শিষ্যা হিসেবে দীক্ষা দেন, সেই থেকে আমৃত্যু আম্রপালি বৌদ্ধ সংঘের ভিক্ষুনী বা সন্ন্যাসিনী হিসেবেই থেকে যান এবং সমাজের জন্য বিভিন্ন জনকল্যাণ মূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন|এইভাবেই এক সাধারণ নারী থেকে নগরবধূ ও নগরবধূ থেকে সর্বত্যাগী সন্ন্যাসিনী হয়ে ওঠেন আম্রপালি|
(লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)



Comments
Post a Comment