ইতিহাসের আলোকে মহাকবি কৃত্তিবাস ওঝা



রিয়া দাস ( রাই  ) 

কে এই কৃত্তিবাস  ? কৃত্তিবাস বাংলার এক রূপ আদিকবি। তাঁর রামায়ণ অমৃত কাব্য। যতদিন বাংলা ভাষা ও বাঙালি নামের অস্তিত্ব থাকবে, কৃত্তিবাসের অতুল কীর্তি সেই রামায়ণের ততদিন বিনাশ নেই। পান্ডিত্যে ও কবিত্বে তিনি যেমন ছিলেন শক্তিশালী। তেমনি অন্যদিকে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি, প্রেম ও বিশ্বাস ছিল তাঁর গভীর।

যতদিন বাঙালি পরিচয় থাকবে ততদিন রামায়ণ অনুবাদকের মধ্যে দিয়ে কৃত্তিবাসের নাম অমর হয়ে থাকবে। সংস্কৃতে রচিত মহাকবি বাল্মীকির রামায়ণকে সহজসরল বাংলা পয়ার ত্রিপদী ছন্দে নিজের বিদ্যা বুদ্ধি ও ভাবানুযায়ী অনুবাদ করেছেন। কৃত্তিবাস মহাকাব্য রচনা করেন নি করেছিলেন  'রামায়ণ পাঁচালী ' –
" বাল্মীকি বন্দিয়া  কৃত্তিবাস বিচক্ষণ।
পাঁচালী প্রবন্ধে রচে বেদ রামায়ণ।। "
অন্যান্য কবিদের মতো মধ্যযুগের এই কবির আত্মজীবনী ও তাঁর জীবন নিয়েও বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে।

রাণাঘাটের কাছে ফুলিয়া গ্রামে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমী অর্থাৎ সরস্বতী পূজার দিন রবিবার কৃত্তিবাস জন্মগ্রহণ করেন। যদিও তাঁর জন্ম সাল নিয়ে নানা মতভেদ আছে। তাঁর পিতা বনমালী ওঝা এবং পিতামহ মুরারি ওঝা ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিত। তিনি তাঁর আত্ম বিবরণী তে জানান -
 
" আদিত্যবার শ্রী পঞ্চমী পুণ্য মাঘ মাস।
তিথি মধ্যে জন্ম লইলাম কৃত্তিবাস।। "
মাইকেল মধুসূদন দত্ত কৃত্তিবাস সম্পর্কে বলেছেন -
" কৃত্তিবাস কীর্তিবাস কবি, এ বঙ্গের অলংকার। "

বাল্যকাল থেকেই কৃত্তিবাসের বিদ্যার প্রতি অনুরাগ ছিল গভীর। পরবর্তীকালে তিনি সর্ববিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ করে গৌড়েশ্বরের রাজসভায় রাজকবি হিসাবে সম্মানীয় স্বীকৃতি লাভ করেন এবং রাজা গৌড়েশ্বরের অনুরোধে মূল সংস্কৃত থেকে বাংলায় রামায়ণ কাহিনী অনুবাদ করেন। কিন্তু এই গৌড়েশ্বর কে ছিলেন এই বিষয়েও মতভেদ আছে, কেউ কেউ বলেন যে তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ন ই কৃত্তিবাস বর্ণিত গৌড়েশ্বর, আবার কারও কারও মতে, রাজা গণেশ ও এই গৌড়েশ্বর অভিন্ন।




মহারাজ আদিশূর, কান্যকুব্জ থেকে শ্রীহর্ষ,ভট্ট নারায়ণ, দক্ষ, বেদগর্ভ ও ছান্দড় নামে যে পাঁচজন ব্রাহ্মণ এনে বাংলায় বাস করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে শ্রী হর্ষের বংশে অধস্তন ২২ পুরুষ কৃত্তিবাস। কৃত্তিবাস যে বংশে জন্মগ্রহণ করেন, সেই বংশে প্রসিদ্ধ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর জন্মগ্রহণ করেন। কৃত্তিবাসের হৃদয় অতি বিশাল ছিল। লোক হিত সাধনের জন্য তিনি যে আলোক স্তম্ভের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা কর্ম সাগরে পথভ্রান্ত জনগণকে চিরদিন পথ প্রদর্শন করবে। আগেকার লোকেদের বিশ্বাস ছিল -
অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানি চ।
ভাষায়াং  মানবঃ শ্রত্বা  রৌরবং নর্থ ব্রজেৎ।।

গৌড়েশ্বরের আদেশে কৃত্তিবাস যে দিন রামায়ণ রচনা করার ভার গ্ৰহণ করেছিলেন, জাতীয় ইতিহাসে সে দিনের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বাংলা সাহিত্যে কত কবি যে কৃত্তিবাসের ছায়াতলে আত্ম বিসর্জন করে কৃত্তিবাসের অঙ্গে বিলীন হয়েছিলেন, তাদের সংখ্যা কে জানে।  আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দীতে কবি কৃত্তিবাস বাঙালি কে ও বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে এই অপূর্ব রত্ন উপহার দেন, প্রকৃতপক্ষে তাঁর রচিত রামায়ণ বাঙালির কাছে আজও চিরনতুন , পরম শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে গ্ৰহনীয় হয়ে থাকে।

কৃত্তিবাসী ১৮০২-১৮০৩ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে সর্বপ্রথম পাঁচ খন্ডে মুদ্রিত হয়। জয়গোপাল তর্কালঙ্কার সম্পাদনায় ১৮৩০-৩৪ সালে দু খন্ডে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে অদ্যাবধি রামায়ণের যতগুলো সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে শ্রীরামপুরের প্রথম সংস্করণের পাঠ ই সর্বোত্তম বলা হয়।

কৃত্তিবাস বর্ণিত শ্রীরামচন্দ্রের দুর্গা পুজা, হনুমান কর্তৃক রাবণের মৃত্যুবাণ হরণ, মহীরাবণ বধ ও লবকুশের যুদ্ধে প্রভৃতি বিষয়গুলি বাল্মীকির রামায়ণে দেখা যায় না। প্রায় আশীর্বাদ বছর আগে কলকাতার সংস্কৃত  কলেজে জয়গোপাল তর্কালঙ্কার সুবোধ্যকরবার জন্য তিনি কৃত্তিবাসী রামায়ণের ভাষায় প্রায় আমূল সংস্কার করেন।

কৃত্তিবাস রামায়ণ এক অপূর্ব পুস্তক। ভাষার লালিত্যে, বর্ণনার মনোহারিত্বে, অলংকার ও উদাহরণ প্রয়োগের মাধুর্যে এটি বাংলা ভাষার একটি শ্রেষ্ঠ গ্ৰন্থ। বাংলার তদানীন্তন সামাজিক জীবনের এবং ধর্মবিশ্বাসের পরিচয় এই পুস্তক থেকে পাওয়া যায়। যে কাব্যে সমগ্ৰ দেশের এক অখণ্ড যুগের অভিব্যক্তি ও বিশেষত্বের কথা লেখা থাকে তাকে মহাকাব্য বলে। এই দিক থেকে কৃত্তিবাসের রামায়ণ এক অপূর্ব মহাকাব্য। এই মহাকাব্য রচনায় কবির বিশিষ্ট সত্তা থাকে না। সমগ্ৰ দেশ ও কাল কবির হৃদয় ও প্রতিভার মধ্য দিয়ে তাদের বিশেষত্ব ও বৈচিত্র্য প্রকাশ করে। মহাকাব্যের প্রেরণা ও প্রভাব দেশের মধ্যে কল্যাণ ও শক্তি দান করে। এইরূপে সেই মহাকাব্য তখনই সার্থক হয়ে ওঠে যখন দেশের ভবিষ্যৎ ইতিহাস সেই মহাকাব্য কে আশ্রয় করে সংগঠিত হয়। এই কারণে কৃত্তিবাসের রামায়ণ সার্থক হয়েছে।

এছাড়াও এই ফুলিয়া গ্রামে রয়েছে আরও একটি দর্শনীয় স্থান শ্রীচৈতন্য পার্ষদ হরিদাস ঠাকুরের সাধনা স্থল শ্রীশ্রী হরিপাট।শ্রী শ্রী হরিদাস স্মৃতি রক্ষা সমিতি, এই মন্দিরের ভেতরেই রয়েছে বলরাম - রেবতী আর কৃষ্ণ-রাধা মূর্তি। এই মন্দিরের পাশেই একটি ছোট বেদীতে লেখা আছে- ' মহাকবি কৃত্তিবাস পন্ডিতের অস্থি সমাধি ৯০০ বঙ্গাব্দ'।




তথ্যসূত্র : পুরাতন বাংলা সাহিত্যের তথ্য ও কালক্রম - সুখময় মুখোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাস - ক্ষেত্র গুপ্ত।

ছবি - বাপ্পা দাস 

 

 

 রিয়া দাস রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্রী।বরাবরই  ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী।সাথে অবসর সময়ে কবিতা লিখতে ভালবাসেন। ইতিহাস নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। অতীতের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে মাঝে মাঝেই  বেরিয়ে পড়েন অতীত অনুসন্ধানে।রাজ্যের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ইতিহাস নিয়ে নানান গবেষণাধর্মী লেখা তিনি নিয়মিত ভাবে লিখে চলেছেন।     



Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস