রাষ্ট্রিক নয় ভারতের মধ্যযুগের সাধনা (দ্বিতীয় পর্ব)
প্রিয়াঙ্কা সরকার
(দ্বিতীয় পর্ব)
মানুষের মননশীল সমাজের কাছে, সেই যুগে সকলের হৃদয় জয় করতে সূফীদের প্রয়োজন ছিলো। একথা তথ্য বলে, কিন্তু স্বাধীনতা যখন স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হয়, তখন কিন্তু আচরণশীলের প্রয়োজনীয়তা আবশ্যক ; শাস্ত্রবদ্ধ ধর্ম যখন সংকীর্ণ হয়ে আসে তখনই কিন্তু নিজামুদ্দীনের মতো সূফী সাধকের হৃদয়পরশ প্রেমধর্ম প্রচার করবেই। কিন্তু এ প্রেমধর্ম আকবরের সময় প্রতিষ্ঠা পায় ; আওরঙ্গজেব এর সময় নগ্ন সাধকের বাড়াবাড়ি প্রকট হয়। আবার সেই মুহুর্তে সংযত হন আওরঙ্গজেব; তাঁর হাতে নয়, তবে আদেশে হত্যা হয় শর্মাদ ; সিন্ধুদেশে সূফী সাধকেরা ছিলেন স্বাধীন। এখানে তথ্য বলে,আকবরের বন্ধু আবুল ফজল ও ফৈজীর পূর্বপুরুষ জোধপুর চলে যায়। তাই পিতা ছিলেন "মুবারক নাগোরী "। এই মুবারককে পুত্র ফৈজীকে আকবর, "কবীশ্বর "উপাধি দেন ; তিনি কেবল শিক্ষাদাতা নন, তৈহিদ ইলাহী দলের সভ্য। তথ্য বলে, "
The word used by Abul Fazl and Badayuni for the so-called new religion of Akbar was ‘tauhid-i-ilahi’ (Divine Monotheism). It was really an order of Sufistic type. Many times it’s written as Din-i-Ilahi. But original word is Tauhid and not Din. Din means Faith. Din was applied to it 80 years later. "
ফৈজীর কনিষ্ঠ ছিলেন আবুল ফজল। তিনি ১৫৫১ খ্রীস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। স্বধর্মের প্রতি আস্থা বা অনুরাগ কোনটাই তাঁর ছিলো না৷ তিনি নিজে আকবরনামা - য় লিখেছেন, দিনের বেলায় তাঁর বিজ্ঞান নিয়ে কোনরকমে কেটে গেলেও রাত তাঁর কাটতেই চায় না। একবার ছুটেছেন দীনদরিদ্র সাধুদের কাছে, কখনও ছুটেছেন তিব্বতের লামাদের কাছে, কখনও ছুটেছেন পর্তুগালের যাজকদের কাছে, আবার কখনও ছুটেছেন পারস্যদেশের অগ্নিপূজকদের কাছে৷ আর এই অনাস্থা, এই যুক্তিতর্ক এর খাতিরে তিনি উলেমাদের ক্রোধের কাছে এসে পড়েন। তাই তো আগরায় পালিয়ে
বাঁচেন তাঁরা। আকবরের সঙ্গ এবং নিবাস তাঁদের একমাত্র আশ্রয় হয়ে গড়ে ওঠে৷ কিন্তু বদায়ুনী বলেন আকবরের নষ্টের মূলে এই বন্ধুত্ব। তবুও ইতিহাসের পাতায় একেশ্বরবাদে তিনি যে একজন বড়ো পক্ষ। তবে একেশ্বর বাদের আরো একজন ছিলেন আজিজ কূকা। তিনি মক্কায় তীর্থ করতে গিয়ে গোঁড়ামি দেখে নিজধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন। একথাও আকবরনামা "তে পাওয়া যায়।
আকবরের মন্ত্রী আবদুল রহীম খানখাঁনা ছিলেন বিশিষ্ট প্রবীণ ও হিন্দীভাষার চমৎকার কবি। তিনি "রহীম সতসঈ " নামক হিন্দী কাব্যের জন্য বিখ্যাত। কেবল তাই নয়, তিনি ভক্ত তুলসীদাসের অনুরাগী ছিলেন। এমনকি সূরদাসের কৃষ্ণভক্তিপর কাব্যগুলি তাঁরই কৃপাতে রক্ষা পায়। ইতিহাস বলে, জাহাঙ্গীর ও পৌত্র শাহজাহান ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। একবার নাকি শাহজাহান মুসলিম সাধকের হাতে লাঞ্ছিত হন৷ তবে পুত্র দারা কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে গভীর
চিন্তা করতেন। শোনা যায়, তিনি ভেদাভেদ শূন্য ছিলেন। যোগবলে দারা সব দেখতে পেতেন। তাঁর সভায় হিন্দী কবির দল, কবি জগন্নাথ মিশ্র, কবীরপন্থী দাদূপন্থী প্রমূখ অলংকৃত করতেন। হিন্দু আধ্যাত্ম ও সূফীবাদের সমন্বয়ে "মজমা অল বহরইন" গ্রন্থ রচনা করেন৷ উপনিষদ ও আত্ম পরমাত্ম বিষয়ক বেশ কিছু গ্রন্থ তিনি অনুবাদ করেন। আওরংজেবের পুত্র আজম শাহ বৈষ্ণব কবি বিহারীর সপ্তশত পদাবলী সংগ্রহ করেন। শোনা যায়, "রসবিলাস ", "প্রেম - চন্দ্রিকা " প্রভৃতি প্রণেতারাও আজমের কাছে আশ্রয় নিতেন। সিন্ধের সূফীরা ছিলেন উদার। ইতিহাস বলে, এয়োদশ -এ গজনীতে চারজন সাধক বন্ধু ছিলেন। শাহ কলংদর, ফরীদগঞ্জ, জামালউদ্দিন ও শাহ শকর ; তাঁরা প্রচলিত সাধনপথে সংকীর্ণতায় ব্যথিত হয়ে সমুদ্র পার হয়ে দূর দেশে যাত্রা করেন৷ পরিশেষে তাঁরা সিন্ধুদেশে সেহওয়ানে এসে উপস্থিত হন৷ উল্লেখ্য, ১৬০০ খ্রীষ্টাব্দে সুফী সাধক শাহ করীম, আহমেদাবাদের এক বৈষ্ণব সাধুর সাথে ধর্মজীবনে প্রবেশ করেন৷ শাহ করীমের জীবনী পারস্য ও সিন্ধী ভাষা মিলিয়ে লেখা।
তারপরেই শাহ ইনায়তের নাম করাই যায়। তিনি বলতেন ঈশ্বর কোনো সম্প্রদায়বিশেষের সম্পত্তি নয়৷ তিনি সিন্ধের কলহোরা রাজগণের সময়ে বহু হিন্দুপরিবারকে রক্ষা করেন ও আশ্রয় দেন৷ পরে সিন্ধের রাজারা তাঁর মাথা ছেদন করে এবং দিল্লীশ্বরকে উপহার পাঠান। তিনি আজও মুন্ডহীন নামে সকলের শ্রদ্ধার৷ উল্লেখ্য আজও শাহ লতীফের কন্ঠে সমগ্র নর নারীদের গান শোনা যায়। তাঁর গানে মানুষ আজও মগ্ন হয়ে ওঠেন। আশ্চর্য এই যে, সেখানেই কবীর, দাদু র গান হয়, যা, আজও লিপিবদ্ধ হয়ে আছে৷ সিন্ধেতে হিন্দু গুরু মুসলিম ও মুসলিম গুরু হিন্দু দেখা যায়৷ প্রেমের ধর্মে উচ্চভাব দেখা যায়। তাই তো আচার, আয়োজন মিলে মিশে একাকার এ সমাজ। পাঞ্জাবের শাহপুর জেলার গুরোট হিন্দু দয়াল ও জমালী সুলতানের সামগ্রিক পবিত্র স্থান৷ কাশ্মীরে প্রায় প্রত্যেক জিয়ারত পুরাতন হিন্দুতীর্থ।
ক্রমশ...
তথ্যঋণ
ভারতীয় মধ্যযুগে সাধনার ধারা
"ক্ষিতিমোহন সেন "
ভারতের ইতিহাস অভিধান
মধ্যযুগের ইতিহাসের ধারা


দারুন হচ্ছে। তোমার লেখাতে উৎসাহিত হয়ে আমিও একটি লেখা শুরু করলাম।
ReplyDeleteপ্রাপ্তি আমার দাদাভাই
Deleteঅনবদ্য আলোচনা। তোমার কলম যেন কথা বলে মধ্যেযুগের ইতিহাসের কথা। এমন ভাবেই তোমার লেখা চালিয়ে যাও। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।।
ReplyDeleteশ্রদ্ধা সুজন
DeleteThis comment has been removed by the author.
ReplyDelete