নদীয়ার প্রত্নক্ষেত্রস্থল বল্লাল সেনের ঢিপির ইতিহাস
রিয়া দাস
বল্লাল ঢিপি নদিয়ার অন্যতম প্রত্নক্ষেত্র । তবে নবদ্বীপের নিকটবর্তী মায়াপুরের কাছে বামুনপুকুরে অবস্থিত, ভক্ত চাঁদকাজীর সমাধিস্থল থেকে উত্তর পশ্চিম দিকে কিছুটা গেলেই বল্লাল ঢিপির অবস্থান।
আচ্ছা আসলে কি এই বল্লাল ঢিপি ? সত্যিই কি সেন রাজাদের প্রাসাদের ধ্বংস স্তূপ ? না কি এ আদতে এক বৌদ্ধ স্তূপ ?
বামুনপুকুর স্থানটি একটি ঐতিহাসিক প্রাচীন নাম বিশেষ। কলকাতা থেকে ১২৫ কিলোমিটার দূুরে অবস্থিত , শিয়ালদহ থেকে কৃষ্ণনগর লোকালে উঠে কৃষ্ণনগর স্টেশনে নেমে মায়াপুরগামী বাসে উঠলে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছানো যায় বামুনপুকুরে। আবার ট্রেনে হাওড়া থেকে নবদ্বীপ পৌঁছে ঘাট পেরোলে মায়াপুর থেকে বামুনপুকুরে আসা যায়। তবে এখানকার উল্লেখযোগ্য প্রত্নতত্ত্ব ও পুরাকীর্তি হল চাঁদকাজীর সমাধি আর বল্লাল ঢিপি।
প্রথমত সেন বংশের পরিচয় সম্পর্কে আলোকপাত প্রয়োজন।
সেন বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা, তথা রাজা বল্লাল সেন প্রায় ১০৬০- ১০৮৩ সালে রামপাল নগরে জন্মগ্রহণ করেন । শৈব বরে তাঁর জন্ম হওয়ায় পিতা বিজয় সেন পুত্রের নাম রাখেন “ বরলাল “, পরবর্তীতে “ বল্লাল “শব্দটি তার ই অপভ্রংশ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি ১১৬৮ সালে 'দানসাগর ‘ রচনা করেন এবং ১১৬৯ সালে 'অদ্ভুতসাগর’ রচনা শুরু করলেও সমাপ্ত করতে পারেন নি।
শূরবংশের অবসানের পর বঙ্গদেশে সেনবংশের শাসন চলে আসে। সেন বংশের তথা দ্যক্ষিণাত্য বীর সেনবংশের রাজা ছিলেন “ সামন্ত সেন”। সামন্তসেন তিনি সেনবংশের স্থাপন করেন। সামন্তসেনের মৃত্যুর পর এনার পুত্র “ হেমন্তসেন ” নদীয়ার সিংহাসন লাভ করেন। তিনি মেদনীপুরে জেলার কাশিয়ারী নামক একটি নগর তৈরী করেন। হেমন্তসেনের রাজত্বকালে দক্ষিণ রাঢ়ে রাজস্ব ক্ষমতা বৃদ্ধিপায়। হেমন্তসেনের সঙ্গে কলিঙ্গ রাজের মিত্রতা স্থপন হয়। হেমন্তসেনের মৃত্যু হলে এনার পুত্র “ বিজয় সেন ” নদীয়ার সিংহাসনে বসেন। বিজয়সেনের রাজকালে নবদ্বীপ ছিল তাঁর রাজধানী। বিজয়সেনের সময় সেনবংশের রাজত্ব আরও বিস্তার লাভ করে। তিনি গৌড়, নগর, মিথিলা , এছাড়া নেপালের রাজা নান্যবীরকে পরাস্ত করে সমস্ত বাংলা, বিহার ও কলিঙ্গ(ওড়িশা) জয় করেন। এরেপর মহারাজা বিজয়সেনের প্রয়াণ ঘটার পর বাংলাার বিখ্যাত রাজা “বল্লালসেন” নবদ্বীপেে রাজসিংহাসনে বসেন।
বল্লাল সেন -- বল্লাল সেন ১০৯৭ খৃষ্টাব্দ পর রাজা হয়েছিলেন। প্রায় ১১৬০ থেকে ১১৭৯ সাল পর্যন্ত সেনবংশের রাজা ছিলেন। এইসময় তিনি বালক বয়স ছিলেন। বল্লালসেন পিতৃহীন ও বালক বুঝে বিক্রমপুরের অন্তগর্ত রামপালের রাজা কুমারপাল তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। রাজা বল্লাল সেনের সেনাপ্রধান ছিলেন “নরোত্তম দাস ” এনার সাহায্যে গৌড়নগর উদ্ধার করেছিলেন।
তিনি ছিলেন সেন রাজবংশশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেনের পুত্র এবং উত্তরসূরী। রাজা বল্লাল সেন বাংলার সামাজিক সংস্কার, বিশেষ করে "কৌলিন্য" প্রথা প্রবর্তনকারী হিসাবে অতিপরিচিত নাম একটি । তিনি একজন সুপন্ডিত ও লেখক ছিলেন।" দানসাগর " ও "অদ্ভুতসাগর " তার উল্লেখযোগ্য রচনা। বল্লাল সেন তাঁর রাজত্বের সময় বহুদূর পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। যেমন :- বরেন্দ্রভূমি, রাঢ়, বঙ্গ, এবং মিথিলা প্রভৃতি এইসব অঞ্চল গুলি তাঁর হাতে ছিল। বল্লালসেন প্রায় ৬০ -৬২ বছর রাজত্ব করে করে, তিনি উত্তরাধিকার হিসাবে লক্ষণসেনকে রেখে ১১৬৮ খৃঃ প্রয়াণ ঘটে।
লক্ষণসেন ঃ- এরপর সেনবংশের রাজা হন“ লক্ষণসেন”। ১১৬৮ খৃঃ গৌড়ের সিংহাসন বসেন। তিনি রাজা হয়ে বসলে গৌড়নগরে নাম রাখেন লক্ষণাবতী। তাঁর রাজত্বকালে কামরূ, ত্রিপুরা পঞ্চকোটী প্রভৃতি রাজ্য অধীনস্থ ছিলো । পরবর্তী কালে ১২০৩ খৃঃ গৌড় মুসলমান হাতে অধীনেচলে আসে। এরফলে সেন বংশ সম্পন্ন ধংস স্তপে পরিণত হয়।
সেনবংশের বংশপরিচয়---
সামন্তসেন > হেমন্তসেন>বিজয়সেন > বল্লালসেন> লক্ষণসেন> কেশবসেন।
তবে বলা যায় যে, বল্লাল সেনের রাজত্বকালে অসংখ্য ইতিবাচক কার্যাদির সমাগম পরিলক্ষিত হয়। তিনি একাধারে দেশবরেণ্য রাজা, সমাজ সংস্কারক, জ্ঞান বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক এবং ধর্ম পরায়ন ব্যক্তি। ‘ অদ্ভুতসাগর’ গ্ৰন্থে উল্লেখ আছে তিনি বেশ কয়েকবার মণিপুর আক্রমণ করে জয় লাভে ব্যর্থ হন। এ যুদ্ধের জন্য তিনি সে যুগের বাংলার শ্রেষ্ঠ ধনী বল্লভানন্দের কাছ থেকে ১ কোটি নিষ্কর ( মুদ্রা) কর্জ করেছিলেন।
'অদ্ভুতসাগর' গ্ৰন্থ থেকে জানা যায় যে, বল্লাল সেন বৃদ্ধ বয়সে পুত্র লক্ষন সেনের পক্ষে সিংহাসন ত্যাগ করেন। বল্লাল সেন তাঁর রাজত্বকালে সুষ্ঠু সুশাসন প্রতিষ্ঠা পূর্বক পিতৃ রাজ্য শুধু রক্ষাই করেন নি, বরঞ্চ মগধেও এর সম্প্রসারণ ঘটান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বল্লাল সেন জীবনের শেষ দিন গুলি রাম দেবীকে নিয়ে ত্রিবেণীর কাছে গঙ্গা তীরবর্তী স্থানে অতিবাহিত করেন।
মুন্সিগঞ্জ জেলার রামপাল ইউনিয়নে একটি দীঘি আছে, যা বল্লাল সেনের নির্দেশে খনন করা হয়। দীঘিটি খনন নিয়ে অনেক লোকগাথা রয়েছে। কথিত আছে, বল্লাল সেন মাতৃ ভক্ত ছিলেন। মাকে খুশি করতেই এটি খনন করেন। 'অদ্ভুতসাগর' গ্রন্থে “ গৌতেন্দ্র কুঞ্জরালান স্তম্ভবাহর্মহীপতিঃ “ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রচলিত জনশ্রুতি থেকে জানা যায় যে, বল্লাল সেন তার রাজ্যকে রাঢ়, বরেন্দ্র, বাগড়ী , বঙ্গ ও মিথিলা এই পাঁচ ভাগে ভাগ করেছিলেন।
শিলালিপির প্রশস্তিকার তাঁকে “ বিদ্বানমন্ডলীয় চক্রবর্তী “ বলে প্রশংসা করেছেন।
প্রায় হাজার বছরের প্রাচীন শহরের প্রাচীনতত্বের ভিত খুঁজতে গিয়ে পন্ডিতেরা যে স্মারক টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেন, তা হল বল্লাল ঢিপি। মুসলমান বিজয়ের ফলে এই সেন রাজাদের পতনের কারনেই গোটা বাংলাদেশ জুড়ে যেমন বিশেষ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন হল, ঠিক তেমনি বাংলা সাহিত্যে রচনার প্রবাহ এসে পড়লো বন্ধ্যা যুগের অন্ধকার গলিতে।।
এই ঢিপির নীচে বল্লাল সেনের আমলে নির্মিত প্রাসাদ ছিল বলে অনুমান করা হয়। এক কথায় বলতে গেলে, কোনও অতীতের পুনঃনির্মাণ করার বিজ্ঞান কেই প্রত্নতত্ত্ব বলে চিহ্নিত করা হয় অর্থাৎ মাটির নিচে থাকা পুরোনো বস্তুকে খুঁজে বের করে, যে সমীক্ষা বা পরীক্ষা করা হয় এবং তথ্য ও জানা যায়, একেই প্রত্নতত্ত্ব বলা যেতে পারে। আর প্রত্নতত্ত্ব আছে বলেই আমরা পুরোনো দিনের কথা জানতে পারে। যাঁরা প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন তাঁদের বলি আমরা প্রত্নবিদ। সমস্ত প্রত্নবস্তু গুলিকে সংরক্ষিত করে রাখা হয় কলকাতা জাদুঘরে, এটি ভারতের বৃহত্তর মিউজিয়াম (১৮১৪) সালে স্থাপিত হয় এবং আরেকটি কলকাতা বেহালায় (১৯৬২) সালে স্থাপিত হয়।
বাংলার অন্যতম শক্তিশালী রাজা বল্লাল সেনের রাজধানী ছিল নবদ্বীপ। সেযুগের নবদ্বীপ ছিল রাজকীয় বৈভব আর ঐশ্বর্যে ভরা এক নগরী। পরে যা তুর্কি উচ্চারণে হয়ে ওঠে নওদিয়াহ, যা থেকেই নাকি পরবর্তীকালে গোটা জেলার নাম নদিয়া। নদিয়ার অন্যতম প্রধান শহর নবদ্বীপের উত্তর পূর্ব কোণে গঙ্গার পূর্ব পারে মায়াপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম বল্লাল দীঘি। সেখানেই খোলা আকাশের নিচে অনাদরে অবহেলায় পরে আছে বল্লাল ঢিপি। যা ঠিক ভাবে উৎখনন হলে মধ্যযুগের ইতিহাসের গতিপথটাই হয়তো বদলে যেত।
বল্লাল ঢিপি প্রায় ৪০০ ফুট প্রশস্থ এবং উচ্চতায় ২৫ – ৩০ ফুট হবে। প্রায় কুড়ি বিঘা জমির উপর অবহেলিত ভাবে পড়ে রয়েছে। ১৮৭২ সালে একটি খননের ফলে উদ্ধার হয় একটি সিন্দুক সহ কাঠের বারকোশ,জীর্ন রেশম বস্ত্র এবং চারটি রূপোর মুদ্রা। বল্লাল ঢিপি চিরকালই রহস্যের চাদরে মোড়া এক আশ্চর্য স্থান। দীর্ঘদিন ধরে সেন রাজপ্রাসাদের ধ্বংস স্তূপ বলেই পরিচিত ছিল। যা কালে মাটির ঢিপি তে পরিনত হয়েছে। ঢিপি টি সবুজ ঘাসে ঘেরা। ইতিহাসবিদরা মনে করেন ধ্বংস স্তূপটি তৎকালীন সমাজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর বিজাপুরের একটি অংশ। বিজাপুর ছিল সেই সময়ের অত্যাধুনিক শহর ও সেন বংশের রাজধানী। বিজাপুর স্থাপন করেন বল্লাল সেনের পিতা রাজা বিজয় সেন।
সেন বংশের রাজারা যেমন ছিলেন বীর, তেমনি বহু শাস্ত্রজ্ঞ। বাংলাদেশের ছায়ায় বালিয়াটি গ্রামে তাঁর একটি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়েছে। নদিয়ার মন্দিরের ঐতিহ্য যে বহু প্রাচীন সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বাংলার সর্বকালের সর্ববৃহৎ এবং সর্বপ্রাচীন তম মন্দির বলে পুরাতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ দের একটা বড় অংশ যাকে চিহ্নিত করে সেটি ওই বল্লাল ঢিপি। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের অসমাপ্ত খনন কাজ থেকে তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তাতে মনে করা হয়, বাংলার প্রাচীন এই দেবালয়ের গঠন স্থাপত্যের শৈলী ত্রিরথ সর্বতোভদ্র বৌদ্ধ স্তূপের মতো। পরবর্তীকালে যা ‘ পঞ্চরথ পঞ্চরত্ন ‘ ব্রাহ্মণ্য দেবালয়ে পরিনত করা হয়েছিল।
ঐতিহাসিক সুধী রঞ্জন দাশের লেখায় বল্লাল ঢিপি কে বৌদ্ধবিহার বলেই নিশ্চিত ভাবে বলা হয়েছে। তাঁর মতে, উৎখনন থেকে প্রাপ্ত নিদর্শন সে কথাই বলে। নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শান্তি রঞ্জন দেব বলেন, “ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই বল্লাল ঢিপি উৎখনন সম্পূর্ণ হলে মধ্যযুগের ইতিহাসে গতিধারা বদলে যাবে। বহু দিন আগেই এই কাজ হওয়া দরকার ছিল। আশা করি, অসমাপ্ত সেই কাজ হেরিটেজের আওতায় এলে দ্রুত হবে “।
ডানদিকে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব একটি বিজ্ঞপ্তিতে নিন্মলিখিত কথা গুলি বর্ণিত রয়েছে –
“ সেন রাজবংশের রাজা বল্লাল সেনের নামাঙ্কিত এই বৃহদাকার ঢিপিতে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ ১৯৮২-৮৩ থেকে ১৯৮৮-৮৯ খ্রিঃ মধ্যে উৎখনন পরিচালনা করে। উৎখনন দ্বারা এখানে অনাবৃত হয়েছে বিস্তৃত প্রাঙ্গনের মধ্যে অবস্থিত বৃহদায়তন ইটের ইমারত যার চার দিকে ছিল উচ্চ প্রাকার উৎখননে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পঙ্খের মূর্তি, পোড়ামাটির মানুষ ও জীবজন্তুর মূর্তি, তামা ও লোহার তৈরি নানান তৈজসপত্র, পেরেক ও নানান প্রত্নসামগ্রী। অষ্টম ও নবম শতকের ধ্বংসপ্রাপ্ত পুরাতন স্থাপত্য কীর্তি র উপর পুনঃনির্মিত এর সৌধের উপরিভাগ আনুমানিক দ্বাদশ শতকের। বিভিন্ন সময়ে মেরামত পরিবর্তন ও সংযোজনের নিদর্শন বাহী এই স্থাপত্য দ্বাদশ শতকে একটি বিশাল দেবালয়ের রূপ পরিগ্রহন করে “।
তথ্যসূত্র-
ঘুরে আসুন বল্লাল ঢিপি- পিন্টু মন্ডল।, আনন্দবাজার পত্রিকা।, সেন সাম্রাজ্য ও বল্লাল ঢিপি- সুজন মোদক। আজকাল পত্রিকা ২০১৯ সালে।
ছবি - অভিষেক নস্কর।কৃতজ্ঞতা জানাই আমায় এই কাজে সাহায্য করার জন্য।।







Comments
Post a Comment