রাষ্ট্রিক নয় ভারতের মধ্যযুগের সাধনা


প্রিয়াঙ্কা সরকার

 

 

                                                                     ( প্রথম পর্ব)

সম্বৃদ্ধের আধারে ভারতকে দেখলে ভারতবর্ষ জীবনী শক্তির ধারক৷ মেলবন্ধন,  পারস্পরিক প্রাণশক্তির কেন্দ্রস্থল হিসাবে যদি ধরি, তবে কিন্তু সেটা মধ্যযুগের নয়৷ শক, হুণ দল ভারতে এসেছে, কেউ ভারতবর্ষকে ভালোবেসে এখানে থেকে গেছে, আবার কেউ কেউ লুঠ করেছে। বয়ে যাওয়া জীবন অনেকটা  দুধটুকু সার করে যতোটা স্বাদ নেবে, ততটাই পাওয়া, উপরের মাটা তো ঘি,  ওতে বিরুদ্ধাচার আসে না৷ কিন্তু এই প্রাণশক্তি আঘাত করলো যেদিন সেদিন চিন্তাশীল মনন যেন নির্গূঢ়মর্মবাদী রূপে আত্মপ্রকাশ করলো। আসলে এতোদিন ভাবনার অলংকারে আবদ্ধ ছিলো উপনিষদ, এবার সাধনার গভীরে প্রাণখোলা শ্বাসে তা অঙ্গ হয়ে উঠল। এখন প্রশ্ন আসবে এমন করেই কি চিন্তাশীল সাধক বুদ্ধ এগিয়েছিলেন!  হ্যাঁ, চিন্তন মনশ্চক্ষু জাগ্রত হলেই চেতনার ভ্রুণটি শীলে পরিণত হয়। আর তখনই আসে প্রজ্ঞা ; ধর্মমতে ধর্মসাধনায় ধর্মসমাজে যখন ভারত, তখন ভারত জীবন্ত। ক্রমে ভারত তার শক্তি হারায়।  ধর্ম, সমাজ চিন্তা, রাজনীতি সবটুকু যখন ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ, তখনই মধ্যযুগ।

সময়ের গভীরে ঠাঁই পেলো অন্ধত্ব। আয়োজনের জটিলতা,  এবং ভক্তিভাবের সরসতার সহজ প্রেম যেন আঘাত হানলো।  কিন্তু ভক্তিবাদ নতুন নয় ; বেদেও আমরা দেবতার স্তবে ভক্তি ভাব দেখতে পাই; আর্যদের পূর্ববর্তী ভক্তির ভাব লক্ষ্য করা যায়। এরপর জ্ঞান মিলে মিশে ভারতবর্ষের বুকে ধর্মভাব উদয় হয়৷ উপনিষদের যুগের প্রাককালে  যাগযজ্ঞ ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধতার আঘাত নিয়েই কিন্তু আধ্যাত্মবাদ৷ বৌদ্ধ ভারতে বিশুদ্ধ জ্ঞানের প্রচার ক্রমে প্রতিঘাতে লোকচিত্তে গভীর হয় এবং প্রেমভক্তি বিস্তার লাভ করে। ক্রমে পটপরিবর্তিত হয়ে  মধ্যযুগ  নব ভক্তিসাধনা ও আধ্যাত্মদৃষ্টির মূলে ঠাঁই পায়। একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, মুসলমান সাধনা ও বিরুদ্ধভাবের প্রতিঘাতে ভক্তি স্থান পায়। গুরু রামানন্দ দক্ষিণের দীক্ষা নিয়েই উত্তরে এলেন,  উভয়কে একত্রিত করলেন ; মুসলিম সমাজ এই জ্ঞান ভক্তির নবযুগের দ্বারা প্রভাবান্বিত হলো;   রং ধরলো মিলনের মধ্যযুগীয় ভারতে।  


ইতিহাসে মুসলমান আগমন মানেই কি রাজরাজাদের পরিপূর্ণতা!  না, একক নয় ; রাজা, লোক লস্কর, ছাড়াও আছে সাধু সাধকদের আগমন ;কেবল স্বার্থের রঙে রাঙা, লোভে লুব্ধ সংঘাত ইতিহাস নয়। মানুষ তো হৃদয়ের তাগিদে ভাবের তাগিদে বারে বারেই নতুন সত্য পেতে চেয়েছে;যেমন করে মহাবীর  সিংহ সেনাপতিকে বুঝিয়েছিলেন, "বুদ্ধ বশ আবর্তনী মায়া " জানেন!  কিন্তু সে কথা তো সিংহ মানেন নি। আয়োজনের সংসারে কৌষেয় বস্ত্রের এতো ক্ষমতা যে চিন্তন পরিবর্তন করতে পারে! না, নতুন শক্তি আসবেই ; তেমনই পটে  সাধকেরা এসেছেন, পাঞ্জাব ও সিন্ধুদেশে৷ কারণ ভারতে তো এই ভাবেই আসা সম্ভব৷ এখানে বিখ্যাত সাধক মখদুম সৈয়দ অলি হুজিরীরীর নাম করা যায়৷ তিনি গজনীর কাছে
জুল্লাব ও হুজরে পূর্বে বাস করতেন৷ লাহোরে আজও ভাটী দরওয়াজার কাছে সমাধিস্থলে হিন্দু মুসলিম একত্র শ্রদ্ধা দর্শন পরিলক্ষিত হয়৷ সেখানে মানুষের কাছে তিনিই সূফীবাদের আদিগুরু। তাঁর রচিত "গূঢ়ার্থপ্রকাশ " সূফীবাদের অমূল্য গ্রন্থ৷



পাঞ্জাবের নানা সূফী সাধকের সাধনার ক্ষেত্র থেকে তীর্থযাত্রী এসেছেন৷ কেউ এসেছেন, মীয়াঁ মীর সাহেবের স্থান থেকে,  কেউ এসেছেন শাহদর মালী থেকে, কেউ এসেছেন পাক দোনা সাহেবের স্থান হতে..  সবটুকুই মেলীকরণ। হুজরীর উপদেশ থেকে জানা যায় সাধনার্থীরা প্রথম বৎসর মানুষের সেবা করবে, দ্বিতীয় বৎসর ঈশ্বরের সেবা করতে হবে৷ তৃতীয় বৎসর নিজেকে বুঝতে হবে।  সূফীদের মধ্যে "ফনা " বড়ো মূল্যবান শব্দ৷ অহম লোপ " এখানে এক পূর্ণ একক।  আর এই "অহম " লোপে সকল স্বত্ব ও সম্বন্ধের অবসান হয়৷ প্রেমের ফনার পথের অবস্থাই হলো " হাল " বা বাউল বৈষ্ণবদের "দশা"৷
এরপরেই সূফী সম্প্রদায়ের প্রভাব ভারতে পৌঁছায়।  
সাধারণ ভাবে বলা হয়, সূফী সম্প্রদায়ের প্রভাব দশম শতকে খ্বাজা আবু আহমেদ আবদাল চিশতীর হাত ধরে এলেও, তাঁর মতকে ভারতে আনলেন খ্বাজা মুইন অলদীন চিশতী। করমানী, কুবরা, সুহরবাদী প্রমূখ গুরুর সাথে তাঁর সংযোগ হয়। তাঁর দরগা হিন্দু মুসলিম মেলবন্ধনে ভারতের সূর্য। উল্লেখ্য, তীর্থযাত্রীদের মধ্যে একদল হুসেন ব্রাহ্মণদের পরিচয় পাওয়া যায়।  এঁরা না হিন্দু,না মুসলিম৷ এঁরা হিন্দুদের ব্রতও পালন করতেন, আবার মুসলিম উপাচারও। এদের নারীরা হিন্দু নারীদের মতো বেশ ভূষা করতেন। সধবারা হিন্দু সধবার চিহ্ন ধারণ করেন। এ যেন ছোঁয়া শুদ্ধি আচার.. মনে করিয়ে দেয়,
" এতদিন তোমার সঙ্গ পাই নি বন্ধু,
তাই অন্তরে আমি নগ্ন,
চিত্ত আমার ধুলায় মলিন,
আজ আমি পরব শুচিবস্ত্র তোমার হাতে -
আমার লজ্জা যাবে দূর হয়ে। "

ক্রমশ...




 

 

 তথ্যসূত্র

মধ্যযুগে সাধনার ধারা- ক্ষিতিমোহন সেন
বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাস
ইন্টারনেট

 

 

  প্রিয়াঙ্কা সরকার পুর্ব বর্ধমানে বসবাস করেন।তিনি বাংলায় মাস্টার্স করেছেন ২০১০এ তার পর ২০১১ তে লাইব্রেরী সায়ন্সে এবং ২০১২তে এনভাইরনমেন্ট সায়ন্সে ২০১৩ তে কমিউনিকেটিভ ইংলিশে পিজি ডিপ্লোমা সম্পূর্ণ করেন এবং ২০১৪ তে তিনি বি.এড ডিগ্রি লাভ করেন।ইতিহাস নিয়ে তার ভালোলাগার অন্ত নেই।তার মনের মধ্যে ইতিহাস যেন সদা জাগ্রত।ইতিহাসের নেশায় তিনি সর্বদা বুঁদ হয়ে থাকেন।ইতিহাস নিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের নানান অনলাইন  ও অফলাইন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখে চলেছেন।এছাড়াও তিনি বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে ভালবাসেন,কবিতা লেখেন,আবৃতি করেন,গান করেন,সেই সাথে তার আরও একটি ভালোলাগার বিষয় পারলোক চর্চা।এই বিষয়ে তিনি সমানে গবেষণা করে চলেছেন।

Comments

  1. মধ্যযুগের অনেক কিছু জানলাম তোমার লেখা থেকে। অনবদ্য লেখনী। কলম চলতে থাকুক অবিরাম।।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস