নবাবি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার তিন প্রতীক সন্ধানে

 

 

 

লেখক- সুব্রত বিশ্বাস 

                                                                           নবাবি আমলে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার তিন প্রতিক

 

 

 

বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার মুর্শিদাবাদ শহর ও নবাব তথা নবাবীয়ানার যোগসুত্র অত্যন্ত দৃঢ় এবং সমৃদ্ধ। তৎকালীন বাংলা সুবার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হলে, জনপদ হিসেবে মুর্শিদাবাদের ব্যাপক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটে। নবাবদের সেই সকল রাজকীয়তার লেশমাত্র আজ খুঁজে পাওয়া না গেলেও, ভেঙেপড়া ইট তথা প্রাসাদের ভগ্নস্তূপ থেকে আজও যেন শুনতে পাওয়া যায় হাহাকারের এক বিষন্ন ধ্বনি।

তৎকালীন নবাবী সৃষ্টি কৃষ্টিকে মূলত দুইটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমত, একশ্রেণীর স্থাপত্যকীর্তি যাদের মাধ্যমে সরাসরি বিভিন্ন সময় কালের নানাবিধ সাংস্কৃতিক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন- নিজামত প্রাসাদ বা বর্তমানের হাজারদুয়ারি প্রাসাদের মধ্যে ইংল্যান্ডের বাকিংহাম প্যালেস এর প্রভাব লক্ষণীয়। জানা যায়, নবাব হুমায়ুন জাঁ বাকিংহাম প্যালেস দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই নাকি এই প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন। আবার অন্যদিকে বেশ কিছু স্থাপত্যকীর্তি রয়েছে যা বহন করে চলেছে বিভিন্ন ধরনের প্রতীক চিহ্ন সমূহকে। এই সকল চিহ্ন অত্যন্ত অর্থবাহী এবং রাজকীয় মর্যাদা সম্পন্ন। তবে ভগ্নপ্রায় স্থাপত্য কীর্তির মধ্যে এইরকম প্রতীক চিহ্নকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর একটি বিষয়।

                                                                                     ত্রিপলিয়া দরওয়াজা মধ্যস্থ তিন প্রতীক

এই প্রেক্ষাপটে প্রধান আলোচ্য বিষয় নবাবী আমলের বাংলা সুবার অন্তর্গত তিনটি অংশ যথা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার জন্য ব্যবহৃত তিনটি মৌলিক প্রতীক চিহ্ন।  তদকালীন মুর্শিদাবাদ জনপদের বিভিন্ন স্থানে এর অস্তিত্ব লক্ষ্য করা গেলেও, এর সর্বাপেক্ষা সুস্পষ্ট অবস্থান দেখা যায় ত্রিপলিয়া দরওয়াজায়। রাস্তায় আড়াআড়িভাবে অবস্থান করা এই ফটকটিতে তিনটি বিশাল আকার খিলান দেখা যায়, যা  সততই সেই সময়ের বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার প্রতীকী খিলান ছিল। ত্রিপলিয়া দরওয়াজার সামনে অবস্থিত আরো তিনটি ফটক( বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা) এর অবস্থানের ভিত্তিতে বিচার করলে যে, এর পূর্ব দিকের খিলানটি হল বাংলা, পশ্চিমের খিলানটি হল উড়িষ্যা ও মধ্যবর্তী খিলানটি বিহারের প্রতীকস্বরূপ নির্মিত হয়েছিল।

তবে এক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা উল্লেখ্য বিষয় হল- ত্রিপলিয়ার অন্তর্গত তিনটি খিলানের শীর্ষ দেশে অবস্থিত চিহ্ন সমূহ। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, তিনটি প্রতীকী চিহ্ন একে অপরের থেকে মৌলিক এবং এরা স্বভাবতই ভিন্ন অর্থবাহী। ত্রিপলিয়ার খিলান ভিত্তিক যদি এই সমস্ত প্রত্যেক গুলিকে সাজানো হয় তো দেখা যাবে বাংলার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে গোলাপ ফুলের চিহ্ন, বিহারের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে শালুক ফুলের চিহ্ন এবং উড়িষ্যার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে পদ্ম ফুলের চিহ্ন। দেওয়াল গাত্রে থাকা কারিগর নির্মিত বিভিন্ন ফুলের প্রতিকি চিহ্ন গুলিতে সামান্য পরিপূর্ণতাগত ত্রুটি থাকলেও, সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে চিহ্ন গুলির বাস্তব রূপগুলিকে অতি সহজেই চেনা যায়। ত্রিপলিয়া দরওজার তিনটি খিলানের শীর্ষদেশে থাকা এই প্রতীকী চিহ্নগুলি সম্ভবত বাংলা-বিহার- উড়িষ্যার সামগ্রিক  প্রজাসাধারণের জন্যই এতটা স্পষ্টভাবে তৈরি করা হয়েছিল। অন্য দিক থেকে দেখলে নবাবি কেল্লার প্রাণকেন্দ্র অর্থাৎ চক মসজিদের সন্নিকটে এইটাই ছিল নবাবীয়ানা প্রদর্শনের প্রধান হাতিয়ার এবং এই  তিনটি ভিন্ন প্রতীক দ্বারা তৎকালীন বাংলা বিহার উড়িষ্যার প্রজাসাধারণের কাছে নিজামত কেল্লা তথা বাংলায় নবাবীরাজের শ্রেষ্ঠত্বকেই তুলে ধরা হয়েছিল।
                                                                                                  বাংলার প্রতীক 'গোলাপ'

এবারে জানা যাক বাংলা- বিহার- উড়িষ্যার জন্য যথাক্রমে গোলাপ- শালুক- পদ্ম ফুলকে প্রতীকী চিহ্নরূপে ব্যবহারের কারণ প্রসঙ্গে। প্রথমেই আসা যাক, বাংলার প্রতীকী চিহ্ন গোলাপকে নিয়ে। বাংলা- বিহার- উড়িষ্যার প্রায় মধ্যভাগে ভাগীরথী তীরবর্তী মুর্শিদাবাদে নবাবী নিজামত কেল্লা গড়ে উঠলে, বাংলার প্রতীক হিসেবে যে কোন একটি  জনপ্রিয় আর ফুলকেই দেখানো হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বাংলার ভৌগোলিক পরিবেশ যথা- বার্ষিক ১৫০ - ২০০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত ও ২০ - ৩০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড উষ্ণতায় গোলাপ চাষও যথেষ্ট বেশি মাত্রায় হত। পাশাপাশি ইতিহাস ঘাটলে জানা যায় যে, গোলাপ ফুলের নবাবী কদর তথা পৃষ্ঠপোষকতাও যথেষ্ট পরিমানে ছিল। আর সেই কারণেই নবাবী আমলে কেল্লা সন্নিকটস্থ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছিল গোলাপের বাগান বা 'গোলাপবাগ'। এছাড়াও গোলাপ বিশ্বস্ততার প্রতীক হওয়ায় বাংলা সুবার অন্তর্গত বাংলা অংশের জন্য 'গোলাপ'কে প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করার গুরুত্ব ছিল অসীম।
                                                                                             উড়িষ্যার প্রতীক 'পদ্ম'

এবারে আসা যাক উড়িষ্যা অংশের জন্য ব্যবহৃত প্রতীক সম্পর্কে। এক্ষেত্রে 'পদ্ম' ফুলকে প্রতীক হিসেবে গ্রহণ প্রসঙ্গে। পদ্ম ফুলের প্রতীকী অর্থ শুদ্ধতা এবং নবাবি সময়কালে এই অর্থটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হতো। এছাড়াও নবাব সুজাউদ্দিন পরবর্তীতে বাংলা নবাব হলেও তার জীবনের প্রথম ভাগ কাটে উড়িষ্যায় এবং সেখানকার অনুকূল ভৌগলিক পরিবেশে( তুষার মুক্ত পরিবেশ ও ২০ - ৩০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড উষ্ণতা) ফুলের আধিক্য, অধিক মাত্রায় নবাবকে অনুপ্রাণিত করেছিল এটিকে উড়িষ্যার প্রতীক হিসেবে বেছে নিতে। তথ্য অনুযায়ী, এখনো ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের প্রধান ফুল হিসেবে পদ্ম কেই বিবেচনা করা হয়।
                                                                                             বিহারের প্রতীক 'শালুক'
  
সবশেষে জেনে নেবার পালা বিহারের প্রতীক প্রসঙ্গে। এক্ষেত্রে শালুক ফুলকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করার প্রধান কারণ সম্ভবত বিহারে এই ফুলের প্রাচুর্যতা। অনুকূল ভৌগলিক পরিবেশ; যথা- ক্রান্তীয় জলবায়ু, তুষারমুক্ত আবহাওয়া ও ২০ - ৩০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় বিহারে উচ্চহারে শালুক ফুল জন্মালে, মূলত সেই কথা মাথায় রেখেই বিহারের জন্য এরকম প্রতীক বেছে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে শালুক বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় ফুলের মর্যাদা পেয়েছে। আর সেখান থেকেই নবাবী সময়ের এর গুরুত্ব অনুধাবন করা যেতেই পারে।

সামগ্রিক ভাবে বিচার করলে দেখা যায়, নবাবী আমলে এই প্রতীক গুলিকে একটি প্রধান স্থাপত্যের অন্তর্গত তিনটি পৃথক খিলানের ওপর এমন ভাবে দেখানো হতো, যেন বাংলা সুবার তিনটি অংশ বাংলা- বিহার- উড়িষ্যার প্রজাসাধারণের সামনে থাকা কোন নবাবী প্রতিপত্তি। নবাবী আমলে সম্ভাব্য যে সকল স্থানে এই প্রতীক গুলিকে ব্যবহার করা হয়েছিল, তার অধিকাংশই আজ ক্ষতিগ্রস্ত ও ভগ্নপ্রায়। তবে আজও খোশবাগের সমাধিস্থলে লক্ষ্য করলে দেখা যায় এরকম তিনটি প্রতীক যুক্ত খিলানের অবস্থান। যেন বাংলা সুবার সকল প্রজা দেখছে  নবাবি সমাধিকে। এছাড়াও এখনো, চক মসজিদ তথা কাটরা মসজিদে এরূপ প্রতীকী চিহ্নের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা গেলেও- আধুনিক কালের পুনঃনির্মাণের সময় এগুলি প্রকৃত আকৃতি থেকে বহুদূরে সরে এসেছে। ফলতঃ এদের বাস্তব বর্তমান অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত দুরহ।  
                                                                                   তিন প্রতীকের মধ্যে দিয়ে খোসবাগের সমাধিস্থল

Comments

  1. Nice sir ,ami sotti e khub upokrito hochhi ai notun bisoy gulo janar jonno .

    ReplyDelete
  2. Khub vhalo laglo Sir. Notun onek ki6u janlam.

    ReplyDelete
  3. ইতিহাসকে নতুন করে জানতে পারছি।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস