মতিচুর কথা

 


 

 প্রিয়াঙ্কা সরকার 

 

 

 

 

 ভোজন রসিক বাঙালি জীবনের স্বাদে বিলাসিতা মানেই মিষ্টি। আসুক অতিথি,  ঈশ্বরের কাছে ভরিয়ে দেওয়া স্বাদের উৎসব আয়োজনে একটু মিষ্টি ছাড়া পূর্ণতা পায় না। শোনা যায়, বাঙালি প্রথম পর্তুগিজদের কাছ থেকে ছানা তৈরি শেখে। তবে ক্ষীর আর পায়েস তখন ছিলো প্রথম হাতেখড়ি। এতো মাধ্যম, এতো আয়োজনের সংসারে শতেক ব্যঞ্জন কে জানতো বলুন তো!  চিনির সাথে ছানার এই যে পরিপাক তা কিন্তু অষ্টাদশের শেষভাগে শুরু করে হুগলির হালুইকরেরা৷ প্রথমের দিকে টাঙ্গাইলের চমচম,  বগুড়ার দৈ,  নাটোরের কাঁচাগোল্লা, কুমিল্লার রসমাল্লা এতো শোনাই যেতো,  কিন্তু আস্তে আস্তে কালের ধারায় মোড় নিলো ছানামুখী রসিক বাঙালি,  এ দেশেও।

আজ যেহেতু, মতিচুর নিয়ে কথা বলছি, তাই ইতিহাসকে ভিত্তি ধরে কথা বলতেই মন চাইছে। পরিবর্তন আসবে, বিবিধ ক্ষেত্রে  বইবে বাতাস, কিন্তু ভিত্তিকে অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতা৷ বিষ্ণুপুরের বুকে যেমন ধ্রুপদ সুর খেলা করে, অনুরূপে নাকে আসে মোতিচুরের গন্ধ!  ওমা!  ইতিহাস চুপি চুপি কথা বলে বৈকি৷ ধ্রুপদের যে ধার, যে আমেজ তা তো মল্লরাজের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রিয়া করে। এ যেমন অনন্যতায়, স্বতন্ত্রতায় এক ঘরানা খুঁজে নেয়, তেমন করেই মল্লরাজাদের কৃষ্ণপ্রেম একসময় বিষ্ণুপুরে গড়ে তুলল টেরাকোটা মন্দির৷ আজও সেই টেরাকোটা দেখলে পাগল হই। অতীত যখন বাক মানে না হৃদয়, কাছে টানে পরম্পরায়, তখনই প্রেম আসে, আঁকড়ে ধরার টানে। ঠিক যেমন করে সেদিন কার্জনের আগমনে বর্ধমানের রাজার সীতাভোগ তৈরি হয়, আর রাণীর আবদারে শক্তিগড়ের লাংচা, অনুরূপে গোবিন্দের প্রসাদের জন্য নতুন মিষ্টির ভাবনায় " মতিচুর " প্রস্তুত হয়।

শোনা যায়, তখন পিয়াল গাছের জঙ্গল থেকে পিয়াল ফলের বীজ সংগ্রহ করে তা থেকে বেসন তৈরি হতো। তারপর রসের পাকা রূপ পেতো এই মতিচুর।তাই তো বিষ্ণুপুরের মারুইবাজারের এক নির্দিষ্ট প্রস্তুতকারকের হাত ধরেই নিবেদনের নবনায়ন। আস্তে আস্তে তা গান বাজনার জলযোগের অঙ্গ হয়ে ওঠে৷ আজ  লাড্ডু ভাইয়ের পূজো। সাজিয়ে দিয়েছে প্রিয়জন "মুক্তো ভাঙ্গা গুড়া ", নাম মতিচুর৷ ইতিহাস বলে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলেও নাকি বিহারে এই মতিচুর উদ্ভব হয়। আজ যখন ক্যালরি নিয়ে মানুষের সংযত মনের ভাব, তখন ভুললে চলবে কি করে ৭ % প্রোটিনও কিন্তু এরই অঙ্গ।

" ওম গণপতায় নমঃ", এই মন্ত্র ১০৮ বার জপ করেই আসুন আজ নিবেদন করি মতিচুর । পুরাণ মতে মোদক " আসলে জ্ঞানফল। আজ ত্রিভুবনের শান্তি কামনায় আসুন নিবেদনের সমর্পণ।

তথ্যসূত্র -

১.ebela.in

২.উইকিপিডিয়া

৩.সমকাল 

 

  প্রিয়াঙ্কা সরকার পুর্ব বর্ধমানে বসবাস করেন।তিনি বাংলায় মাস্টার্স করেছেন ২০১০এ তার পর ২০১১ তে লাইব্রেরী সায়ন্সে এবং ২০১২তে এনভাইরনমেন্ট সায়ন্সে ২০১৩ তে কমিউনিকেটিভ ইংলিশে পিজি ডিপ্লোমা সম্পূর্ণ করেন এবং ২০১৪ তে তিনি বি.এড ডিগ্রি লাভ করেন।ইতিহাস নিয়ে তার ভালোলাগার অন্ত নেই।তার মনের মধ্যে ইতিহাস যেন সদা জাগ্রত।ইতিহাসের নেশায় তিনি সর্বদা বুঁদ হয়ে থাকেন।ইতিহাস নিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের নানান অনলাইন  ও অফলাইন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখে চলেছেন।এছাড়াও তিনি বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে ভালবাসেন,কবিতা লেখেন,আবৃতি করেন,গান করেন,সেই সাথে তার আরও একটি ভালোলাগার বিষয় পারলোক চর্চা।এই বিষয়ে তিনি সমানে গবেষণা করে চলেছেন।


Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস