বোরাকুলির মাটিতে ইতিহাসের গন্ধ



  লেখক- মুরসালিম শেখ






                                                              "মহামানবের পদধূলি আর তামা-কড়ি ও মরার খুলি,
                                                                  টুকরো এসব হিস্ট্রি বুকে চুপটি আছে বোরাকুলি"


 -----হ্যাঁ, ঠিক তাই! মহামানবদের পায়ের ধুলো,মরচে পড়া তামা,কড়ি এবং মড়ার হাড়গোড় ও মাথার খুলি এবং সেই সঙ্গে ইতিহাসের বেশ কিছু চিহ্ন ও উপাদান আর ইতিহাসের রহস্যময় রোমাঞ্চকর গন্ধটা বুকে ধারণ করে চুপটি করে আছে গ্রাম বোরাকুলি। যাকে দেখলে চট করে বোঝাই যাবে না, এই গ্রামের ঘাস,বাঁশ,আম-কাঁঠাল বা পিটুলির জঙ্গলে ভরা মাটিতেই মিশে রয়েছে এমন কিছু, যেগুলো আমাদের জন্য হতে পারে পুরনো দিনের দর্পণ!
          মুর্শিদাবাদ জেলার ইসলামপুর থানার টেঁকারায়পুর -বালুমাটি গ্রামপঞ্চায়েতের অন্তর্গত প্রত্যন্ত একটি গ্রাম বোরাকুলি। আমি এই গ্রামেরই একজন ছেলে হিসেবে গ্রামের এবং অন্যত্রের অনেক মানুষের মুখে গ্রামটি সম্বন্ধে বেশ কিছু কথা শুনে আসছি। দেখে আসছি বেশ কিছু নিদর্শন। বোরাকুলির হিন্দুপাড়ায় হিন্দুদের যে মন্দিরটি এখন রয়েছে, শোনা যায়, সেখানে বৈষ্ণবদের একটি পীঠ ছিল। এই পীঠে একবার শ্রীচৈতন্যদেব এসেছিলেন এবং একটি রাত্রিও যাপন করে গেছেন। কারো-কারো মতে,শ্রীচৈতন্য নন।তাঁর প্রিয়তম পাঁচজন শিষ্য -----যাঁদেরকে বলা হয় পঞ্চতত্ত্ব-----তাঁদের একজন এসেছিলেন।
             বোরাকুলি গ্রামের উত্তর পাশ দিয়ে পশ্চিম -পূর্ব দিক বরাবর বয়ে গেছে মরা নদি।এখন এই নদিটির নাম মরা নদি হলেও, সুদুর অতীতে এর নাম ছিল গুমানি।নদিটির নাম গুমানি হওয়ার পিছনে কারণ হিসেবে শোনা যায়, এর বুকে ছিল অথৈ জলরাশি  আর ভীষণ স্রোত। ফলে সর্বক্ষণ একটা গুমগুম, গোঁ-গোঁ আওয়াজ হত।এ-থেকেই এর নামকরণ হয়েছিল গুমানি।তারপর কালক্রমে জল শুকিয়ে গেছে অর্থাৎ নদিটির মৃত্যু ঘটেছে। এজন্য এটাকে এখন মরা নদি বলা হয়ে থাকে। শোনা যায়, মোগল বাদশাদের আমলে এই গুমানির জলপথ বেয়ে বাণিজ্যতরী এবং সেনা জাহাজ যাওয়া -আসা করত।পথমধ্যে বিশ্রামের জন্য বোরাকুলিতে তাঁরা নোঙর ফেলতেন। অবতরণ করতেন বোরাকুলির মাটিতে। স্বাভাবিক ভাবেই সে সময়ে এখানে দোকান -পাট বা বাণিজ্য -বন্দরী যে গড়ে উঠেছিল তা সহজেই অনুমেয়। কয়েক বছর আগেই নদিটাতে গর্ত খুঁড়তে গিয়ে একটি বিরাট বটগাছের কঙ্কাল উঠেছিল। উঠেছিল একটি নৌকোও।কেউ-কেউ বলেন, নৌকোটিতে হাজার মণের বোঝাই ছিল। যার গন্তব্যস্থান ছিল বাংলাদেশ।
          গ্রামে যে মসজিদটি রয়েছে, বছর দশেক আগে তার ডান পাশের ছোটো-ছোটো গর্ত থেকে গ্রামের মেয়েরা বাড়ি ছাঁচ দেবার জন্য কাঁখের ছোট্ট ডালি ভরে মাটি খুঁড়ে নিয়ে যেত।খুঁড়তে -খুঁড়তে সেখান থেকে তিনটি নরকঙ্কাল বেরিয়েছিল।যাদের আকৃতি বর্তমান মানুষের থেকে প্রায় দ্বিগুণ লম্বা। মাথাও তেমনি বৃহৎ। বয়োজ্যেষ্ঠদের অনুমান, মোগল বাদশাদের প্রজা বা কর্মচারীদের কঙ্কাল ওগুলো। গ্রামের মানুষেরা সেগুলো আবার মাটিচাপা দিয়ে দেন।
          গ্রামটিতে বাবুর বাগান বলে একটি বাগান আজও রয়েছে। শোনা যায়, বাগানটি ছিল ইংরেজদের।তখন বাগানটি ছিল বিশালকায়।তাতে ছিল বিচিত্র রকমের ফলের গাছ আর ভয়ংকর জঙ্গল। তাতে নাকি বাঘ-ভালুক থাকত।দেশ স্বাধীন হবার অনেক পরেও বাগানটির ভয়াবহতা অক্ষুণ্ন ছিল আগের মতই।তবে এখন বাগানটির সেই শ্রী বা বাঘ-ভালুক আর নেই। রয়ে গেছে শুধু নামটাই।
          ছোটো বেলায় আমি যখন বাবা ও দাদাদের  সঙ্গে গ্রামের জমিতে চাষ-খোঁড় করতাম, তখন অনেক রকমের কড়ি, মরচে ধরা তামার পাত ও মুদ্রা, মাটির তৈরি আসবাবের খোলামকুচি প্রভৃতি খুঁজে পেতাম। অনেককেই বলতে শুনতাম, এখানে পাল,কুমোর প্রভৃতিদের বসবাস ছিল। ওগুলো তারই নিদর্শন। কিন্তু পরে তারা কবে কোথায় গেছেন বা তাদের কী হয়েছে, এসব কথা কেউই বলতে পারেন না!
          ইতিহাসের এমনতর গন্ধজড়িত গল্প-কথা আর উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে বোরাকুলি গ্রামের মাটিতে। কিন্তু এগুলো উদাসীনতার শিকার। তাই অনেকেই জানেন না এসব। আগামিতে হয়তো অমূল্য কোনো হাতের ছোঁওয়ায় প্রকাশ পাবে এসব। তখন উন্মোচিত হবে নতুন গল্প। নতুন চিত্র। হয়তো তখন আমরা জানতে পারব অজানা কিছু!


              (লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)

Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস