বিস্মৃত স্বাধীনতা সংগ্রামী যতীন দাস
রিয়া দাস (রাই)
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আর এক যতীন- যতীন্দ্রনাথ দাসের জীবনও আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। দক্ষিণ কলকাতার শিকদার বাগান এ ১৯০৪ সালে ২৭ শে অক্টোবর বিপ্লবী যতীন দাস জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পিতার নাম বঙ্কিম বিহারী দাস। আর মাতা ছিলেন সুহাসিনী দেবী। ১৯২০ সালে ভবানীপুর মিত্র ইন্সটিউশন থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর কংগ্রেসের সদস্য হয়ে তিনি অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দান করেন।
বাঘা যতীনের চেয়ে পঁচিশ বছরের ছোট ছিলেন তিনি। কিন্তু আবার দুই যতীনের উদ্দেশ্যে ছিল এক,তা হল - ভারতের স্বাধীনতা।১৯২১ সালে তিনি প্রথম গেপ্তার হয়েছিলেন। সেই সময়ের কথা উল্লেখ করে সুভাষচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘ আমার মনে আছে, ১৯২১ সালে পূজার ঠিক আগে আমরা যখন রসা রোডে কাপড়ের দোকানের সামনে পিকেটিং করি, তখন তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। অনেকের মতো তাঁকেও জেলে পাঠানো হয়, কিন্তু মুক্তিলাভের পর তিনি নিজেকে সক্রিয়ভাবে দেশের কাজে নিয়োজিত রাখেন, অনেকেই যা করেন নি। ‘
যতীন দাস ( বাবা আবার খেঁদু বলেই ডাকতেন). ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গৌরবজ্জ্বল অধ্যায়। ‘ কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে ‘ তিনি পরাধীনতার অন্ধকারকে ঘোঁচাতে চেয়েছিলেন, তার খবর আমরা ক’ জন রাখি বলুন তো ?রাখি কি , রাখি না। আজ তিনি নেই, কিন্তু রয়েছে তাঁর আদর্শ।
যতীন্দ্রনাথ দাস ছিলেন একজন ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং বিপ্লবী ভগৎ সিং এর সহকর্মী। ১৯২৩ সালে বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ সান্যাল কলকাতার ভবানীপুরে ঘাঁটি করলে তিনি তাদের সাথে এই দলে যোগ দেন।পরে অবশ্য দক্ষিণেশ্বরের বিপ্লবী দলের সঙ্গেও তার যোগাযোগ হয়। ১৯২৪ সালে তিনি নিজেই ‘ তরুণ সমিতি ‘ নামে বিপ্লবী দল প্রতিষ্ঠা করেন।
সালটা ছিল ৩০ শে অক্টোবর ১৯২৮। সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনে পুলিশের লাঠি চালনায় লালা লাজপত রায় শহীদ হন। এর প্রতিবাদে ভগৎ সিং, শুকদেব এবং রাজগুরু সহ অন্যান্য রা পুলিশ প্রধান স্কটকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। লাহোরের দপ্তরের সামনে তারা স্কট এর বদলে জে. পি সন্ডার্স কে হত্যা করেন। ইতিহাস তা লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা নামে খ্যাত।
লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার সময় অন্যতম বন্দি অজয় ঘোষ লিখেছেন, ‘ হাসপাতালে এসে দেখলাম যতীন দাস একটা ছোট্ট খাটিয়ায় শুয়ে আছে। তখনও তাঁর জ্ঞান হয় নি। ডাক্তার রা আশঙ্কা করছেন, হয়তো রাত কাটবে না। ‘
মৃত্যুর আগে অতি কষ্টে ক্ষীণ কন্ঠে তিনি তার শেষ ইচ্ছা ব্যক্ত করে গিয়েছিলেন।
“ নৈষ্ঠিক শাস্ত্র বিশ্বাসী বাঙালি ফ্যাসনে আমাকে কালীবাড়ি নিয়ে যাওয়া বা অন্যান্য সৎকর্ম করিও না। আমি একজন ভারতীয়। আমি কেবল বাঙালির নই। “
যতীন দাস ছিলেন দলের বৈজ্ঞানিক নেতা। তিনি কখনো ‘ রহমৎ ‘ নাম নিয়ে অস্ত্র সংগ্রহ করতেন, কখনো বা ‘ রবীন ‘ নাম নিয়ে দলের নেতৃত্ব দিতেন আবার কখনো বা ডাকাতি করে অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহ করতে হতো।
শচীন্দ্রনাথ সান্যালের স্ত্রী প্রতিভা সান্যাল লিখেছেন, “… .. … .. . রবীন দুঃসাহসী ছিল। তাকে দেখে মনে হত বিপদের পথে পা বাড়াতে সে সর্বদাই প্রস্তুত। “
বাংলাদেশে Hindustan Republican Association বা H. R. A এর সংগঠন কার্যের সকল দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল ঋজু ব্যক্তি সম্পন্ন তরুণ বিপ্লবী বীর যতীন দাসের উপর। সুভাষচন্দ্র বোস তাঁকে ‘ ভারতের যুবক দধিচী’ নামে অভিহিত করত।
কলকাতার তৎকালীন মহানাগরিক যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত বলেছিলেন, ‘ অন্য কোনও দেশ হলে তিনি দেবতার সম্মান পেতেন। ভারতবাসীর কাছে তিনি এখন পূজ্য।‘
বিপ্লবী নায়ক শ্রী ভূপেন রক্ষিত রায় তাঁর গ্ৰন্থ ‘ সবার অলক্ষ্যে’ তে লিখেছেন, “বাংলা তথা ভারতের বিপ্লব যুগের প্রধান অবদান হল ‘ মার্টারডম বা আত্মদানের শিক্ষা। ‘ভাবনাহীন চিত্তে ‘ জীবন ও মৃত্যু কে পায়ের ভৃত্য রূপে গ্ৰহণ করবার তত্ত্ব পরিস্ফুট হয়েছে অজস্ত্র বিপ্লবী। শহিদের আত্মোৎসর্গে শত সহস্র বিপ্লবী কর্মীর দুর্জয় কর্ম কান্ডে, বিপ্লবী র সাহস, মৃত্যু ভয় হীনতা, কর্ম নিষ্ঠা, নিয়মানুবর্তিতা ও বৃহৎ এর পানে সমুন্নত দৃষ্টি ই জাতির বেঁচে থাকার সঞ্চয়। বিপ্লবের ইতিহাসে মিউজিয়ামে যত্ন করে তুলে রাখার বস্তু নয়, ইহা জীবন পথে নিত্য কাজে লাগাবার সম্পদ। “
কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেল থেকে তাঁর পিতাকে একটি পত্রে তিনি লিখেছিলেন,
“ পাঞ্জাবের জেল হইতে অদ্য আমাকে এখানে লইয়া আসিয়াছে।… .. . আমাকে বোধ হয় শীঘ্রই হয় খালাস করিয়া দিবে, না হয় কোনও গ্রামে নজর বন্দী করিয়া রাখিবে। আমি যত শীঘ্র বাড়ী যাইতে চেষ্টা করিব।… . কিরণ যদি আসিয়া থাকে ত’ অবিলম্বে আমার সহিত যেন সাক্ষাৎ করে।
ইতি- খেঁদু “।
কিরণ হল যতীন দাসের ছোট ভাই। কিন্তু তাঁকে ছাড়া হয় নি। বাড়ি যাওয়ার স্বপ্ন তাঁর অধরাই থেকে যায়। প্রেসিডেন্সি থেকে আবার লাহোর জেলে নিয়ে যাওয়া হয়।
তাঁর মৃত্যুতে যতীন দাসের বৃদ্ধ পিতা বঙ্কিম বিহারী দাস অতুলনীয় গাম্ভীর্যে মন্ত্রোচ্চারণ করে যেটা বলেছিলেন, “ ওঁ নারায়ণ, যে দেশদ্রোহীরা মাতৃভূমিকে বিদেশীর হাতে সমর্পণ করেছিল, তাদের সকলের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ আমার আদরের খেঁদুকে অশ্রু/ অর্ঘ সহ তোমার চরণে সমর্পণ করলাম। “
এছাড়া অনশন চলাকালীন শান্তিনিকেতনে তপতী নাটকের মহড়া চলছিল, এই ঘটনায় মর্মাহত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাটকের মহড়া বন্ধ রাখেন এবং সেই রাতেই রচনা করেন ‘সর্ব খর্ব তারে দহে তব ক্রোধ দাহ ‘ গানটি যেটি পরে ‘ তপতী ‘ নাটকে অন্তর্ভুক্ত হয়।
ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে অনশন করে যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের কয়েকজন হচ্ছেন যতীন্দ্রনাথ দাস, মহাবীর সিং, মোহিত মোহন মৈত্র, মোহনকিশোর নমোদাস, মহেন্দ্র লাল বিশ্বাস, হরেন্দ্র মুন্সী, অনিল কুমার দাস, মনীন্দ্র নাথ বন্দোপাধ্যায়, পন্ডিতরাম রক্ষা সহ আরো অনেক।
শহীদ যতীন দাসের শব দেহে বহু করে যে বিরাট শোভাযাত্রা কেওড়াতলা শ্মশানের দিকে অগ্ৰসর হয়েছিল, একমাত্র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের শবদেহ বহনের সময়েই এরূপ জনসমাগম ঘটেছিল। নতজানু হয়ে সুভাষচন্দ্র বসু শহীদ যতীন দাসের পদধূলি নিয়ে নিজের কপালে লেপন করলেন। শোভাযাত্রার সামনে মহিলা ও বালিকাদের দল গাইতে গাইতে চলেছিল, ‘রক্তে আমরার লেগেছে যে আজ সর্বনাশের নেশা… .. … .। ‘
‘ প্রবাসী ‘ – তে লেখা হয়েছিল, “ তেষট্টি দিন ধরিয়া তিনি মৃত্যুকে ধীর পদক্ষেপ ক্রমশ নিকটবর্তী হইতে দেখিয়াছি। কিন্তু ভীত, বিচলিত হন নাই। ধন্য তাঁহার দৃঢ়তা। “কাজী নজরুলের ‘ প্রলয় শিখা ‘ কাব্য গ্ৰন্থ টি ব্রিটিশ সরকার যতীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর নিষিদ্ধ করেছিল।
যতীনের মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,
“ দুঃখের মন্থন বেগে উঠিবে অমৃত,
শঙ্কা হতে রক্ষা পাবে যারা মৃত্যু ভীত। “
মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে ‘ ভারতবর্ষ ‘ পত্রিকায় লেখা হয়, “ অনশনে জল মাত্র পান না করিয়া তেষট্টি দিন ধরিয়া মৃত্যুর আবাহন! তিনি অমৃতস্য পুত্রা : । “
১৯৭৯ সালে ভারতীয় পোস্ট যতীন্দ্রনাথ দাসের নামে ৩০ লক্ষ কমিমোরেটিভ ডাক টিকিটের প্রকাশ করে।
হিস্ট্রি টিভি ১৮ তে “ ফর এভার হিরোজ “ নামের অনুষ্ঠানে যতীন দাসের সম্বন্ধে দেখানো হয়ছিল।
২০০২ সালে লাহোরের শহীদ বীরদের নিয়ে তৈরি হওয়া হিন্দি চলচ্চিত্র, নাম “ দি লেজেন্ড অফ ভগত সিং “ যতীন দাসের ভূমিকা কে দেখানো হয়েছে।
ভারতীয় মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ “ যতীন দাস পার্ক “ নামের একটি মেট্রো রেল স্টেশন করেছে।
তথ্যসূত্র :
১/ ‘ শহীন যতীন দাস ও ভারতের বিপ্লব আন্দোলন ‘ – সন্তোষকুমার অধিকারী।
২/ বিপ্লবী যতীন দাস, শেখ রফিক ও মিফতাহুর রহমান চৌধুরী, বিপ্লবী দের কথা।
৩/ আনন্দবাজার পত্রিকা ১৫ আগস্ট ২০১৮ সাল।
৪/ আজকাল পত্রিকা, ২ রা সেপ্টেম্বর ২০১৫


Comments
Post a Comment