মুর্শিদাবাদের নবাবী কেল্লার সেকাল-একাল



 লেখক-ফারুক আব্দুল্লাহ





সীতারামের আঁকা ১৭৯৫ সালের কেল্লা নিজামতের এক অংশের চিত্র
 দিল্লির মুঘল বাদশাহরা যেমন লালকেল্লায় বসবাস করতেন,ঠিক তেমনই বাংলার নবাবরা বসবাস করতেন মুর্শিদাবাদের কেল্লা নিজামত বা নবাবী দূর্গে।এই কেল্লার অবস্থান ছিল মুর্শিদাবাদ নগরীর বুক চিরে চলে যাওয়া ভাগীরথী নদীর পূর্ব পাড়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে।আজ অবশ্য সেই নবাবী কেল্লার অস্তিত্ব আলাদা করে বোঝার কোন উপায় নেই।কিন্ত একটা সময় ছিল যখন সমগ্র রাজধানী নগরীর মধ্যে এই কেল্লার  গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।সমগ্র অঞ্চলটি ছিল উচ্চ নিরাপত্তায় আবৃত।কেল্লার ভিতরে প্রবেশের জন্য একটি প্রধান দরজা সহ আরও বেশ কয়েকটি দরজা ছিল।কেল্লার ভিতরে ছিল নবাব ও তার আত্মীয় স্বজনদের বসবাস এবং প্রশাসনিক কার্যকলাপ পরিচালনার প্রচুর প্রাসাদ।এছাড়াও ছিল বহু মসজিদ,ইমামবাড়া,চিকিৎসালয় সহ আরও নানান প্রয়োজনীয় ছোট,বড় ভবন।সময়ের সঙ্গে,সঙ্গে একদিকে যেমন কেল্লার বহু পুরনো প্রাসাদ ভেঙে পড়েছে তেমনই আবার সেই স্থানে নতুন প্রাসাদও গড়ে তোলা হয়ছে।বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কেল্লার ভেতরে শেষ প্রাসাদ হিসেবে বেগম মহল নির্মিত হয়েছিল।তার পর আজ পর্যন্ত আর নতুন কোনো প্রাসাদ নির্মিত হয়নি।কারণ ততদিনে বাংলা,বিহার,উড়িষ্যার নবাব নাজিমরা তাদের পদমর্যাদা হারিয়ে পরিণত হয়েছিলেন শুধুমাত্র মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুরে।ফলে নতুন করে কোনো প্রাসাদ নির্মাণের  আর্থিক সামর্থ্য তাদের ছিলনা।এদিকে কেল্লার পুরনো প্রাসাদ গুলিও রক্ষণাবেক্ষণ এর অভাবে নষ্ট হতে শুরু করেছিল।১৮৯৭ সালের অসম ভূমিকম্প সেগুলি একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দেয়।অন্যদিকে ১৯৬৯ সালে মুর্শিদাবাদের তৃতীয় নবাব বাহাদুর সৈয়দ ওয়ারিস আলী মির্জার মৃত্যুর পর যোগ্য উত্তরাধিকারীর অভাবে মুর্শিদাবাদের মসনদ শূন্য রয়ে যায় দীর্ঘ দিন।কেল্লার যেটুকু জৌলুশ অক্ষুন্ন ছিল এই দীর্ঘ সময়ে  তাও একেবারে শেষ হয়ে যায়।
কেল্লার ভেতরে অবস্থিত আমীর মহল প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ

 কেল্লার ভেতরের এক সময়ের রাজকীয় প্রাসাদ আয়না মহল,আগনা মহল,সোনা মহল, চাঁদি মহলের আজ আর কোন অস্তিত্ব নেই।বর্তমানে কেল্লায় শুধুমাত্র কয়েকটি প্রাসাদই অবশিষ্ট রয়ে গেছে।সেগুলি হল হাজারদুয়ারি, বেগম মহল,বালাখানা ও ওয়াসিফ মঞ্জিল।এছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি ইমামবাড়া ও মসজিদ।রয়েছে কেল্লায় প্রবেশের প্রধান ফটক সহ কয়েকটি গৌণ ফটক।এছাড়াও রয়েছে কেল্লার সুউচ্চ ও মজবুত বেষ্টনী প্রাচীর।
বর্তমান সময়ে কেল্লার ভেতরের একটি দৃশ্য

 একটা সময় ছিল যখন এই নবাবী কেল্লার জৌলুশ ছিল দেখার মতো।কেল্লার প্রধান ফটক থাকত উচ্চ নিরাপত্তায় মোড়া।সেই নিরাপত্তা ভেদ করে কোনো মাছিরও কেল্লার ভেতরে প্রবেশের অধিকার ছিল না।কেল্লার সেই প্রধান ফটকের পাশেই ছিল নবাবী সেপাইদের বসবাস করার ঘর।ভাগ্যের পরিহাসে আজ সেই ঘরে বসবাস করেন মুর্শিদাবাদের বর্তমান নবাব বাহাদুর সৈয়দ মহাম্মদ আব্বাস আলি মির্জা ও তার পরিবার পরিজন। নবাবী আমলে কেল্লায় প্রধান ফটক ‘দক্ষিন দরজার’ মাথায় থাকত নহবৎখানা। সেখানে নবাবের শাহী বাদকরা সকাল-সন্ধ্যা সানাই বাজাতো।সানাই এর সেই সুর কেল্লা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ত দূর দূরান্তে।আজ সেই দক্ষিন দরজা অক্ষুন্ন থাকলেও নেই সেই বাদকরা।শোনা যায়না সানাইয়ের মন মাতানো সেই সুর।এক সময় যে কেল্লার ভেতরে সাধারণ মানুষ তো দূর,উচ্চপদস্থ আধিকারিকদেরও  অবাধ বিচরণের অনুমতি ছিলনা।আধিকারিকদেরও কেল্লার ভেতর চলাফেরা করার ক্ষেত্রে নানা বিধ নিয়ম কানুন মেনে চলতে হত।কেল্লার মধ্যে প্রবেশ ও প্রস্থানের সময়ও নির্দিষ্ট ছিল।অথচ আজ সেই কেল্লা বেদখল।কেল্লা চত্বরে গড়ে উঠেছে বহু হোটেল সহ অজস্র দোকান পাট।কেল্লার রাজকীয় পরিবেশ বিলুপ্ত হয়েছে বহুদিন আগেই।নবাবী আমলে সন্ধ্যার পর কেল্লার ভেতরে নিজামত পরিবারের সদস্য বাদে অন্য কারো কেল্লার ভেতরে অবস্থান করার অধিকার ছিলনা।অথচ এখন প্রতিদিন সন্ধ্যার পর  থেকেই কেল্লা চত্বর গমগম করে ওঠে পর্যটকদের কোলাহলে।
কেল্লার মধ্যে অবস্থিত নবাব সিরাজের নির্মিত সাফেদ মসজিদ
একটা সময় কেল্লার পাশেই বয়ে চলা ভাগীরথী নদীতে ভেসে থাকত বহু দাড় বিশিষ্ট নবাবী নৌকা।সেই নৌকা গুলির কোনটি হত ময়ূরমুখী কোনোটি হাতি মুখী,ঘোড়া মুখী কোনটি আবার হতো কুমির মুখী।সব নৌকাতেই থাকত নবাবী নিশান।নবাবরা সেই নৌকায় করে যাতায়াত করতেন রাজমহল,ঢাকা কিম্বা কলকাতায়।কখনও আবার নৌকা নিয়ে বেরোতেন বৈকালিক ভ্রমনে।নবাবী আমলে হাজারদুয়ারী ঘাটে সারিবদ্ধ ভাবে এই সব রাজকীয় নবাবী নৌকা গুলি নদীতে বাঁধা থাকত।এখনও কেল্লার সেই ঘাট রয়ে গেছে।কিন্ত সেই ঘাটে আজ আর কোনো রাজকীয় নৌকার দেখা মেলেনা।
কেল্লার ভেতরের ঘণ্টা ঘর ও সেনা আবাস যেখানে এক সময় নবাবী সৈন্যরা বসবাস করত

 বর্তমানে মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুর থাকলেও নেই সেই নবাবী আমল।কিন্ত কেল্লার নবাবী আমলের মহা আড়ম্বরে উদযাপিত হওয়া বহু উৎসব যেমন,বেরা,মহরম,নওরোজ আজও পালিত হয়ে আসছে পূর্বের রীতিনীতি মেনেই।আজও রমজান মাসে কেল্লায় বসবাসকারী নিজামত পরিবারগুলি সেজে ওঠে।আজও ঈদের দিন কেল্লার বাড়ি গুলি সেজে ওঠে।নতুন পোশাকে আবৃত নিজামত পরিবারের মানুষদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে কেল্লার ভেতরের চক মসজিদ চত্বর।সমগ্র মসজিদ ভরে যায় শাহী আতরের খুশবুতে।এই দিন কেল্লার ভেতরের নিজামত পরিবার গুলি থেকে ভেসে আসে পুলাও,বিরিয়ানি সহ আরও নানান ধরণের শাহী খাদ্যের সুবাস।সব কিছু মিলে ঈদের দিন জরাগ্রস্ত কেল্লা নিজামতে নবাবী আমল যেন পুনরায় মূর্ত হয়ে ওঠে।
১৮১৪-১৫ সালে কোন এক ব্রিটিশ চিত্রকরের হাতে আঁকা কেল্লা নিজামতের ছবি


Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস