মুর্শিদাবাদের এক সুরম্য প্রাসাদের গল্প


লেখিকা- প্রিয়াঙ্কা সরকার

 

 

 

 

 

রজ্ঞনী বীণার সাতটি সুর তুলে ক্যামেরার মুখোমুখি আজ, "ওয়াসিফ মঞ্জিল" ; একদিন যা নবাবের হাতে কৃত্রিম পাহাড়ের ভূমিকল্প ধরে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছিলো, তা ১২ ই জুন ভূমিকম্পের আঘাতে ভূমি ছুঁলো ; সংস্কার হলো, কিন্তু,এলো না ভিত্তির মূলখন্ড।  করুণ ইতিহাস বলবেন!  প্রকৃত ভিত্তি হারিয়ে এমন করেই তো হারিয়ে যায় প্রাক্তন। কেন প্রাক্তন বলছি!  অতীতের বুক ছুঁয়ে এমন মনকাড়া স্মৃতিই তো প্রাক্তনের পূর্ণতা!  প্রাসাদের কোণ ছুঁয়েছে দূর্গ আকারের বিবিধ কারুকার্য।

প্রকৃতির কোল ছুঁয়ে একবার উত্তরসূরী খুঁজলে মন মাতাল করা ব্যক্তিত্বের কন্ঠস্বর শোনা যায়। আলুথালু নারকেল গাছের সারিকে আবেশ করে, দূরে তাকালেই যেন কুয়াশা দেখছি। বৃষ্টিসিক্ত এই আহ্লাদী প্রাসাদ দেখলে নবিবের "কঙ্কাল সার " বেঙ্গুয়েলা স্রোত মনে পড়ে যায়। পরিত্যাক্ত ঘাসের বুকে পা রাখতেই এই প্রাসাদ মন কাড়ে। মূলপ্রবেশের পথে একটি নরম্যান আর্চওয়ে, যা প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণের ফসল। একটি ঝর্ণা আর কয়েকটি মার্বেল মূর্তি যেন ঋষি প্রেম৷ উদ্বিগ্ন হয় হৃদয়, অভিশপ্তের কুঠুরি থেকে চন্দ্রকলার মতো বিকশিত হয় তনু মন। স্নাত প্রাসাদ যেন ব্রাহ্মমূহুর্তের সাজ।

 মরচে পড়া ইতিহাসের কথামালা ছুঁয়ে মন চলে মায়াবী খেলায়।  বৃক্ষ তো ভ্রুণ শক্তির ধারক,  তাই অতীতের মুখোমুখি থেকে পিছু পিছু আঙিনা স্পর্শ করতে চায়৷ লোহার পরিখারা যেন বজ্রের মতো দুই ঠোঁটে আঁকড়ে ধরেছে  উদ্বেগ। লালসার পঙ্ককুণ্ডের মতো মন অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে চায়। গা ছমছল প্রকৃতিরও তো সোহাগ থাকে, প্রতিক্ষণে অতীতের শ্বাস।  উঁচু স্তম্ভের উপর হাত রেখে এগিয়ে চলা অভ্যন্তরের ডাকে। প্রসাদে ঢুকতেই চোখে আসে,  নবাবী আমলের নবাবের আসবাবপত্র, চাঁদি-সোনা দিয়ে তৈরি হাতির মুকুট, মিশ্র ধাতুর তৈরি হাওদা, জরির কাজ করা বেগমদের শাড়ি, বেগমদের ব্যবহৃত দুর্মূল্য কাঠের পালকি, যা রয়েছে তা সবই আজ ধ্বংসের মুখে।



কিন্তু,  অতীতের প্রাক্তন হারিয়ে বলেই কি তবে অভিযোগ নীরব থাকবে!  তাই তো অভিযোগ, উঠেছে রক্ষণাবেক্ষণের দিকে। তথ্যসূত্র বলে,  সংগ্রহশালাটি নাকি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।  সিপাহী বিদ্রোহের দুষ্প্রাপ্য চিঠি পত্রের দলিল আজও সাবলীল।  বুকের ভিতর তোলপাড় করে দেয় প্রতি ঘরের স্পর্শকাতর অনুভূতি৷ ভুরু কুঁচকালে  নাকি আজও শ্লেষের হাসি হাসে।  শোনা যায়,  ওয়াসেফ আলি মির্জার দাদু  অর্থাৎ  হাসান আলি মির্জার পিতা  ফেরাদুন জা - এর  সাথে  বহু পূর্বে লর্ড ডালহৌসির  এর মতানৈক্য হয়; এখানে ইতিহাস  সাক্ষ্মী বহন করে।  ফোঁপানিতে কেঁপে ওঠে অবহেলার দলিল।

সময়টা ১৯০৬ ; হাসান আলি মির্জা খান বাহাদুর দেহত্যাগ করলেন৷ তাই জ্যেষ্ঠপুত্র হিসাবে ওয়াসিফ আলি খান কে দায়িত্ব নিতে হয়। ওয়াসিফের মেধা ও ব্যক্তিত্ব বুঝেই তাঁকে মাত্র ১২ বছর বয়সে ইংল্যাণ্ডে পড়াশোনা করতে পাঠানো হয়৷ তবে ফিরে এসে কলকাতার ডোভেটন কলেজের পিন্সিপাল জনাব কোলাস ,  নবাবের শিক্ষার দায়িত্ব নেন৷  তিনি  ট্রিনিটি কলেজ থেকে  শিক্ষালাভ  করেন ; শোনা যায় ১৮৯৫ তেই তিনি ভাইয়ের সাথে মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন। তিনি শুধু সিংহাসন নয়,  বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন। নবাবের কলম ইংরাজি ও উর্দু কবিতার জন্য যথেষ্ট জনপ্রিয়৷ একটি নথিভিত্তিক তথ্যসূত্র বলে, ওয়াসিফ আলী খাঁ প্রচুর ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন। সাজা স্বরূপ ভারত সরকার তাঁর কাছ থেকে   প্রশাসনের দায়িত্ব কেড়ে নেয়।   
 
"১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট রাডক্লিফ পুরস্কারটি পাকিস্তানের মুর্শিদাবাদ জেলার জন্য বরাদ্দ করা হয় এবং পাকিস্তানি পতাকা হজত করে পাকিস্তানে পতাকা উত্তোলন করা হয় কিন্তু দুই দিনের মধ্যে দুই রাজ্যে খুলনা, যা এখন বাংলাদেশে বিনিময় হয় এবং তারপর ভারতের পতাকা উল্টে ফেলা হয় ১৭ আগস্ট, ১৯৪৭ ।  ওয়াসিফ আলীও হিন্দু-মুসলিম ইউনিটি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৩৭ সালে আঞ্জুমান-ই-মুসুলমান-ই নামে প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। নওয়াব এছাড়াও ওয়াসিম মঞ্জিল নির্মিত, এবং তার পরে এটি নামকরণ।"


পারিবারিক বলতে স্যার ওয়াসিফ আলি মির্জা বহুবিবাহ করেন।  প্রথমে ফাগফুর জাহান বেগম এর নাম পাওয়া যায়।   এরপর নবাব মুমতাজ মহল ইমামি  বেগম সাহেবা  নাম পাওয়া যায়৷ তিনি (১৯০৩)   সালে তালাকপ্রাপ্ত হয়৷  এরপর আসে মেহের জাহান দিলদার আরাবেগম।   পরবর্তীকালে  সুগরা  খানুম ও সুশিলা খানুম এর নাম পাওয়া  যায়৷।

পারিবারিক ও উত্তরসূরী তেমন ভাবে পূর্বপ্রেক্ষাপটের  চিহ্ন রেখে না গেলেও, প্রচলিত রীতি নীতি থেকে বেরিয়ে, স্যার ওয়াসিফের মধ্যে ব্রিটিশ চাল চলন এবং বহুমুখীকরণ চোখে পড়ে। শিক্ষা, খেলাধুলা, শিকার, সাহিত্য, সমাজ যেন কাল পটুত্বের অধিকার বুঝিয়ে দেয় । সীমাবদ্ধতার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে তাঁর ধ্যান ধারণা যেন অনন্তের মুলুকের খোঁজ দেয়৷ কালের পারিপাট্য, আজও তাঁর মনজিলের বুকে শয্যা গড়ে যায়। ঋষি মহীরুহের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাস,  পদ্মের আকারে পাপড়ি মিলিয়ে সম্বন্ধের প্রচীনত্ব, ও ঝাড়বাতির শোভা ও আসবাবের অতীত অস্থির বার্তা বাহক হয়েও অনড় ভাবে অবস্থান করছে। হারিয়ে যায় স্তুতি,  হারিয়ে যায় ত্যাগ, উন্মোচনের আলাপন..  নতুনকে আলিঙ্গন করতেই হয়, তবেই ইতিহাসের প্রাপ্তি৷

Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস