" লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন "– সবাই অবশ্য এই কথাটা শুনে থাকবেন, কিন্তু এখন প্রশ্ন হল - কে ছিলেন এই গৌরী সেন ? আচ্ছা তিনি একজন পুরুষ নাকি মহিলা ছিলেন ?

 
রিয়া দাস (রাই) 

 

 

 

 




" লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন  " - এই প্রবাদটি এখনও বাংলার মাঠে- ঘাটে শহরের অলিতে গলিতে বহু লোকের মুখে শোনা যায়। পশ্চিমবঙ্গে গৌরী সেনের নাম জানে না, এরূপ লোক বিরল।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষে হুগলী শহরের অন্তর্গত বালি নামে এক পল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন গৌরী সেন। তাঁর সম্পূর্ণ নাম গৌরী শঙ্কর সেন। তিনি জাতিতে ছিলেন সূবর্ণ বণিক। তাঁর আদিনিবাস সম্পর্কে দুটি ভিন্ন মত রয়েছে। তিনি হুগলীর অন্তর্গত বালি গ্রামের অধিবাসী ছিলেন, কিন্তু অনেকে আবার বহরমপুরের অধিবাসী বলেন। তিনি কখনও বহরমপুরের অধিবাসী ছিলেন না।

পর্তুগিজদের আমলে যে সকল দেশীয় ব্যাবসায়ী উল্লেখযোগ্য ছিল তাদের মধ্যে এক ব্যাবসায়ীর নাম আজও প্রবাদ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। ব্যাবসা- বাণিজ্য, ধর্মকর্ম, জনকল্যাণ মূলক কাজে এই মানুষ টি বর্তমান প্রজন্মের কাছে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য। তিনি হলেন গৌরী সেন। আজও মানুষ টাকার প্রয়োজন পড়লে বলে
" লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন "।

তাঁর পূর্ব পুরুষ পুরন্দর সেন সপ্তগ্রামের পতনের পর পুরন্দরের বংশধর হলধর সেন হুগলীতে এসে বসবাস করেন। সেইসময় পর্তুগিজরাই ছিল, হুগলীর শাসনকর্তা, ইংরেজ শাসন তখনও এদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় নি। হলধর প্রপৌত্রের নাম ছিল অনিরুদ্ধ সেন, অনিরুদ্ধের পুত্রের নাম নন্দরাম। আর নন্দরামের পুত্র হল গৌরী সেন।

প্রথমেই বলে রাখি, কলকাতার বিখ্যাত প্রাচীন অধিবাসীদের মধ্যে বৈষ্ণবচরণ শেঠ সর্বাপেক্ষা পুরাতন লোক ছিলেন। প্রায় একশো বছর আগে বড় বাজারে তাঁর বাসস্থান ছিল। তাঁর সময়ে যে সমস্ত লোক ব্যবসা বাণিজ্য করতেন তাঁদের মধ্যে বৈষ্ণব বাবু একজন অত্যন্ত পরায়ন এবং ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর সম্বন্ধে অনেক গল্প আছে। তেলঙ্গানার রাজকুমার রামরাজা  কলকাতা থেকে দেবারাধনার জন্য যে গঙ্গা জল নিয়ে যেতেন, সেই গঙ্গা জল বৈষ্ণব চরণের মোহরাঙ্কিত না হলে তিনি ব্যবহার করতেন না।

এই গৌরী সেন ব্যবসার সূত্রে বৈষ্ণব চরণের অংশীদার ছিলেন। বৈষ্ণব শেঠ  এক সময়ে অনেক দস্তা কেনেন। কিন্তু পরীক্ষা করে জানা যায়, এই দস্তার মধ্যে রূপোর অংশ ছিল বেশী। সেই সময় বৈষ্ণব চরণ ভাবলেন, গৌরী সেনের নামে দস্তা কেনার ফলে " রাঙ্গের বদলে রূপায় " এসে দাঁড়িয়েছে। এরপর ধর্মভীরু, কর্তব্য পরায়ন বৈষ্ণব চরণ বিক্রি করে সমস্ত টাকাই গৌরী সেনকে দিয়ে দেন।

গৌরী সেন অসাধারণ সৌভাগ্য সম্পদের অধীশ্বর ছিলেন, তাঁর প্রতি সৌভাগ্য দেবীর আকস্মিক কৃপা সম্বন্ধে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। বাংলার প্রথম গির্জা ব্যান্ডেল চার্চের দেওয়ান ছিলেন গৌরী সেন। গৌরী সেনের পিতা নন্দরাম ছিলেন মধ্যবিত্ত গৃহস্থ। মূলত ১৫৯৯ খ্রীঃ ব্যান্ডেলে এই গির্জা নির্মাণ করা হয়। খ্রীষ্টানদের উপাসনা করার জন্য এটি তৈরি করা হয়।

একবার তিনি সাতটি নৌকা বোঝাই করে মেদিনীপুরে দস্তা পাঠান। নৌকা গুলি যখন মেদিনীপুরে এসে পৌঁছায় তখন তাঁর বন্ধু ভৈরব চন্দ্র দত্ত নৌকা গুলি রৌপ্য পূর্ণ দেখে তাঁর জিনিস নয় বলে তিনি আবার হুগলীতে গৌরী সেনের কাছে নৌকা গুলি ফেরত পাঠিয়ে দেন।

জনশ্রুতি আছে, যেদিন নৌকা গুলি হুগলীতে ফিরে আসে ঠিক তার আগের রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেন যে, মহাদেব তাঁর সামনে এসে তাঁকে বলছেন যে, তুমি মহাদেবের মন্দির নির্মাণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলে।তার জন্য আমি তোমায় অর্থ পাঠিয়েছিলেন। তুমি কাল নৌকা থেকে তা গ্ৰহণ করে তোমার বাড়ির পশ্চিমদিকের বাগানে আমার মন্দির করে দিও। পরেরদিন সকালেই গৌরী সেন গঙ্গাতীরে গিয়ে সপ্ততরীর যাবতীয় দস্তা রৌপ্যে পরিণত হয়েছে। তাই দেখে তিনি বিস্মিত হয়ে পড়েছেন।

এরপর তিনি সেই অর্থ ব্যয় করে মহাদেবের জন্য মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত  'গৌরীশঙ্কর  মন্দির ' হুগলীতে বিদ্যমান আছে। মন্দির গাত্রে একটি প্রস্তর ফলকে মন্দির প্রতিষ্ঠার তারিখ লিখিত আছে-
গৌরী সেন, বাংলা সন ১০০৬ সাল
ইংরেজি সন ১৫৯৯ সাল

সেই সময় সপ্তগ্রামের সমস্ত খাবারের দোকানে তিনি বলে দিয়েছিলেন যে, তাঁর নাম করে কোন দরিদ্র ব্যক্তি যদি খেতে চান, তাহলে তাকে যেন খেতে দেওয়া হয়। কিন্তু অনেকে তাঁর এই দানশীলতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই তাঁর অর্থ অপচয় করত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি কখনও ক্ষুন্ন হতেন না। তিনি ছিলেন বিনয়ী, ধীর ও সদালাপী ব্যক্তি ছিলেন। এরপর গৌরী সেন তাঁর অর্জিত বিপুল সম্পত্তি দান করতে থাকেন। কন্যাদায়,মাতৃদায়,পিতৃদায়, দেনার দায়ে যারা জর্জরিত  , আবার যারা ন্যায় পথের থেকে সৎকার্য্যের জন্য ফৌজদারী তে জড়িত ও জরিমানার আসামী, তাদের জন্য তিনি অর্থ ব্যয় করতেন। এই থেকেই শুরু হয় প্রবাদ " লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন "।

গৌরী সেনের বংশধর এখনও হুগলীতে বিদ্যমান আছে। কিন্তু আগের মতো সে অর্থ তাঁদের আর নেই। বর্তমানে শ্রী সত্যচরণ সেন, গৌরী সেনের বংশে বর্তমান আছেন। গৌরী সেনের প্রাসাদোপম বিরাট ভবন আজও আছে, কিন্তু তিনি যে গৃহে জন্মগ্রহণ করেন তা আর নেই। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত গৌরী শঙ্করের মন্দির রয়েছে। সুশীল কুমার দে বাংলা প্রবাদে গৌরী সেনের নাম গৌরীকান্ত লিখেছিলেন কিন্তু তাঁর নাম ছিল গৌরী শঙ্কর।
কিন্তু তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে  কোন ব্যবস্থা করা হয় নি। এমনকি গৌরী সেনের নামে একটি রাস্তার নাম ও হয় নি।

তথ্যসূত্র: কলিকাতা একালের ও সেকালের - হরিসাধন মুখোপাধ্যায়।

 

 

 

 রিয়া দাস রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্রী।বরাবরই  ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী।সাথে অবসর সময়ে কবিতা লিখতে ভালবাসেন। ইতিহাস নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। অতীতের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে মাঝে মাঝেই  বেরিয়ে পড়েন অতীত অনুসন্ধানে।রাজ্যের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ইতিহাস নিয়ে নানান গবেষণাধর্মী লেখা তিনি নিয়মিত ভাবে লিখে চলেছেন।     

Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস