রাষ্ট্রিক নয় ভারতের মধ্যযুগের সাধনা (তৃতীয় পর্ব)


 

 

 প্রিয়াঙ্কা সরকার 

কাশ্মীরে পীরজাদাদের শেকড় সৈয়দ ; জাতিগত ভাবে পীরজাদা পরিবারের প্রত্যেক ব্যক্তি হাশমি ব্লাডলাইন থেকে আসে, হাশমি উপজাতির অন্তর্ভুক্ত ; এরা মূলত সৌদি আরবে, সৈয়দের;  তবে তথ্য অনুসারে একজন "পীরজাদা " বলতে ঐতিহাসিকভাবে সূফী  মাজার
ও মুসলিম ভূখন্ডের মাজারের সরকারী রক্ষক হিসাবে বর্ণনা পাওয়া যায়৷ "পীরজাদা " ফরাসি ভাষায় "একজন সাধু বা সন্তের পুত্র "; এদের বংশধরেদের  বেশিরভাগ অংশ সনাক্ত করতে  গিয়ে উজবেকিস্থান, কিরগিজস্থান, তুর্কমেনিস্তান,  ও মধ্য এশীয় মালভূমিতে পাওয়া যায় ; মধ্য এশিয়ায় উৎপত্তি হওয়ার কারণে পীর পরিবারের সাথে যুক্ত। ধর্মের বহু বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। মূলতানের শামস - ই - তবরেজ - এর তীর্থস্থল আজও জাতিগত মিলনকেন্দ্র বলা যায়। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মহম্মদ শাহদুল্লা একটি সম্প্রদায় স্থাপন করেন ; তাঁর দরগায় হিন্দু মুসলিম ভক্তের কেন্দ্রস্থল। তাঁর মতবাদীদের নাম পীরজাদা। এদের মতে বিষ্ণুর দশম অবতার হলেন " নিষ্কলঙ্ক" ; এখানে গুজরাটের পীরানা পন্থীদের সাথে এদের কোনো প্রভেদ নেই। এখন বলবো," পীরানা পন্থী "বলতে কি বোঝায়। কি এদের পরিচয়! !  ৫৫০ বছর ধরে হযরত ইমামশা বাবার দরগাহ হলো মেলীকরণের স্থান৷

 আহমেদাবাদের ১৮ কিলোমিটার দূরে পিরানা গ্রাম; পিয়ার ইমামউদ্দিন নামে পরিচিত  হযরত ইমামশা বাভা সত্য পথ নামে এক সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সেরা অনুশীলনগুলি শেখানো হয়। "History of Gujarat " বলে, সুলতান মাহমুদ বেগদার রাজত্বের প্রথমদিকে ইমামশাহ আহমেদাবাদ থেকে নয় কিমি দূরে গিরমাথা গ্রামে বসতি গড়েন। তিনিই নাকি পিরানা এলাকার মানুষের কৃষিভূমিতে অনাহারী কৃষকদের জন্য বৃষ্টি এনেছিলেন। শোনা যায়, একদল যাত্রী একবার গিরমাথা দিয়ে কাশী যাচ্ছিলেন। কাশী নিয়ে  যাওয়ার জন্য তিনি নিজেই প্রস্তাব দেন। এরপর তীর্থযাত্রীরা রাজী হয়ে যায়, আর তাঁর সাধনক্ষেত্রে রাত্রিনিবাস গড়ে। অলৌকিক ভাবে সকালে তাঁরা নিজেদেরকে কাশীতে খুঁজে পান। তখন তীর্থযাত্রীরা গঙ্গায় স্নান করে নামাজ পড়তেন, আর রাতে  কাশিতে শুয়ে থাকতেন। বলা হয় যে, সম্রাট আওরঙ্গজেব ইমামশাহের সমাধি গড়তে বিশাল জমি কিনেছিলেন, আর মসজিদটি গড়তে এক হিন্দু অর্থ দান করেন ;


তথ্যসূত্র অনুসারে সপ্তদশ শতাব্দীতে তাজ নামে এক মুসলমান মহিলা কবি কৃষ্ণভক্তিবিষয়ক বেশ কিছু চমৎকার গান লেখেন। তিনি ভক্ত বৈষ্ণব ; শোনা যায় ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের এক গুরু বল্লভ সম্প্রদায়ের বৈষ্ণব গুরুর মতো করে হিন্দুদের দীক্ষা দেন৷ এখন এই সম্প্রদায়ের নাম খোজা ;  শিয়াদের প্রধান দুই শাখার একটি  বার ইমামে আর অপরটি সাত ইমামে বিশ্বাসী। সাত ইমামের সপ্তম ইমাম হলেন ইমাম জাফর আস সাদিকের বড়ো ছেলে ইসমাইল; তিনিই প্রথম ইমাম হিসাবে মনোনীত হন৷ কিন্তু তাঁর অকস্মাৎ মৃত্যুতে, পিতা  দ্বিতীয় পুত্র ইসমাইলের ছোটো ভাই মুসাকে ইমাম মনোনয়ন করেন ; বলা হয়ে থাকে সপ্তম ইমাম মুসাকে যারা মেনে নিয়েছিলেন, তাঁরাই নাকি ১২ তম  ইমাম মাহদিকে বেছে   নেন।  তাঁরাই দ্বাদশ ইমামে বিশ্বাসী " শিয়া। "উত্তর আফ্রিকার ফাতেমি খিলাফত, আলামুত দুর্গের গুপ্তঘাতক সম্প্রদায়, ভারতবর্ষের খাজা ও সর্বশেষ আগা খান সকলেই ইসমাইল সম্প্রদায় ভুক্ত।  হালাকু খান, আলামুত দুর্গ ধ্বংস করে নির্বিচারে হত্যা চালালে, তারা দক্ষিণে আরব ইয়েমেনে চলে যায়। আর ভারতে যারা আসেন, তাঁরা সুন্নিদের হাত থেকে রক্ষা পেতে,  প্রকাশ্যে হিন্দু ধর্মের আচারণ পালনে সচেষ্ট হয়। এইভাবে ভারতে ধর্মীয় দিকটি এক নতুন মাত্রা পায়।।

ভারতীয় ইতিহাসে  বিষ্ণুর পুজো প্রচলিত ছিলো।
হপকিনসের মতে, " vishnuism, in a word,  is the only cultivated native sectarian native religion of India "। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ও তাঁর পরবর্তীকালে বহু রাজাই ভাগবত বৈষ্ণব নামে পরিচিত ছিলেন৷ সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে শৈবধর্ম প্রভাবিত দক্ষিণ ভারতে বৈষ্ণব ধর্মের প্রসার ঘটে। তামিলনাড়ুতে বারোজন অলভর সন্ত ভক্তিমূলক স্তোত্ররচনার মধ্যমে বৈষ্ণব ধর্মকে ছড়িয়ে দেয়৷ এদের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরগুলি দিব্যদেশম " নামে পরিচিত। হপকিনস " The religion of India " গ্রন্থে লিখেছেন,  বিষ্ণুধর্ম বৈদিক ব্রাহ্মণ্যধর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিলো। কিন্তু কৃষ্ণধর্ম উদ্ভব হয় পরবর্তীকালে ; একসময় ব্রাহ্মণদের কাছে শিব অধিক গ্রহণযোগ্য হয় ; পরে অবশ্য হপকিনসের মত -ই বিশেষ গ্রহণযোগ্য ;  বর্তমানে সামগ্রিক ভারতে পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ,  রাজস্থান ও গুজরাটের মতো পশ্চিম ভারতীয় রাজ্যগুলিতে এদের সংখ্যা অধিক হয়।

ক্রমশ...

তথ্যঋণ 


ভারতীয় মধ্যযুগে সাধনার ধারা 
"ক্ষিতিমোহন সেন " 

ভারতের ইতিহাস অভিধান 

মধ্যযুগের ইতিহাসের ধারা

http://sonatonshastro.blogspot.com/2017/03/blog-post_26.html?m=1

https://www.dnaindia.com/india/report-ahmedabad-s-sufi-shrine-pirana-shows-unique-confluence-of-faith-1515423
  প্রিয়াঙ্কা সরকার পুর্ব বর্ধমানে বসবাস করেন।তিনি বাংলায় মাস্টার্স করেছেন ২০১০এ তার পর ২০১১ তে লাইব্রেরী সায়ন্সে এবং ২০১২তে এনভাইরনমেন্ট সায়ন্সে ২০১৩ তে কমিউনিকেটিভ ইংলিশে পিজি ডিপ্লোমা সম্পূর্ণ করেন এবং ২০১৪ তে তিনি বি.এড ডিগ্রি লাভ করেন।ইতিহাস নিয়ে তার ভালোলাগার অন্ত নেই।তার মনের মধ্যে ইতিহাস যেন সদা জাগ্রত।ইতিহাসের নেশায় তিনি সর্বদা বুঁদ হয়ে থাকেন।ইতিহাস নিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের নানান অনলাইন  ও অফলাইন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখে চলেছেন।এছাড়াও তিনি বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে ভালবাসেন,কবিতা লেখেন,আবৃতি করেন,গান করেন,সেই সাথে তার আরও একটি ভালোলাগার বিষয় পারলোক চর্চা।এই বিষয়ে তিনি সমানে গবেষণা করে চলেছেন।

Comments

  1. অনবদ্য আলোচনা। তোমার লেখা পড়ে অনেক কিছু জানলাম। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।।

    ReplyDelete
  2. অনবদ্য আলোচনা। তোমার লেখা পড়ে অনেক কিছু জানলাম। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস