রাখীবন্ধন এর ইতিহাস

লেখিকা-  রিয়া দাস


আজ রাখীবন্ধন। আহা শুনলেই মনটা ভরে যায়। যেমন আমি আমার দাদার হাতে আজ রাখী বাঁধী ঠিক তেমনি এই দিন দিদি বা বোনেরা তাদের ভাই বা দাদার হাতে রাখী নামে একটি পবিত্র সুতো বেঁধে দেয়। পরিবর্তে ভাই বোনকে উপহার দেয় এবং সারাজীবন তাকে রক্ষা করার শপথ নেয়। 
কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রশ্ন উঠে আসে যে কীভাবে এই রাখীর প্রবর্তন হল  ?? 
“ বহনা নে ভাই কী কলাই সে প্যায়ার বাঁধা হ্যায়, প্যায়ার কে দো তার সে সংসার বাঁধা হ্যায় “–  জনপ্রিয় এই গানের দুটি লাইনেই বোঝা যায় রাখীর ভারতীয় জীবনে কী মাহাত্ম্য। 
              ঝুলন পূর্ণিমা এলেই বাঙালির মনে পড়ে যায় রাখি বাঁধার কথা। আর রাখী বন্ধনের কথা এলেই মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ কে, যে কবি জড়িয়ে আছেন আমাদের জীবনে, আমদের মননে। 

              ঝুলন যাত্রার শেষ রাখী পূর্ণিমায়। রাখী উৎসব যে কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা আজ আর জানার উপায় নেই। এই নিয়ে নানা মুনির নানা ধরনের মত। তবে ভারতের সব ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গেই যেমন কোনও না কোনও পৌরাণিক কাহিনী জড়িত, ঠিক তেমনি ই রাখী বাঁধার পেছনেও রয়েছে এরকমই এক কাহিনী। 


               মহাভারতে আছে, একটি যুদ্ধে কৃষ্ণের কবজি তে আঘাত লেগে রক্তপাত শুরু হলে পঞ্চপান্ডবের স্ত্রী দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির আঁচল খানিকটা ছিড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দেন। এতে কৃষ্ণ অভিভূত হয়ে যান। দ্রৌপদী তাঁর অনাত্মীয় হলেও, তিনি দ্রৌপদী কে নিজের বোন বলে ঘোষণা করেন এবং দ্রৌপদী কে এর প্রতি দান দেবেন বলে প্রতি শ্রুতি দেন। বহু বছর পর, পাশা খেলায় কৌরবরা দ্রৌপদী কে অপমান করে তাঁর বস্ত্র হরন করতে গেলে কৃষ্ণ দ্রৌপদী রথ সম্মান রক্ষা করে সেই প্রতি দান দেন। এইভাবেই রাখীবন্ধন প্রচলন হয়। 

     বলিরাজা ও লক্ষী অন্য একটি গল্পে রয়েছে, দৈত্য রাজা বলি ছিলেন বিষ্ণুর ভক্ত। বিষ্ণু বৈকুণ্ঠ ছেড়ে বালির রাজ্য রক্ষা করতে চলে এসেছিলেন। বিষ্ণুর স্ত্রী লক্ষী স্বামীকে ফিরে পাওয়ার জন্য এক সাধারণ মেয়ের ছদ্মবেশে বলি রাজের কাছে আসেন। লক্ষী বলিতে বলেন, তাঁর স্বামী নিরুদ্দেশ। যতদিন না স্বামী ফিরে আসেন, ততদিন যেন বলি তাকে আশ্রয় দেন। বলিরাজা ছদ্মবেশী লক্ষী কে আশ্রয় দিতে রাজি হন। শ্রাবণ উৎসবে লক্ষী বলিরাজা র হাতে একটি রাখী বেঁধে দেন। বলিরাজা এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে লক্ষী আত্মপরিচয় দিয়ে সব কথা খুলে বলেন। এতে বলিরাজা বিষ্ণু ও লক্ষীর জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেন। সেই থেকে শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথিটি বোনেরা রাখীবন্ধন হিসেবে পালন করে। 

              বলিউডের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র জয় সন্তোষী মা এ (১৯৭৫) রক্ষা বন্ধন সংক্রান্ত একটি গল্প বলা হয়েছে। রাখীবন্ধন এর দিন গণেশের বোন গণেশের হাতে একটি রাখী বেঁধে দেন। এতে গণেশের দুই ছেলে শুভ ও লাভের হিংসে হয়। তাদের কোন বোন ছিল না। তারা বাবার কাছে একটি বোনের বায়না ধরে। গণেশ তখন তাঁর দুই ছেলের সন্তোষ বিধানের জন্য দিব্য আগুন থেকে একটি অন্যের জন্ম দেন। এই দেবী হলেন গণেশের মেয়ে সন্তোষী মা। সন্তোষী মা শুভ ও লাভের হাতে রাখী বেঁধে দেন। কিন্তু রাখীবন্ধন বলতেই বাঙালির মনে পড়ে যায় সেই ইতিহাসের কথা, লর্ড কার্জনের সেই বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের কথা আর তার প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পথে নেমে রাখি বাঁধার কথা। ১৯০৫ এর ১৬ অক্টোবর হল সেই দিন। বাঙালির ঘরে ঘরে অরন্ধন। কলকাতায় হরতাল। শহরে বহু গন্যমান্য ব্যক্তি, অগনিত মানুষ মিছিল করে চলেছেন গঙ্গাতীরে। মিছিলের পুরো ভাগে কবি, সবাই গঙ্গা স্নান করে পরস্পরের হাতে রাখি বেঁধে দিলেন। পরে রজনীকান্ত দাসকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সামনে যাকে পেলাম, তাঁর ই হাতে রাখি বেঁধে দিলাম। সরকারি কর্তাব্যক্তি, পুলিশ কাউকেই বাদ দিলাম না, মনে পড়ে একজন কনস্টেবল হাত জোড় করে বলেছিল, মাফ করবেন হুজুর, আমি মুসলমান। 
কিন্তু সে দিন তো হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্ঠান বলে কোন বাছবিচার ছিল না। সে দিন তো ছিল রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গের প্রতি বাদ। সে দিন বাঙালি মাত্র ই বেঁধে ছিল রাখি। ঐক্যের রাখি। 
তাইতো তিনি লিখতে পেরেছিলেন, – “ বাঙালির প্রাণ বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন এক হোক, এক হোক, এক হোক, হে ভগবান। “

ঐতিহাসিক দিকথেকে  বলা যায়, এক কিংবদন্তি অনুযায়ী, ৩২৬ খ্রীঃ পূর্বাব্দে মহামতি আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করলে আলেকজান্ডারের স্ত্রী রোজানা  রাজা পুরুকে একটি পবিত্র সুতো পাঠিয়ে তাঁকে অনুরোধ করেন আলেকজান্ডারের ক্ষতি না করার জন্য। পুরু ছিলেন কাটোচ রাজা। তিনি রাখী কে সম্মান করতে যুদ্ধ ক্ষেত্রে তিনি নিজে আলেকজান্ডার কে আঘাত করেন নি। 

আবার বলা হয়, শত্রুর হাত থেকে নিজের রাজ্যকে বাঁচাতে, মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের কাছে সাহায্য চান মেওয়ারের রানি কর্ণবতী। শোনা যায়, বাহাদুর শাহের সেনা বাহিনীর হাত থেকে সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য ১৫৩৫ সালের ৮ মার্চ রাণী কর্ণবতী ১৩,০০০ পুর স্ত্রীকে নিয়ে জহরব্রত পালন করে আগুনে আত্মাহুতি দেন। চিতরে  পৌঁছে হুমায়ুন বাহাদুর শাহকে দুর্গ থেকে উৎখাত করেন এবং কর্ণবতী র ছেলে বিক্রম জিৎ সিংকে সিংহাসনে বসান। 

অবশ্য সমসাময়িক ঐতিহাসিক দের লেখা থেকে রাখী প্রেরনের কথা অবশ্য জানা যায় না। কোনো কোনো ঐতিহাসিক রাখী পাঠানোর গল্পটির সত্যতা সম্পর্কে পোষন করেন। তবে মধ্য সপ্তদশ শতকের রাজস্থানী লোকগাথার এর উল্লেখ পাওয়া যায় ।। 

Comments

  1. Rakhi Bandhan er Etihad...by Ria Das ..lekhata bes bhalo hoacha..

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস