রাষ্ট্রিক নয় ভারতের মধ্যযুগের সাধনা (চতুর্থ পর্ব)
প্রিয়াঙ্কা সরকার
(চতুর্থ পর্ব)
ভক্ত ভগবানের আধারে পূর্ণাঙ্গতা আনে৷ বুদ্ধের ভক্তগণ এমনভাবেই তথাগতের আদর্শকে পূর্ণাঙ্গ ভাবে গ্রহণ করেন। অনুরূপে শিব বা বিষ্ণুকে ভক্তেরা
আকাঙ্খা আর আদর্শের আধারে আশ্রয় রচনা করে৷ এবার আসি দক্ষিণ ভারতের দ্বাদশ আলবারোর কথায়৷ না, বলতেই পারেন এরা তো নীচকুলজাত আর "অণ্ডাল " একজন নারী৷ এরা জাতিতে অস্পৃশ্য ; ধর্মের ভিত্তিতে সবাই সমান, কিন্তু সমাজে তো জাতিভেদ প্রথা আছে৷ আলরারেরা ভক্তিরস কেন্দ্রিক। তবে বলা যায়, এ ভক্তিবাদ নতুন নয় , বরং ১২১৩ থেকে রামানুজের সময় পর্যন্ত এই ভক্তি আন্দোলন চলেছিলো৷ আসলে রামানুজের আগমন মানেই ভক্তিমনের উত্তরণ। ",তিরু বায়মলি" কে তিনি
বলেছিলেন, "বৈষ্ণবের বেদ "। পংক্তিভোজন বললে, " তেনকালই " দক্ষিণবাদ। ষোড়শ শতাব্দীতে বেদান্ত দেশিক কিন্তু বহুলাংশে বেদবাদ ; বলা হয়ে থাকে যে, তেন কলই বিবাহে বৈদিক হোম বাদ আর বেদান্ত দেশিক সেইগুলিকেই পুনঃপ্রবর্তিত করেন।
স্তর বিবেচনা করলে বোঝা যায়, যে, রামানুজাচার্যের দর্শনে ব্রহ্ম, আত্মা ও প্রাকৃত বিদ্যমান। ভক্তির অর্থ কেবল আরাধনা নয়, বরং ধ্যান বা প্রার্থনা ; রামানুচার্য ভক্তি বর্ণ ও শ্রেণি থেকে পৃথক, তিনি হলেন যুগগুরু। কিন্তু তথ্য বলে, পূর্বে রামানন্দ সাম্প্রদায়ী ছিলেন এবং পরে তিনি মুক্ত হন। আনন্দতীর্থের পূর্বে শৈব শংকর মতবাদী ছিলেন। পরে মাধ্ব সম্প্রদায় স্থাপন করেন৷ তিনি চতুর্দশে বেদান্তবাদকে পরিহার করে সাংখ্যযোগের পথে এগিয়ে যান৷ বিবিধ সম্প্রদায়ের দিক থেকে একটি বিষয় খুব আশ্চর্য করে যে, আদি অনুপ্রেরণায় আছেন নিরক্ষর জাতি। তথ্য বলে, নিম্বাদিত্য সম্প্রদায়ের গুরু নাকি সূর্যের অবতার৷ এরা পুরাতন মতবাদী৷ বলা হয় মাধ্বমতের এক স্রোত চৈতন্য জীবনের আদল পাল্টে দেয়৷ যদিও ঈশ্বরপুরী, কেশব ভারতীর নাম পাওয়া যায়, তবুও নূতন ভক্তিধর্মের পথে কিন্তু মহাপ্রভু চৈতন্যের নামই উঠে আসে। যদিও তিনি সমন্বিত ধারাকে গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু জাতির সমান অধিকার দিতে পারেন নি। পরে অবশ্য নিতানন্দের পুত্র বীরভদ্রের শাখা মিলিত হয়৷
আসামের শংকরদেব নিজে কায়েস্থ ছিলেন।। তিনি ছিলেন উদার। তাঁর নাগা মিকির ও মুসলমান শিষ্য ছিল।তবে আয়োজনের সংসারে ফল দান, মন্দিরে যাতায়াত, প্রসাদ অগ্রগণ্য ছিলো না৷ তথ্য বলে, বৃন্দাবন থেকে মহাপ্রভুর ধর্ম রাজপুতানা বৈষ্ণবদের উপরও ছড়িয়ে যায়৷ পাঞ্জাবের ডেরা ইসমাইল খাঁ বাসীদেরও মধ্যে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ভাব দেখা যায়। গুজরাত ও কচ্ছ সেখানে পুষ্টিমার্গের অধীন হয়ে পড়ে৷ বল্লভের চার শিষ্য ও বিটঠলের চারি শিষ্য সকলেই প্রচারক কবি হিসাবেই খ্যাত৷ কবি অন্ধ সূরদাসের ছয় ভাই মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে মারা যান। তিনি ভক্ত কবিতে পরিণত হন৷ প্রচলিত মত বলে তাঁর পিতা ছিলেন, আকবরের সভার গায়ক।ইতিহাস বলে, সৈয়দ ইব্রাহিম প্রচুর পদাবলী লেখেন৷ তাঁর নাম রসখান। ইতিহাসে ১৭৩০ হলো বল্লভের পুষ্টিমার্গের পতনে ক্ষেত্র। তিনি বহুলাংশে কবীর অনুরাগী। আর দিল্লীতে এই পরিবর্তন আনেন চরণদাস সম্প্রদায়।
১৭৮০ তে, এক চামারের কাছে উপদেশ পেয়ে আয়োজনের পটে সহজানন্দের প্রচার শুরু হয়৷ এই সম্প্রদায়ের মধ্যেও মিলনের জয়গান আছে৷ সনাকি সম্প্রদায় থেকে রাধাবল্লভী সম্প্রদায় আসে৷ এদের কাছে শক্তি আগে, তারপর পুরুষ৷ তাই আগে রাধা, পরে কৃষ্ণ।তান্ত্রিক বৈষ্ণবদের কাছে নিত্যানন্দ, বীরভদ্র অনেক কাছের, বরং চৈতন্য ততটা প্রচার পায় না৷ মীরাবাঈ এর মধ্যে গৌড়ীয় মতের প্রভাব আছে যথেষ্ট। তবুও সময়, কালে সবটাই বিচারসাপেক্ষ৷
![]() |
ক্রমশ...
তথ্যঋণ
ভারতীয় মধ্যযুগে সাধনার ধারা
"ক্ষিতিমোহন সেন "
ভারতের ইতিহাস অভিধান
মধ্যযুগের ইতিহাসের ধারা
প্রিয়াঙ্কা সরকার পুর্ব বর্ধমানে বসবাস করেন।তিনি বাংলায় মাস্টার্স করেছেন ২০১০এ তার পর ২০১১ তে লাইব্রেরী সায়ন্সে এবং ২০১২তে এনভাইরনমেন্ট সায়ন্সে ২০১৩ তে কমিউনিকেটিভ ইংলিশে পিজি ডিপ্লোমা সম্পূর্ণ করেন এবং ২০১৪ তে তিনি বি.এড ডিগ্রি লাভ করেন।ইতিহাস নিয়ে তার ভালোলাগার অন্ত নেই।তার মনের মধ্যে ইতিহাস যেন সদা জাগ্রত।ইতিহাসের নেশায় তিনি সর্বদা বুঁদ হয়ে থাকেন।ইতিহাস নিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের নানান অনলাইন ও অফলাইন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখে চলেছেন।এছাড়াও তিনি বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে ভালবাসেন,কবিতা লেখেন,আবৃতি করেন,গান করেন,সেই সাথে তার আরও একটি ভালোলাগার বিষয় পারলোক চর্চা।এই বিষয়ে তিনি সমানে গবেষণা করে চলেছেন।




Comments
Post a Comment