ইতিহাসে নারী : প্রাচ্য পাশ্চাত্যের নানান দিক

 

 

কাজী হাসিব হাসান

 

 

বিশ্ব-ইতিহাসে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এখান থেকেই পুরনো ব্যবস্থার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পর্যায়ক্রমে উন্নয়নের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে।অবশ্য এ ব্যপারে বরাবর ইংল্যান্ড সারা বিশ্বে এগিয়ে ছিল সেটা স্বীকার করতেইহয়।এই সময় কালে ভারতের ইতিহাসটি ছিল আবার অন্য ধরনের, একে একে আঞ্চলিক শক্তিগুলি ঔপনিবেশিক শক্তির নাগপাশে বন্দি হচ্ছে।ফরাসি বিপ্লব ও তৎপরবর্তী নেপোলিয়ন আইন বিধিতে সমানাধিকারের কথা বললেও নারী মুক্তি বা নারীর অধিকার দানের প্রশ্নে তা ছিল একেবারে নিরব।অবশ্য ১৮৩০ সালের পর থেকে জাতিরাষ্ট্র গঠনের জোয়ারে অনেক গুলি বৃহৎ যুদ্ধ ও নবতন সংযোজন শিল্প-বিপ্লব নারী মুক্তি ও সমানাধিকারের জন্য লড়াইয়ে ঘর থেকে বেরিয়েআসার সু্যোগ দান করেছিল।যুদ্ধে পুরুষদের নিয়োগে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমিকের চাহিদা মেটাতে ও পরিবার বহির্ভূত দৈনন্দিন কাজে নারী পরিবারের চৌকাঠ পেরোতে বাধ্য হয়।ফলস্বরুপ নারীর ক্ষমতায়ন ঘটতে থাকে।অন্যদিকে যুদ্ধ পরাজিত জাতি বা দেশের নারীদেরকাছে অভিশাপ স্বরুপ, যুদ্ধ জনিত কারণে তাদের ধর্ষন ও অত্যচারের স্বীকার হতে হয়।

 ১৮৪৮ সালে আমেরিকায় একটি টি-পার্টিকে কেন্দ্র করে প্রথম নারীর সমানাধিকারের আন্দোলনের সূত্রপাত। ফলে সারা বিশ্বে নারী আন্দোলনের ধারা ছড়িয়ে পড়ে,প্রাথমিক পর্যায়ে এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি ছিল মধ্যবিত্ত নারী সমাজ।তবে তাদের এই লড়ায়ের পথ সুগম ছিল না।ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের ব্যাপক প্রসার ও সুলভ শ্রমিকের প্রয়োজন মেটাতে নারীদেরব্যাপক ভাবে নিয়োগ করা হয়।ফলে নারীদেরমধ্যে সাংস্কৃতিক আদান প্রদানের মধ্যদিয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে সংগঠনের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ চলতে থাকে।এই সময় কালে ইউরোপে যুদ্ধবিবাদ চলতে থাকায় উৎপাদন ব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।নারীদের রাষ্ট্র নির্মানে সক্রিয় অংশ গ্রহনের ফলে রাষ্ট্র ব্যবস্থা স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রনে শিথিলতা আনতে বাধ্য হয়।এইসময়ে ভারতীয় নারী সমাজ ছিল ঘরের চৌহদ্দির মধ্যে আবদ্ধ।তারা সমানাধিকার ও স্বাধীনতার ধারনা থেকে ছিল অনেক দূরে।প্রাথমিক ভাবে নারী উন্নয়ন ও শিক্ষার ব্যাপারে যে কয়েকটি উদ্যোগ দেখা দিয়েছিল তা সমাজ সংস্কারকদের উদ্যোগে।রামমোহন, বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরদের মত মনিষীদের প্রচেষ্টায় নারী শিক্ষা ও আধুনিকীকরণের প্রথম পর্যায়ের কাজ খুব ধীর গতিতে চলতে থাকে।

 বিংশ শতকের প্রথম ভাগে ইউরোপে নারীর সমানাধিকার বেশিরভাগ দেশে স্বীকৃতি পায়।প্রথম পর্যায়ের নারী স্বাধীনতার পরিক্ষা-নিরিক্ষা সেখানে নতুন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে।তার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধও যুদ্ধজনিত করণে ব্যাপক প্রাণহানি,বিশেষত আমেরিকান সংস্কৃতির আগমনের ফলে ইউরোপীয় জনজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।যুদ্ধে ব্যাপক ভাবে পুরুষদের নিয়োগ, অর্থনৈতিক সংকট ও সদ্য আগত আমেরিকান সিনেমার নোংরামি ইউরোপীয় জনজীবনে বিভীষিকাসৃষ্টি করে।এই সময় বিশেষ করে ইংল্যান্ডের নারীরা পরোকিয়ায় মেতে ওঠে,যা সে দেশের সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে।যার দায় সারা ইউরোপ এখনও বহন করে চলেছে।ভারতীয় ইতিহাসে গান্ধীজীর উত্থান নারী সমাজে এক বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে।ভারতীয় সাধারণ নারীরাএই প্রথম গান্ধীজীর ছত্রছায়ায় পর্দা ও বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে জাতীয় আন্দোলনে যোগদান করে।তাদের এই নতুন অবতারকে ভারতীয় জনসমাজ সাদরে গ্রহণ করে।বিশেষত উল্লেখ্য গান্ধীজীর দুজন ছায়া সঙ্গিনী ছিলেন মনুবেন ও আভা।বিভিন্ন গুপ্তসমিতি ও সংগঠনেযোগদানের মাধ্যমে পুরুষদের সাথে ভারতীয় রমণীদের পায়ে পা মিলিয়ে চলতে দেখা গেছে।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রথম দিকে মিত্রশক্তির পরাজয় ঘটতে থাকে,আমেরিকার হস্তক্ষেপে যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি পাল্টে যায়।ফলে স্বাধীনচেতা ইউরোপীয় রমনীদের কাছে স্বদেশীয় সৈন্যরা হেউ প্রতিপন্ন হয়।তারা বীর পুরুষ হিসাবে আমেরিকান সৈন্যদের দেখতে থাকেন।ফলস্বরুপ ইউরোপীয় সমাজ জীবনে ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।আমেরিকানদের হাত ধরে ইউরোপে এইডস মহামারি তার তাণ্ডবলীলা চালায়,যায় দায়ভার সারা বিশ্ব এখনও বহন করে চলেছে।১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে ও নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের বৈধ সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।বামপন্থী ধারনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় নারীরা আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের প্রতিকুলতা অনেকাংশে কাটিয়ে উঠতে পেরেছে।তবে নানা জাতি,ধর্ম,ভাষা ও সংস্কৃতির দেশ ভারতবর্ষে সব জায়গায় নারীর ক্ষমতায়ন সমান ভাবে হয়নি।এখনও রাজস্থান, হরিয়ানার মত রাজ্যে 'খাপ' ব্যবস্থা সামাজিক ব্যাধি রুপে আজও টিকে আছে।যা নারী স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রতি পদে বাধা সৃষ্টি করে চলেছে,ভারতীয় সংবিধানে নারীদেরজন্য বিশেষ রক্ষাকবচ থাকা সত্বেও।

 

অতীত থেকে  বর্তমান নারীরস্বাধীনতা ও সমানাধিকারের লড়াই চললেও,নানা সময় ভারত ও পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ-বিগ্রহ নারী জাতির প্রতি ভয়াবহ উৎপীড়নের কাহিনী বর্ননা করে।যুদ্ধক্ষেত্রে ও যুদ্ধ পরবর্তী কালে হত্যালিলার স্বীকার হয় পুরুষেরা।কিন্তু নারী জাতি বিজয়ীদের ভোগ্যপণ্যে পরিণত হয়েছে বার বার।ইতিহাসের পাতায় ঘুরে ফিরে আসে জহরব্রত ও সম্মিলিত ভাবে অগ্নিকুন্ডে ঝাপ দিয়ে মৃত্যবরনের কাহিনী,শুধুমাত্র নিজেদের সম্ভ্রম বাঁচানোর তাগিদে।এখনও পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই আছে,আজ আমরা আধুনিক সমাজে উন্নিত হওয়া সত্ত্বেওনারী নির্যাতনের মত ঘটনা ঘটে চলেছে।১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কালেনারী জাতির প্রতি নেমে এসেছিল ভয়াবহ দূর্যোগ। এই অত্যচারে কয়েক লক্ষ নারীর যে  চরম অবমাননা হয় ইতিহাসে তার জুড়ি মেলা ভার।কালে কালে যুদ্ধ নারী জাতির প্রতি অবমাননা  করেছে ও করছে এটা অস্বীকার করা যায় না।

 

নারীর সমানাধিকার ও ক্ষমতায়নের চিত্রগুলিকে একটু অন্য ভাবে দেখা যাক।ভারতীয় তথা বাঙালি সমাজে নারীর সমানাধিকার নিয়ে আশির দশকে নতুন ধরনের টানাপোড়েন চলতে থাকে।তার সঙ্গে বিনোদন জগতের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ চোখে পড়ে 'বসন্তবিলাপ,ওগো বধু সুন্দরি ' প্রভৃতি সিনেমায় দেখা যায় আমাদের সমাজ জীবনে নারী আন্দোলনে বামপন্থী কর্মকান্ডের কর্মযজ্ঞ।অন্যদিকে আশি ও নব্বয়ের দশকে হিন্দি সিনেমায় "মা"চরিত্রে মা তার স্বামী ও ছেলের দ্বন্দ্বে তিনি কোন পক্ষ নেবেন তার টানাপোড়েনের ঘটনা।তিনি কখনই স্বামীর বিরুদ্ধে গিয়ে বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে নিজস্ব মতামত দিতে তার দ্বিধাগ্রস্থতা কাটিয়ে উঠতে পারেন নি।অবশ্য দেখাযায় নব্বই দশকের শেষের দিকে 'মা'তার সেই দ্বিধাগ্রস্থতা কাটিয়ে সামাজিক বেঁড়াজাল ছিন্ন করে স্বাধীন মতামত গ্রহণে সমর্থ হলেন।এখানে নারী প্রাচীর সময় থেকে চলে আশা পুরুষ তান্ত্রিক সমাজের বন্ধন থেকে নিজের মত করে মাথা উচু করে তার আধুনিক যাত্রা সুরু করে।একবিংশ শতাব্দী সিনেমায় অনেক গুলি নারি কেন্দ্রীক চরিত্রে এযুগের সমাজ জীবনের চিত্রকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

 আমেরিকান ও ইউরোপীয় নারী সমানাধিকারের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও আধুনিক কালে তা যেন কোন কোন ক্ষেত্রে মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।ভারতীয় নারী আন্দোলনের ধারা নবীন কাজেই, সেই প্রাচীন কাল থেকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে নারী তার ক্ষমতায়নের পথে অনেক খানি অগ্রসর হয়েছে।যদিও তাদের পথ চলা অনেকখানি বাকী। শহর ও গ্রামের নারী সমাজের মধ্যে এদেশে রয়েছে বিস্তর ফারাক।ইউরোপীয় দেশগুলি সামাজিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিজেদের স্বদেশীয় সংস্কৃতির পতন ঘটিয়েছে।আমাদের সমাজেও উপর তলায় সেই রকম প্রবণতা সম্প্রতি দেখা দিয়েছে।তবে ভারতীয় সমাজে নারীর ক্ষমতায়নের পথে যে যাত্রা শুরু হয়েছে,তাদেশ গঠনে অনেক খানি সহায়ক হয়েছ।

 

 

 

কাজি হাসিব হাসান পেশায় মুর্শিদাবাদের লালবাগ এসসিবিসি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক।তার ভাল লাগার বিষয় ইউরোপের ইতিহাস।ইউরোপের ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে তার কয়েকটি লেখা ইতিপুর্বে কিছু অফ লাইন ও অনলাইন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

 

 


 

Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস