জীবন আঙ্গিকে কাঁদে..... নির্বন্ধব পুরীতে শেরশাহ (প্রথম পর্ব)
লেখিকা- প্রিয়াঙ্কা_সরকার
(প্রথম পর্ব)
জীবন যাতনায় কতো ফুল আসে যায়, বিধাতার চরণে কয়জনই বা ঠাঁই পায়! আর্ত কান্না দেখলে নারী মন আঁকতে চায় বৈকি, তুলে দেওয়া নারী হৃদয়ের কথকতা ; সম্পর্কের তথ্য সাজিয়ে পাতাগুচ্ছ পেলে মনে হয়, আমারো তো অনেক কিছু বলার আছে,তাই কলম ধরি বার বার। হয়তো অনুপ্রেরণার হাত দি পুস্তকের বুকে ; ক্ষতি কি যদি কিছু কথায় উপলব্ধির সুর বয়ে আসে অন্যপ্রাণের বুকে দাগ কাটে শব্দেরা! তাই আলাপেই প্রেক্ষিত ছুঁয়ে থাকে কথকতারা ; পুরুষ মানেই জন্মগত লাম্পট্য নয়, হয়তো ঘটে যাওয়া ঘটনায় তরঙ্গ ভ্রুণ হয়ে বাসা বাঁধে জীবনে, তার খবর রাখে কয়জনা৷
পাঠান মানেই সহনশীলতা হীন এক প্রেক্ষিত৷ ক্রোধ, দমনের যেন উপায় নেই। কিন্তু মনভ্রমরা বলে, মনকে আগলে রেখে শুধুই কি কাঁদবে জীবন! এমন করে তো কেঁদে উঠলে অভ্যস্ত হতে হয়। কান্না তো নীরব অভিমানের স্নায়ুযুদ্ধ অভ্যাসের কোষাগার, তাই সইয়ে নিতে হয় কিছুদিন ; সহনশীল মনও তো শীল, তাই অবয়বের অহমিকাটুকু বাকি থাক! কিন্তু, দুয়োরাণীর ক্ষোভ উগরেছে যে নারী বহুকাল কেঁদেছে, তার উপর রাগ আসবে না, এই মানবদেহে! এমন সইতে হয় যদি,তবে তো মূল ধরে উপরে দিতে মন চাইবেই। ফরিদের ক্ষোভ এসে যায় পিতার উপর। তথ্য বলে, শিশু কন্যা জন্মের পরবর্তী মুহুর্তেই নাকি মিঁয়া হোসেন দূরে সরে যান। এই সরে যাওয়া, এই অমূলক পিতার অবহেলা, সইতে নারাজ শিশু প্রাণ। নারী প্রাণ প্রার্থনা চায় ; প্রার্থনাতেই মঙ্গল মৈত্রী, তাই ক্রোধটুকু আঁকড়ে ধরে নয়, নারী শেখায় ক্রোধ মুক্ত জীবনই তো শীল।
পুরুষের বুকে নারী কান্না মায়া কান্না বলে আখ্যা পেলেও, সয় না উচ্ছিষ্টের অপর পুরুষ আঘাত। আর মায়ের কান্না তো কোনো পুরুষ বা নারী ভেদ নয়, কারোর বুকেই সয় না৷ হিংসে হয় উজ্জীবনের
ফসলে অন্যের অধিকার! উফফ! না সহ্য হয় না আর। বড়ো বেগমের পর আরো তিন বেগম, কেমন লাগাতে পারে সেদিন! এক শকুন্তলার জীবন শেষ হয়েছিলো এক দুষ্মন্তের অবুঝ উপসংহারে, কিন্তু
এতো যৌনতা আর দেহগত ভালোবাসার যৌবনপোড়া ধন, না স্বামী আর সন্তান ভাগ করা যায় না ; মা বোঝেন তাঁর সন্তান বুদ্ধিমান ; কিন্তু বাড়ির উৎস গর্ভে যদি ঘুণ লেখা থাকে, যদি প্রতি মজ্জায় দূর্বলতার ভিত্তি মূলে ঘুণ পোকা এসে বিষ থাবা যায়, তবে তো আর সন্তানকে দোষ দেওয়া যায় না। সন্তানের বুকে একাই বীজ যাপন করে, এমন করেই বহুতে জীবন উৎসর্গ করা যায়। লাস্যময়ীর পায়ের তলায় বুক দিতে কাঁদে না ব্যক্তিত্ব ; অনায়াসে মর্যাদার রক্ত বিলিয়ে দিতেও দ্বিধা নেই তাঁর।।
সম্রাটের দরবারে নিত্য চাবুকের আঘাত, হু হু মানুষের কান্না - তীব্র আর্তনাদ, ছটফট করা প্রাণে যে গরু মহিষের সমর্পণ। উফফ! ছোট্ট ফরিদের বুকে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধতো ভয়াবহ রূপ, না সইতে পারতো না সে ; সেও তো মানুষ ; কখনও মনে হতো এই তো বাবাকে আঁকড়ে নেবে৷ অন্য মায়েরা আঁকড়ে নিয়ে বলতো, " আমরাও তো তোমার মা! " না, ফরিদের মা কৈ!! আসল আর নকলের সাম্রাজ্যে আদরের হাত ছুঁয়ে আজকে আর আসলটুকু বুঝতে তাঁর সমস্যা হয় না। অন্ধকার গাঢ় হলে জীবনের বুকে কালো ছায়ার মৃত্যু পুরীতে বড্ড কান্না আসে মায়ের। মা তো পুরুষ নয়, সে যে ভালোবাসার সাতকাহনে একবুক সংসার৷ মা যে প্রকৃতি! আচ্ছা! প্রতি অন্দরমহলে কি এমন বোবা কান্নারা কাঁদে! বাঁদীরাও তো ছাড়া পায় নি। সবটুকু বোঝে সে, শুধু নীরবে বাঁধে বুক। আর পরীর দিকে তাকিয়ে কপাল পোড়ে পুরুষের। লাম্পট্য জুড়ে কুহকিনী ফাঁদ, না আর তো বেগম সইতে পারেন না। প্রেম তো সম্মোহিত আবেগের রেখা নয়, তাই ওটা আয়োজন আসে না।
শোনা যায় বহ্লুল লোদী যখন দিল্লীর মসনদে থাকাকালীন জৌনপুরের সুলতান মামুদের সাথে জড়িয়ে যান। সেই সময়েই পর্যাপ্ত খাদ্যের প্রলোভন দেখিয়েই দিল্লীর পথে যাত্রা। শোনা যায়, তখনই মিঁয়া হাসানের পিতা সেই দলে যোগ দেন। কিন্তু সময় যেতে না যেতেই মিঁয়ার নারীর প্রতি ঝোঁক বা আগ্রহ দেখেই, তিনি যাত্রা করলেন। কিন্তু তখন মিঁয়াকে একাই পিতৃকুলের প্রতিষ্ঠা ছাড়াই প্রতিষ্ঠা
লাভ করতে হবে৷ পায়ের নীচে মাটি না থাকায় , দূর সম্পর্কের বংশধরদের আঁকড়ে নিলো মিঁয়া। তারপর ক্রমে সৈনিকে যোগ, ধীরে ধীরে বিবাহ ও ফরিদে জন্ম। ইতিহাস বলে, তখনই দিল্লীর মসনদ শূন্য হয়ে যায়৷ ক্রমে ভাতৃবিরোধ মাথা চাড়া দেয়৷
শোনা যায় বহললের শিরায় খানদানি রক্ত থাকলেও নিজামের মা ছিলেন হিন্দু স্বর্ণকারের কন্যা৷ তাই রূপ ছাড়া বিশেষ খানদানি গুণ! ওটা প্রহসন ছিলো। এদিকে নিজাম সুযোগের অপেক্ষা করতে শুরু করে৷
সারোওয়ানি ও লোহানিরা লোদীর চিরশত্রু। বহ্লুলের মৃত্যুর পর নিজাম দিল্লীর অধীশ্বর হলেন।পরে তিনিই "সুলতান সিকান্দার " হন ; এই ডামাডোলেই হাসান সুযোগ নেয়। আসলে পাঠানরা কতো বেগম আনলো, কতো বেগমকে ছুঁড়ে দিলো অন্ধকুঠুরীতে, কে হিসাব রাখে। কিন্তু, হাসান পেয়েছিলেন, নিম্ন বংশের কন্যা৷ সৌন্দর্য তাই উছলে ওঠা যৌবনের বুকে তীর বিঁধে ছিনিয়ে নিলো আদরের কোল। এবার শুধু হাসানের সৌন্দর্য সুখে নিজেকে সম্ভোগে বিলিয়ে দেওয়ারই পালা৷ উচ্ছেষ্টের দলে পুত্র, কন্যা, নিরাসক্ত বেগম নির্বান্ধব পুরীর বাসিন্দার৷।
ক্রমশ...
তথ্যঋণ...
১) " শেরশাহ ".... শ্রীপারাবত
২) ইতিহাস অভিধান
(লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)

অসামান্য খুব সুন্দর করে গুছিয়ে লেখা অনেককিছু জানা গেল
ReplyDelete