মুর্শিদাবাদের নবাবী কেল্লায় হারিয়ে যাওয়া আঙ্গনা মহলের খোঁজে
লেখক- সুব্রত বিশ্বাস
শহর মুর্শিদাবাদ ও ইতিহাস যেন একে অপরের দুটি শব্দ। ভাগীরথী নদী তীরে এই জনপদটি নবাবী রূপে সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটায় মুর্শিদকুলি খানের হাত ধরে। তদানীন্তন বাংলা সুবার কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কর্মস্থল অর্থাৎ রাজধানী ছিল এই জনপদটি। বাংলা সুবার পূর্বতন রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় শহর মুর্শিদাবাদের তদানীন্তন অনুকূল ভৌগলিক অবস্থান। প্রধানত বাংলা সুবার কেন্দ্রীয় অবস্থান এবং পার্শ্ববর্তী ভাগীরথী নদীকে জলপথ হিসেবে ব্যবহার করার সুবিধা কে মাথায় রেখেই এই জনপদটির পত্তন হয়েছিল।
বাংলা সুবার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র তথা বাসস্থান হিসেবে গড়ে ওঠা তৎকালীন অন্যতম প্রধান প্রয়োজনীয়তা স্বরূপ নির্মিত হয়েছিল নিজামাত কেল্লা। ভাগীরথী নদী তীরবর্তী প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ প্রায় চারশো মিটার প্রস্থ ছিল এই কেল্লাটির। সুদীর্ঘ নবাবী সময়কালে কেল্লা মধ্যস্থ সকল স্থান যে সমমর্যাদা সম্পন্ন ছিল তা কিন্তু নয়। বিভিন্ন নবাব এর সময়ে কেল্লার বিভিন্ন অংশ যেন হয়ে উঠতো জাঁকজমকপূর্ণ। আর সেই কারণেই কেল্লা মধ্যস্থ বেশ কিছু প্রাচীন নবাবী স্থাপত্য ছিল যা আজ সম্পূর্ণ রূপে নিশ্চিহ্ন। যেমন- আঙ্গনা মহল, আয়না মহল, চাঁদী মহল, সোনা মহল প্রভৃতি। বর্তমানে এই সমস্ত প্রাসাদ গুলিকে শুধুমাত্র সংগ্রহশালার সংগৃহীত চিত্রেই খুঁজে পাওয়া যায়। অন্যদিকে তুলনামূলক নবীন স্থাপত্যগুলির বেশ কিছু ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত হলেও, অধিকাংশই আজ ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ঠিক এই রকমেরই লুপ্ত একটি নবাবী প্রাসাদ হলো আঙ্গনা মহল। বর্তমানে এই প্রাসাদটির কোনরূপ অস্তিত্ব না থাকলেও, এটিকে দেখা যায় ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত জনৈক সীতারাম নামক চিত্রকরের আঁকা ছবিতে। ১৭৯৫ সালে আঁকা এই চিত্রটি তৎকালীন নিজামত কেল্লার অন্যতম তথ্য আকর হিসেবে বিবেচিত হয়। চিত্রটির মধ্যে হয়তো সামান্য কিছু স্থানিক ভ্রান্তি থাকলেও, ইতিহাসগত ভূগোলের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব যে অসীম- তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলা সুবার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র তথা বাসস্থান হিসেবে গড়ে ওঠা তৎকালীন অন্যতম প্রধান প্রয়োজনীয়তা স্বরূপ নির্মিত হয়েছিল নিজামাত কেল্লা। ভাগীরথী নদী তীরবর্তী প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ প্রায় চারশো মিটার প্রস্থ ছিল এই কেল্লাটির। সুদীর্ঘ নবাবী সময়কালে কেল্লা মধ্যস্থ সকল স্থান যে সমমর্যাদা সম্পন্ন ছিল তা কিন্তু নয়। বিভিন্ন নবাব এর সময়ে কেল্লার বিভিন্ন অংশ যেন হয়ে উঠতো জাঁকজমকপূর্ণ। আর সেই কারণেই কেল্লা মধ্যস্থ বেশ কিছু প্রাচীন নবাবী স্থাপত্য ছিল যা আজ সম্পূর্ণ রূপে নিশ্চিহ্ন। যেমন- আঙ্গনা মহল, আয়না মহল, চাঁদী মহল, সোনা মহল প্রভৃতি। বর্তমানে এই সমস্ত প্রাসাদ গুলিকে শুধুমাত্র সংগ্রহশালার সংগৃহীত চিত্রেই খুঁজে পাওয়া যায়। অন্যদিকে তুলনামূলক নবীন স্থাপত্যগুলির বেশ কিছু ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত হলেও, অধিকাংশই আজ ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ঠিক এই রকমেরই লুপ্ত একটি নবাবী প্রাসাদ হলো আঙ্গনা মহল। বর্তমানে এই প্রাসাদটির কোনরূপ অস্তিত্ব না থাকলেও, এটিকে দেখা যায় ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত জনৈক সীতারাম নামক চিত্রকরের আঁকা ছবিতে। ১৭৯৫ সালে আঁকা এই চিত্রটি তৎকালীন নিজামত কেল্লার অন্যতম তথ্য আকর হিসেবে বিবেচিত হয়। চিত্রটির মধ্যে হয়তো সামান্য কিছু স্থানিক ভ্রান্তি থাকলেও, ইতিহাসগত ভূগোলের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব যে অসীম- তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
![]() |
| ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত সীতারামের আঁকা আংনা মহলের চিত্র- ১৭৯৫ |
সীতারাম দ্বারা অঙ্কিত উক্ত চিত্রটিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে সমগ্র চিত্রটি ভাগীরথী নদীর অপর পাড়ে কোন একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে আঁকা। যদিও স্থানটির কোন বিশেষ ইতিহাসে যায় না। হাতে আঁকা এই চিত্রটির ডান পাশে সামনেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে বর্তমানের সফেদ মসজিদটিকে এবং তার পেছনে লক্ষ্য করা যাচ্ছে সাদা রংয়ের চক মসজিদের মিনার গুলিকে। চিত্রটির প্রায় মধ্যভাগে ভাগীরথীর জলভাগকে স্পর্শ করে রয়েছে একটি জলমহল, যা দুই পাশে দেখা যাচ্ছে দুটি তৎকালীন সিপাহী নিবাস। 'জল মহল' টির সামান্য বাম পাশে লক্ষ্য করা যাচ্ছে একটি অত্যন্ত বৈভবপূর্ণ প্রাসাদ। স্থাপত্যগত পার্থক্য লক্ষ্য করা গেলেও, সম্ভবত এটি নিজামত বা হাজারদুয়ারী প্রাসাদের স্থানেই থাকা পূর্বের কোন প্রাসাদ। সবশেষে একদম পিকে দেখা যাচ্ছে অন্য একটি তুলনামূলক কম আকর্ষণীয় দালান। যা দেখে খুব সহজেই অনুমেয় যে, এই প্রাসাদটি তৎকালীন নবাবি প্রাসাদের কোন সহযোগী প্রাসাদ রূপে পরিগণিত হতো।
চিত্রটির ভৌগোলিক তথা ঐতিহাসিক দিকটিকে বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এর সবথেকে আকর্ষনীয় বিষয় হল 'জলমহল' টি। বাস্তবে এটি আর কোন অস্তিত্ব বর্তমানে না থাকলেও, এটা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না যে, এটি ছিল তৎকালীন 'আঙ্গনা মহল'। সরাসরি এই সিদ্ধান্তে আসার পর, এবার দেখে নেওয়া যাক এই 'জল মহল' কে ' আঙ্গনা মহল' হিসেবে পরিগণিত করার সম্ভাব্য কারণগুলিকে। প্রথমত, বলে রাখা যায় যে এই জল মহলটি ছিল তৎকালীন নিজামত কেল্লার বাইরে। সে দিক থেকে বিচার করলে ভাগীরথীর জলসীমা ছুঁয়ে থাকা এই মহলটি ছিল নিজামত কেল্লার 'অঙ্গন' বা 'উঠোন'। সম্ভবত এই অর্থেই সে পরিচিত ছিল 'আঙ্গনা মহল' রূপে।
চিত্রটিকে বিশ্লেষণের মূলত দুটি দিক রয়েছে। ঐতিহাসিক দিকটি সূক্ষ্মভাবে পড়ে পাওয়া যায় সম্ভাব্য সময়কালকে। যেখানে ছবিটিতে বর্তমানের নিজামত প্রাসাদ বা হাজারদুয়ারী প্রাসাদের স্থানে তদানীন্তন 'আয়না মহল' লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং উল্লেখযোগ্যভাবে নবাব সিরাজ- উদ- দৌলা বা নবাব ফেরাদুন জাঁ নির্মিত কোন ইমামবারার অবস্থানই করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জনৈক কর্মচারীর মতে ১৭৯৬ সালের পর থেকে ভাগীরথী তার নাব্যতা হারাতে থাকে। অথচ চিত্রে নদীর পর্যাপ্ত জলরাশি এই সময় কালের কিছু পূর্ব অবস্থাকেই সূচিত করে। সামগ্রিক অর্থে এই সকল তথ্যাবলী সম্ভবত অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে নবাব সুজাউদ্দিননের সময়কালকেই নির্দেশিত করছে। অর্থাৎ 'আঙ্গনা মহল' নবাব সুজাউদ্দিনের সময়ই নির্মিত হয়েছে বলে অনুমান করা যায়।
![]() |
| সীতারাম অঙ্কিত চিত্রের ভৌগলিক ব্যাখ্যা মানচিত্র |
এবারে আসা যাক কিছু ভৌগোলিক তথ্যসমূহ প্রসঙ্গে। চিত্রকর সীতারামের আঁকা ছবিতে সাফেদ মসজিদ ও চক মসজিদ একে অপরের সাপেক্ষে উলম্বভাবে অবস্থান করলেও, প্রকৃত ভূমি দূরত্ব প্রায় ৪৫০ মিটার। সেই দৃষ্টিকোনে, সীতারাম নদীর অপর পাড়ে এমন একটি স্থান থেকে চিত্রটি এঁকেছিলেন, যে সাফেদ ও চক মসজিদকে সরলরৈখিক মনে হয়েছিল। উক্ত মানচিত্রে চিত্রকর সীতারামের চিত্রাঙ্কন স্থানটির ভৌগোলিক মান ২৪⁰১০'৫৪.০৮" উঃ, ৮৮⁰১৬'১.০১" পূঃ আমার কাছে এবং আঙ্গনা মহলের ভৌগোলিক মান ২৪⁰১১'৬.২৮" উঃ, ৮৮⁰১৬'৪.৭২" পূঃ। আবার চিত্রে আয়না মহলের সামান্য দক্ষিনে জলের তলে স্পর্শ করেছিল জলমহলটি বা আঙ্গনামহলটি। ক্ষেত্র সমীক্ষায় লক্ষ্য করা গিয়েছে যে, এখনো হাজারদুয়ারি প্রাসাদের পেছনের রাস্তাটির শেষে বাঁধানো ঘাট রয়েছে। এই ঘাটটির প্রধান বিশেষত্ব হলো- তদানীন্তন নিজামত কেল্লার নদী পার বরাবর যে দুর্গ প্রাচীর ছিল, তার অনেকটা ভেতর থেকে তৈরি হয়েছিল এটি। আর এখানেই তৈরি হয় একটি প্রশ্ন- নবাবী আমলে দুর্গের ভেতর থেকে ভাগীরথী নদীতে যাবার এরকম ঘাটের কি প্রয়োজনীয়তা ছিল? উত্তর অবশ্যই হল- জলপথকে ব্যবহার করার জন্য। চিত্রে 'জলমহল' টি দেখে এটি সম্পূর্ণরূপে বোঝা যায় যে- এর কার্যকারিতা ছিল নদীকেন্দ্রিক। মূলত নবাব বা তাঁর পরিবারবর্গ নৌকায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাবার বা আসবার আগে ও পরে এই মহলটিতে বিশ্রাম করতেন। তথ্য অনুযায়ী এই আঙ্গনা মহলে নবাব ও তাঁর পরিবারবর্গ ছাড়া আর কারো প্রবেশের অনুমতি ছিল না। আবার আঙ্গনা মহলের দুই পাশে অবস্থিত দুটি সেনানিবাস নবাবী নিরাপত্তা সুনিশ্চিত দিকটিকেই নির্দেশিত করে। তবে বর্তমানে 'আঙ্গনা মহল' এর কোন অস্তিত্ব না থাকলেও, এখনো সেই বাঁধানো ঘাট বরাবর ভাগীরথীর জলতল এর দিকে নামলে পুরনো স্তম্ভ বা ওই জাতীয় কোন স্থাপত্যের অবশিষ্টাংশ দেখতে পাওয়া যায়।
![]() |
| হারিয়ে যাওয়া আংনা মহলের বর্তমান অবস্থান |




Darun Sir
ReplyDeleteKhuv Sundar
ReplyDeleteKhub sundor sir ,aro akbar murshidabad er history jante pare khub valo laglo
ReplyDeleteবেশ ভালো হয়েছে।
ReplyDeleteওখানকার বিলুপ্ত সব স্থাপত্যগুলোর উপর মানচিত্র সহ লেখো।
ReplyDeleteবেশ ভালো হয়েছে।
ReplyDeleteআলোচ্য বিষয়টি তে একটা সুপ্ত ইতিহাস কে আবার পুরোরাই প্রাণ দিয়া হলো, আমি সুব্রত স্যারকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই বিষয় টি নিয়ে লেখার জন্য এবং আমাদের ইতিহাস টি জানতে সাহায্য করার জন্য
ReplyDeleteAnk urano kichu janlam.thank you sir.
ReplyDelete