জীবন আঙ্গিকে কাঁদে নির্বন্ধব পুরীতে শেরশাহ (দ্বিতীয় পর্ব)
লেখিকা -প্রিয়াঙ্কা সরকার
(দ্বিতীয় পর্ব)
জীবন বোঝে জীবনের মানে ; আর তাই ফরিদ বুঝেছিলো জীবনের কোণে অপেক্ষা করছে বলিষ্ঠ সময়। অন্যের ন্যায় - অন্যায় বিচারে কাঁদে নিরুপায়, তাই বলে আর নিজেকে বেঁধে রাখা নয়। এবার পদক্ষেপ নিতেই হবে , তাই স্থানান্তর জৌনপুর। কিন্তু আফগানরা তো অস্ত্র বোঝে, আর ফরিদ বোঝে শিক্ষা। লেখনীর ধার কি, তবে ফরিদ কলমে বইতে জানে! জীবন থেকে নেওয়া শিক্ষা তো মিথ্যা হতে পারে না! বিরক্তির বিদ্রুপ কেঁদেছিলো ফরিদের উষ্ণ কন্ঠায়। কামিনী কাঞ্চন ছেড়ে চোখ খুলবে ভিন্ন স্থানে, এটাই তো চেয়েছিলেন মা ; যুদ্ধবিদ্যার অভ্যাসের ফসল ছুঁয়ে আজ ফরিদকে দাবিদার করতে কন্ঠস্বর চড়াও করেন বিবি। মিঁয়া রূপ বদলায়, মুখমিষ্টির আদরে ভরে দেয় বিবির প্রাণ।
মিঁয়া বলে ওঠে, বিবির রূপে সে মুগ্ধ, তাই অদেয় কিছু নেই। আজও নিকড়ে নিতে চায় প্রাণ, কিন্তু পারে কি! সে সুর মনের এক তন্ত্রীতে বেঁধেছিলো তা তো জংলী হয়ে গেছে জংলা রতিক্রিয়ায়। মন বলে ওঠে, জীবনটা অতিরিক্তের কাছে যৌতুক। কিছু এসে যায় না, কতোটুকু প্রাপ্তি তার ; তবু সম্পর্ক বাঁধন দেয়, হিসাব কষে গভীরে ; যতোটা দিতে পারা যায়, সেটাই তো ওজন করে সবাই, আমৃত্যুর হাত! ও তো কল্পনা। জীবন যখন মৃত্যুর বুকে আঁকিবুঁকি কাটে, তখন মনে হয় সত্য তো এটাই, কর্মের সুখে না বলে হারিয়ে যাওয়া। অবয়ব থাকলে রাগ, অভিমান, চপলতার চিহ্ন এঁকে দেয় দেহ রূপ নৌকা ; তাই উত্তরণের বুকে মিঁয়া হাসানকে অতিক্রম করেই ফরিদকে বেরিয়ে যেতে হবে। তবে মিঁয়া বিশ্বাস করে না, যে ফরিদ পথের বিপরীতে যেতে পারে ; মিঁয়া বলে, সে জন্ম দিয়েছে, মানুষ করেছে এতেই তো কৃতিত্ব, আবার পথের বিপরীতে গিয়ে তাকে সাহায্য করতে হবে, এমনটা কোথাও লেখা নেই।
কথায় আছে সাধারণের চেয়ে চোরের ভয় বেশী। অসামান্যের বুকে সামান্যকে আঁকড়ে নিয়েছে এতোকাল বিবি। কিন্তু সামান্য তো জানে , কেবল যোনি ক্রিয়া প্রতিপত্তির পুরুষকে সম্ভোগের দ্যুতি ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না। তাই ভয় হয়, প্রজন্মের দায়ভার নিতে হবে না তো তাঁকে। কিন্তু আজ আর বিবির বুকে ভালোবাসার ভাঁজ হয়ে ধরা যায় না। আসল আর নকলের পার্থক্য বুঝে গেছে বিবি।এবার শুধু ফরিদের ব্যক্তিত্ব জেগে ওঠার পালা। বাঁদীদের কাছে ধরা পড়েছে মিঁয়া। এবার আসছে ফরিদের সময়৷ সে জায়গির হবে নাকি অন্য বেগমের তোষণ করবে এটাই তো প্রশ্ন! নিজের মা থাকতে কেউ পুত্রের অমঙ্গলের দশা দেখতে চায়! না, বিবি তা পারেন না। মিঁয়া নাকি বিবির কথায় আজকাল জৌনপুরে পুত্রকে টাকা পাঠাতেন। আবার মাঝে মাঝে দেখাও করতেন। কিন্তু দুয়োরাণির দুস্বপ্ন ফরিদ।
মিঁয়া যে স্ত্রী দেহ গন্ধ আজও বইতে চায়, না পারে না ছাড়তে মৃতপ্রায় মেরুদণ্ডহীন পৌরুষত্বের অধিকার ছাড়তে। ওটাই যে মিঁয়ার বাকল আর ফলভোগ করে ফরিদ। অর্থাভাবে ফরিদের অবস্থা খুব খারাপ। একদিন বিষন্ন মনে নির্ভরশীল জীবনের ইতি টানার পথ খুঁজতে খুঁজতে ভাবছেন, এবার বুঝি দস্যুপ্রবৃত্তি জাগাতে হবে। একটি ছোরায় শান দিয়ে ঘাসে চোপ দিতে দিতে, হঠাৎ দুইজন এসে হাজির। আচ্ছা! কারা এরা! এরা জীবনের বুকে অন্ধকারের চিহ্ন নয় তো! অশুভ সংকেতে এরা আবার ফরিদকে বিপথে নিয়ে যাবে না তো।হীরার দ্যুতিতে তারা ফরিদকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। তাদেরও দল আছে, নির্ভরহীন হতে এই তো সুযোগ তার। কিন্তু, মায়ের মুখ আর নিজামের মুখ মনে পড়ে যায়। না, আজ ওই কথা মানলে ফরিদকে উপোস থাকতে হবে। কিন্তু ফরিদ দলের নেতা হতে চায়। দস্যু দলের আফগান নেতা বলে সে দিনের বেলার সম্রাট তবে রাতে সে দলের দলিল। এরপর আর পিছনে তাকায় নি ফরিদ। হিন্দি শিক্ষা এবং শৌর্যবীর্য তাকে সাজিয়ে দেয় মনে। দিনের বেলায় যার হাতে কলম এঁকে যায়, রাতে দস্যুশিক্ষায় তার বুকে বেদুইন রক্ত বয়।
আজ আর নিষ্কৃতির ইতিহাস নয়, ফরিদের বুদ্ধিবলে তাই অনিষ্ট হয় নি। মিঁয়া এবার বুঝতে পারে, যে তাঁর সময়ের উপযুক্ত জবার এবার তৈরি। শিক্ষা, সৌন্দর্য
আর মর্যাদাবোধ কোনো অংশেই তো ফরিদ অন্যের কম নয়৷ মায়ের কথা ভেবে ভয় হয়। সে মিঁয়ার বিরুদ্ধে যেতে চায়, কিন্তু তাতে মা আর নিজাম যে কষ্ট পাবে। নিজাম কে অধিকার দিতে রাজি নয় মিঁয়া। আর মায়ের কথা ভাবলে মনে হয়, সুখী নেই মা। আকুল মনে বোধ হয় কি আছে তার মায়ের নারী জীবনে! মর্যাদাবোধ, সম্ভ্রম না পায় নি নারীসত্ত্বার অহংকার৷ তাচ্ছিল্যের অহংকারকে আজ আর পরোয়া করে না ফরিদ। সত্যিই আজ মনে হয় কেউ খারাপ হয়ে আসে না, যা দেখে তাই তো মনের বুকে ভাঁজ পড়ে। আজ সে পাটোয়ারী হয়েছে। সাসারাম যা পেয়েছে, তা তো ফরিদকে কেউ দেয় নি। মিঁয়া প্রয়োজনে ফরিদকে বুকে নিয়েছে। স্বার্থকে সচলায়তন করতে মিঁয়া সব করতে পারে৷ জালাল কে দায়িত্ব নিয়েছে ফরিদ। জালালের মায়ের বিদ্যোৎসাহী মনোভাব দেখলে তৎকালীন সময়ে শিক্ষার রূপ ধরা পড়ে। উপস্থিত বুদ্ধি ও শিক্ষার অহং আস্তে আস্তে ফরিদকে গ্রাস করে৷
শোনা যায় বনাঞ্চলের প্রতি ফরিদের প্রবল আকাঙ্খা ছিলো। আর সেই ভালোবাসা থেকে জীবনের রঙে ধরা পড়ে ফরিদ৷ একদিন বৃক্ষ ঘেরা পথে ফরিদ এক অপূর্ব মেয়ের প্রেমে পড়ে৷ এ যেন প্রথম দর্শনেই রতিক্রিয়া। কারণ রূপ আর অরণ্যের চাঞ্চল্যকর পরিসরে তার কাছে নেশার মতো কাজ করে এক নারীপ্রাণ। এ যেন নিজেকে একবারে সতেজ করে নেওয়া৷ কিন্তু স্নাত পূর্ণযুবতীকে একবার নিজেই যাচাই করতে এগিয়ে যায়। অনেক আফগান ই তো আসে। ফরিদ পুরো আলাদা। সময়ের প্রেক্ষিতে ফরিদ জানতে পারে এক বৃদ্ধের কুটিরে সে নারী নাদিরা। সে কাছে ডাকে, কিন্তু আলুথালু বিস্ময়ে নাদিরা এগিয়ে এসে বলে, "তুমি বাবাকে বলো।" নাদিরার এক কথায় ফরিদ মুগ্ধ হয়ে শুধুই চেয়ে থাকে ; এ অভিনয় নয়, ফরিদের বুকে প্রেমের সাতগাহন গড়ে পরিণত ভালোবাসা।। ঝরাবকুলে নবত্ব ছুঁয়ে আসে হৃদয়ের ঐশ্বর্য ; মায়ের পরে যখন অন্য বিবিদের দেখে রাগ হয়েছিল, আর বদ্ধমূল হয়েছিলো হৃদয়ে যে নারী কুটিলা, আজ তা মনে হয় না। আজ ভরা যৌবন পাখামেলে অনুভূতির আবীরে ; মন খুলে বলতে চায়... " ভালোবাসি, ভালোবাসি।। "
ক্রমশ..................
তথ্যঋণ...
১) " শেরশাহ "- শ্রীপারাবত
২) ইতিহাস অভিধান
ছবি এডিটিং- প্রলয় সাহা
(লেখকের বক্তব্য ও ছবি নিজস্ব এর জন্য 'প্রত্নচিহ্ন' টিম কোন ভাবে দায়ী নন)

Comments
Post a Comment