ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা
রিয়া দাস
" ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো
তোমাতে আমরা লোভিয়া জন্ম ধন্য হয়েছি ধন্য গো "
স্বাধীনতা দিবস। আজ ১৫ আগস্ট ৭৪ তম স্বাধীনতা দিবস পালন করছে ভারত। ভারতের ইতিহাসে এই ১৫ আগস্ট দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত ব্রিটিশ রাজশক্তির শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। সেই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ১৫ আগস্ট তারিখটি ভারতে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ভারত দীর্ঘকাল লড়াই চালায় এবং আজকের দিনটা বিভিন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামী যাঁরা দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেন তাদের স্মৃতির উদ্যোগে পালিত হয়। এছাড়াও এই দিনে দেশের প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রদর্শন এবং দেশের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার শপথ গ্রহণ করা হয়।
স্বাধীনতা দিবস জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পরিগণিত হয় এবং ভারতীয়রা এই দিনটাকে নিজের মতো পালন করে। প্রতি বছর ১৫ আগস্ট দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। অনুষ্ঠানটি জাতীয় চ্যানেল দূরদর্শনের সাহায্যে সারা দেশে সম্প্রচারিত হয়।
ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালীর ভূমিকা ছিল অন্যতম। ইংরেজ সাম্রাজ্যের প্রথম দিক থেকেই বাংলার মানুষ ভারতকে স্বাধীন করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। ভারতীয় বিপ্লবীরা হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান মুখ। কিন্তু সেই একই সময়ে বাংলার নারীরা ছিলেন ঘরে ও বাইরে পরাধীন। বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও সতীদাহের মত বর্বর প্রথাগুলি ওঁদের পায়ে বেড়ি পরিয়ে রেখে ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলার নারীরা সবকিছুকে উপেক্ষা করে দলে দলে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ হয়তো পাঁচ জনের নামও সঠিকভাবে বলতেও পারব না। এই বর্তমান হয়তো তাদের ভুলতে বসেছে।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে পুরুষদের সাথে সাথে বাঙালি নারীরাও সমানভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ননিবালা দেবী। তিনি ১৮৮৮ সালে হাওড়ার বালিতে জন্মগ্রহণ করেন। খুব অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন এবং বাবার কাছে চলে আসেন।
এরপর আস্তে আস্তে তিনি বিপ্লবের দিকে ঝুঁকতে থাকেন। ১৯১৫ সালে তিনি বিপ্লবের দিক্ষা নেন অমরেন্দ্র চ্যাটার্জীর কাছে। তাঁর অবদান হিসেবে ছিল বিপ্লবীদের রিষড়া ও চন্দননগরে ভাড়াবাড়িতে আশ্রয়দান করে রাখা। এছাড়াও রামচন্দ্র বাবুর স্ত্রী সেজে জেলে গিয়ে পিস্তলের খোঁজ নিয়ে আসা। তিনি ১৯১৯ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দী ছিলেন। তাঁর শেষ জীবন কেটেছিল খুব অবহেলায়। তাঁকে পুলিশের ভয়ে আশ্রয় দিতে চান নি। কষ্ট ও দারিদ্র ছিল তাঁর নিত্য সঙ্গী। সরকারের কাছে সাহায্য বলতে পেয়েছেন পঞ্চাশের দশকে পঞ্চাশ টাকা পেনশন। ননিবালা দেবী ছিলেন বাংলার প্রথম মহিলা স্টেট প্রিজনার। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে কোন এক সময়ে ননিবালা দেবীর মৃত্যু হয়। বীণা দাস ছিলেন একজন ভারতীয় বিপ্লবী। তিনি ১৯১১ সালের ২৪ আগস্ট কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের আদি বাড়ি ছিল চট্টগ্রামে। তাঁর পিতা বেণীমাধব দাস ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষক সমাজসেবী ও ছাত্র দরদী বিদ্যান মানুষ। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু লেখা বই “ ভারত পথিক “ থেকে জানা যায় যে, Revenshaw Collegiate School এ পড়ার সময় তিনি এই বেণীমাধব দাসের ছাত্র ছিলেন এবং তখন থেকেই সুভাষের মনে দেশপ্রেমের এক অমোচনীয় দাগ রেখে গেছেন তিনি। বীণা দাসের মা সরলা দেবী নিঃস্ব ও অসহায় মহিলাদের সাহায্যের জন্য তৈরি করেছিলেন সরলা পুণাশ্রম। ১৯৩২ খ্রী ৬ ফেব্রুয়ারি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশন হলে তৎকালীন বাংলার Governer স্ট্যানলি জ্যাকসনের ওপর গুলি চালিয়ে গ্ৰপ্তার হন। পরবর্তীতে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন।
আভা দে ছিলেন একজন বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামী যিনি তাঁর সাহস ও শারীরিক শক্তির জোড়ে জীবনকে তুচ্ছ করে দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সাঁতার কাটা, দৌড়ানো, গাছে ওঠা সবেতেই ছিলেন তিনি সমাজ পারদর্শী। এমন একজন নারী যিনি ইংরেজ পুলিশের ঘোড়ার লাগাম টেনে প্রতি রোধ করেছিলেন। ১৯৩০ সালে নারী সত্যাগ্রহ সমিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বে আইনি শোভাযাত্রা ও সভায় যোগদান করে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দী থাকেন। আভা দে র জন্মকাল, জন্মস্থান সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না।
আভা কে তাঁর বন্ধু কল্যাণী দাসের সঙ্গে “ ছাত্রীসংঘ “ এ যোগদান করেন। একবার ছাত্রীসংঘ থেকে সাইকেল প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হয় সেখানে তিনি নাম দিয়ে কলিকাতা থেকে বর্ধমান অথাৎ প্রায় ১০০ কিমির ওপর সাইকেল চালিয়ে তিনি প্রথম হন।
এমনও অনেক দিন গেছে যে তিনি দু চার পয়সায় তেলে ভাজা খেয়ে সারাটা দিন কাটিয়ে দিয়েছেন, তার ই ফলে সম্ভবত ১৯৩৮ সালে দেওঘরে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হয়ে আভা দেবীর মৃত্যু হয়।।
স্বাধীনতা দিবসে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম জেগে ওঠে এবং পরস্পর কে মানুষ স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা বার্তা জানায়।।
তথ্যসূত্র – ১)আনন্দবাজার পত্রিকা
২) কমলা দাশগুপ্তের লেখা “ স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী “।
লেখক পরিচিতি - রিয়া দাস রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্রী।বরাবরই ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী।সাথে অবসর সময়ে কবিতা লিখতে ভালবাসেন। ইতিহাস নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। অতীতের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়েন অতীত অনুসন্ধানে।রাজ্যের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ইতিহাস নিয়ে নানান গবেষণাধর্মী লেখা তিনি নিয়মিত ভাবে লিখে চলেছেন।





Comments
Post a Comment