মুর্শিদাবাদের নবাবী আমলের নদী বাঁধ ও মতিঝিলে মুক্তা চাষের ভূ-বৈজ্ঞানিক ইতিহাস
সুব্রত বিশ্বাস
লেখক ছবি তুলতে ব্যস্ত
মুর্শিদাবাদের নবাবি আমলের ইতিহাস এবং ভাগীরথী নদী- একে অপরের পরিপূরক দুটি অধ্যায়। বলা ভালো, এই দুইটি উক্ত অধ্যায়কে একে অপরের সাহায্য ব্যতীত বিশ্লেষণ করা অসম্ভব। তদানীন্তন বাংলার নদীটির অন্য একটি পরিচয় ছিল ' কাশিমবাজার নদী'। অর্থাৎ সেই দিক থেকে বিচার করলে এটি স্পষ্ট যে- নবাবী আমলে ' কাটি গঙ্গা' নামটির কোন অস্তিত্ব ছিল না। ' কেন ছিল না' - এই প্রসঙ্গে একটু পরে আসা যাক। প্রাথমিকভাবে যদি মুর্শিদকুলি খাঁনের আমলের বাংলা সুবার প্রেক্ষাপট লক্ষ্য করা যায়, তো দেখা যাবে তৎকালীন বাংলার সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থানান্তর। আর এই স্থানান্তরিত রাজধানীর স্থান নির্বাচন হিসেবে সবার প্রথমে উঠে আসে নদীর অবস্থান- যা সেই আমলের সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
নবাবী আমলের নদী বাঁধের উপরে বর্তমানের মেঠো রাস্তাতবে মনে রাখার মতো বিষয়, ভূ-প্রকৃতিগত দিক থেকে মুর্শিদাবাদের অবস্থান ছিল গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে। যেখানে খুব স্বাভাবিক ভাবেই ভূমির ঢাল ছিল অত্যন্ত কম। তাই নদীর জলের গতি কম থাকায়, এখানে নদীটি ছিল ক্ষয়কার্য বর্জিত। সুতরাং সঞ্চয় কার্য হবার দরুন, এই অঞ্চলের নদী পথের নাব্যতা যে কম ছিল তা সহজেই অনুমেয়। অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্তর্গত, বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বাংলা সুবার আবহাওয়াগত প্রধান প্রভাবক ছিল ' মৌসুমী জলবায়ু'। এই জলবায়ুর প্রকট বৈশিষ্ট্য হলো- উষ্ণ আর্দ্র গ্রীষ্মকাল ও শুষ্ক শীতকাল। অর্থাৎ গ্রীষ্মকালের শেষে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত এখানকার অত্যন্ত সাধারণ ও নিয়মিত বিষয় ছিল। আর এটি ছিল নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদে প্রতিবছর বন্যার প্রধান কারণ। সেই দিক থেকে বিচার করলে তৎকালীন ভাগীরথী নদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত মাটির বাঁধ টির প্রধান কার্যকারিতা ছিল অঞ্চলটিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ। অন্তত মুর্শিদাবাদের নবাবী শাসনকালের প্রথম এক শতক বা তার কিছু বেশি সময় ধরে এটি ছিল বাঁধের মুখ্য উপযোগিতা।
সাঙ্গ -ই-দালানের বিপরতি দিক থেকে তোলা মতিঝিলের অংশ বিশেষ
ততদিনে বাংলার নবাবী মসনদে এসেছে একের পর এক পরিবর্তন। একদিকে পলাশী প্রান্তরে পরাজিত হয়েছেন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ও অন্যদিকে বঙ্গ সুবার রঙ্গমঞ্চে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির। এহেন পরিস্থিতিতে বাবি অর্থব্যবস্থা যে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই পরিস্থিতিতে মতিঝিলের মুক্তা চাষের উপযোগিতাও অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়। প্রসঙ্গত, জানিয়ে রাখা ভাল, মতিঝিলটি হল ভাগীরথী নদীর ছেড়ে যাওয়া একটি পথ। ঘোড়ার ক্ষুরের ন্যায় আকৃতি হবার জন্য এটিকে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলা হয়। একদা ঘষেটি বেগমের প্রাসাদ হিসেবে সুপরিচিত সাঙ্গ সঙ্গ-ই-দালান এর তীরবর্তী এই জলাশয়েই হত মুক্তা চাষ। লক্ষ্য ছিল নবাবী চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত মুক্তা রপ্তানি করে নবাবী কোষাগারের শ্রীবৃদ্ধি ঘটানো।
এবারে জেনে নেবার পালা, মুক্তা চাষের অনুকূল ভৌগলিক পরিবেশ সম্পর্কে। পর্যাপ্ত ঈষৎ লবণযুক্ত স্বাদু জল এবং ৫ মিটার এর থেকে অধিক গভীরতা- মুক্তা চাষের জন্য আদর্শ। পূর্ব আলোচিত তথ্য অনুযায়ী, এটি প্রকৃতিগত তথা উৎপত্তিগত দিক থেকে স্বাদু জলের ধারক হওয়ায়, প্রয়োজনীয় লবণ যে কৃত্তিমভাবে মেশানো হত- সেটি স্বাভাবিক। পাশাপাশি সঙ্গ-ই-দালানের নিরাপত্তার জন্য যখন খনন করে ঝিলটির গভীরতা বৃদ্ধি করা হয়েছিল, সেটিকেই আবার ব্যবহার করা হয়েছিল মুক্তা চাষের অন্যতম অনুকূল শর্ত হিসেবে।
প্রাথমিকভাবে মুক্তা চাষ, স্থানটিতে সাফল্য লাভ করলেও, একটি বিষয় বারংবার এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। আর সেটি হল শুষ্ক ঋতুতে জলস্তরের গভীরতা হ্রাস। যদিও এই অন্তরায়কে সঙ্গী আরও বেশ কিছু বছর ধরে মতিঝিলে চলে মুক্তা চাষ। তবে উল্লেখ্য যে, মতিঝিলে মুক্তা চাষে সাফল্য ও ব্যর্থতা উভয়কেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে চলেছিল। কারণ এটিকেও তারা নিজেদের আর্থিক মুনাফার অন্যতম হিসেবেই দেখে ছিল।
স্লুইস গেট-১ঃ মতিঝিলের জল সরবরাহের গেট
ইতিমধ্যে ডাচ হাইড্রোলিক ইঞ্জিনিয়ার জন ব্ল্যাঙ্কেন ১৮০৮ সালে স্লুইস গেট আবিষ্কার করে ফেলেছেন। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখা ভাল, এই গেটের প্রধান কাজ হল অতিরিক্ত জল কে একপাশে আবদ্ধ রেখে, প্রয়োজন মতো জলকে খালপথের মাধ্যমে উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা। সেই প্রযুক্তিকে আর কিছু বছরের মধ্যেই কাজে লাগানো হয় বর্তমানের কাটি গঙ্গার পাশে অবস্থিত মাটির বাঁধটিতে। পর্যায়ক্রমে দুটি গেট স্থাপন করা হয় সেখানে। প্রথম গেটটি তৈরি করা হয়েছিল মতিঝিলের সন্নিকটে বাঁধের গায়ে। এটির কাজ ছিল, বর্ষাকালের ভাগীরথীর অতিরিক্ত জলকে খালপথের মাধ্যমে মতিঝিলে প্রেরণ করা। এক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যায় অন্য গেটের অবস্থানমূলক কার্যকারিতা নিয়ে। মূলত বাঁধের ভেতরের অন্যান্য অংশ তথা মতিঝিলের অতিরিক্ত জল নিষ্কাশন এর পথ হিসেবে এই গেটটিকে ব্যবহার করা হতো। আলোচ্য এই অংশটি থেকে খুব সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, কি উঁচুমানের জল বিদ্যার প্রয়োগ এই মতিঝিলে মুক্ত চাষের ক্ষেত্রে করা হয়েছিল। যার মাধ্যমে বিলটিতে উপযুক্ত জলের চাহিদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, অতিরিক্ত জল যাতে এই মুক্তা চাষে কোন ব্যাঘাত না ঘটাতে পারে, সেটিকেও দেখা হয়েছিল। প্রসঙ্গত, গেট ১ এর মাধ্যমে জল প্রবাহিত হবার পথটিকে বর্তমানে প্রায় বোঝাই যায়না। এর বেশিরভাগ অংশ কৃষিক্ষেত্রে পরিণত হলেও গেট সংলগ্ন কিছু জলমগ্ন এলাকায় এখনো পাট জাঁক দেওয়া হয়। অন্যদিকে গেট ২ এর সংলগ্ন জল নিষ্কাশন খালটি এখনো অবস্থান করছে। বর্তমানে কে তরল বর্জ্য নিষ্কাশনের কাজে ব্যবহৃত হয়। এর অপর মুখটি বর্তমানে নতুনগ্রাম যাবার রাস্তা ( আয়েসবাগ সংলগ্ন) পার করে অপর একটি ভাগীরথীর পূর্বতন খাতের সঙ্গে যুক্ত এবং নবাবি আমলেও এটি ছিল প্রকৃত প্রবাহ খাত। মনুষ্য সৃষ্ট এই খাতটি ছিল সংকীর্ণ।
স্লুইস গেট-২ঃ মতিঝিলের অতিরিক্ত জল বহির্গমনের গেট
এবারে আসা যাক, অন্য একটি প্রশ্নের সমাধানে। বর্তমানে প্রায় ভগ্নস্তূপে পরিণত হওয়া লকগেট দুটির প্রথমটি যে মতিঝিলে জল প্রেরণের এবং দ্বিতীয়টি যে জল নিষ্কাশনের, আর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কি? তোর হল গেট দুটির মধ্যে ভূমির ঢাল। ক্ষেত্র সমীক্ষায় প্রাপ্ত জি. পি. এস তথ্য অনুযায়ী ভূমির ঢাল হলো পূর্ব থেকে পশ্চিম মুখী অর্থাৎ দ্বিতীয় গেট থেকে প্রথম গেটের দিকে। সুতরাং জলের সমোচ্চশীলতা ধর্ম অনুযায়ী, দ্বিতীয় গেটের নিকট ভূমি ভাগের উচ্চতা থেকে জলতল এর উচ্চতার পার্থক্য প্রথম গেট এর তুলনায় বেশি। যা কোন স্থানের জলের বহিঃ নির্গমন খাল খননের পক্ষে সহায়ক। সেই কারণে দ্বিতীয় গেটটি ছিল জল নির্গমনের পথ। এছাড়াও প্রথম গেট সংলগ্ন দেওয়ালে সূচক স্কেল এর অবস্থান তৎকালীন নদীর দিকে এবং দ্বিতীয় গেটে সূচক স্কেল এর অবস্থান নদীর বিপরীত দিকে। ঐতিহ্যগত ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে, যেদিকে জল সঞ্চিত থাকে, স্কেলও সেদিকে থাকে। অর্থাৎ যেদিকে জল ছাড়া হয় সেদিকে কোন স্কেল থাকেনা। ক্ষেত্রসমীক্ষা কালে প্রাপ্ত এই তথ্যটিও গেট দুটির কার্যকারিতা নির্ধারণে অত্যন্ত সহায়তা দান করেছে। প্রাথমিক তথ্য সূত্র অনুযায়ী দ্বিতীয় গেট সংলগ্ন নদী বাঁকেই ছিল তৎকালীন নবাবী বন্দর। বাণিজ্যতরী সমূহ অবস্থান করতো সেখানে। জনশ্রুতি অনুযায়ী নদীতীরে বাঁধের উপরে থাকা একটি বটগাছের বিশালগুড়ির সঙ্গে নৌকার দড়ি বাঁধা থাকতো। এই তথ্য অনুযায়ী বাদ সংলগ্ন গেট তথা ইংরেজ কারিগরি জ্ঞান, মতিঝিল তথা মুক্তা চাষ ও তার বাণিজ্য যেনো একই সূত্রে গাঁথা একটি মালা।
এরপর বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে নদীর বাঁকে উপত্যকার গভীরতা হ্রাস পাওয়ায়, দ্বিতীয় দশকের শুরুর দিকে ভাগীরথীর সামনের সংকীর্ণ অংশটি হাতে কেটে রৈখিক করে দিলে, বিচ্ছিন্ন প্রাচীন প্রবাহ পথটি কাটি গঙ্গা নামে পরিচিত হয়। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গেট দুটি তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারায়। নবাবি আমলের বাঁধের একটি অনালোচিত অধ্যায় রূপে লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে গিয়েছে এই দুটি স্লুইস গেট ও সম্পর্কিত মতিঝিলের মুক্তা চাষ। শুধু থেকে গিয়েছে সেই আমলের উন্নত কারিগরি বিদ্যার বাস্তব প্রয়োগের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে।
লেখক পেশায় লালবাগ এসসিবিসি কলেজের ভূগোল বিভাগের শিক্ষক।ভালো লাগার বিষয় ভ্রমণ এবং ফটোগ্রাফি।অনেক সময় শুধুমাত্র ফটোগ্রাফির জন্যও ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন তিনি।নিজের ইউটিউব চ্যানেলও আছে সেখানে নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা গুলি শেয়ার করেন নিজের আনন্দে।ভূগোল বিষয়ে তার বহু গবেষণা পত্র জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে বহু নামি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।তবে ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে এটিই তার প্রথম লেখা।








অনেকসুন্দরপোস্টএই যা আমাদের প্রাচীনইতিহাসকে স্মরণকরিয়েদেয়।
ReplyDeleteস্যার আপনি আমাদেরএভাবেই অনেকসুন্দরপোস্টদান করুন যা দ্বারা আমরা আমাদের ইতিহাস কে আমাদেরমধ্যে বাচিঁয়ে রাখতে পারি,
আপনারভাই... সানি সেখ
খুব সুন্দর হয়েছে। আরো লেখা চাই।
ReplyDeleteখুব সুন্দর ❤️
ReplyDelete