গজলক্ষ্মী দেবীর পূজা ও উৎস
আশুতোষ মিস্ত্রী
সংসারে সুখ শান্তি, ধন রত্নের আশা আকাঙ্খা সকলেই করে থাকেন। সকলেই চায় পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে থাকতে। সংসারে যেন কোন দিন অভাব প্রবেশ করতে না পারে। সেই কারণে হিন্দু পরিবারে প্রতি বৃহস্পতিবার মা লক্ষ্মীর পূজো করা হয়। লক্ষ্মী দেবীর কৃপায় সংসারে আসে সুখ শান্তি এবং ধন রত্ন। তবে লক্ষ্মী দেবী বড়ই চঞ্চলা। তিনি এক জায়গায় বেশি দিন থাকেন না। এবং তার মন চঞ্চলা হলে সম্পদ ও সমৃদ্ধির বিনাশ ঘটে। লক্ষ্মীর আর এক নাম শ্রী - তিনি বিষ্ণুশক্তি বা বিষ্ণু-প্রিয়া। অনেক সময় লক্ষ্মী গণেশ একসঙ্গে পূজা করলে সুখ শান্তি, ধন রত্নের সঙ্গে শুভবুদ্ধিরও উদয় হয়। লক্ষ্মীকে নিয়ে বাংলার জনসমাজে বিভিন্ন জনপ্রিয় গল্প প্রচলিত আছে। এই গল্পগুলি পাঁচালির আকারে লক্ষ্মীপূজার দিন পাঠ করা হয়। একে লক্ষ্মীর পাঁচালি বলে। লক্ষ্মীর ব্রতকথাগুলির মধ্যে "বৃহস্পতিবারের ব্রতকথা" সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়াও "বারোমাসের পাঁচালি"-তেও লক্ষ্মীকে নিয়ে অনেক লৌকিক গল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়।
যাইহোক আমার আলোচ্য বিষয় হলো গজলক্ষ্মী দেবীর পূজা ও উৎস সম্পর্কে। এই গজলক্ষ্মী নিয়ে আলোচনা করতে হলে প্রথমে লক্ষ্মী দেবীর আটটি রূপের কথা বলা দরকার। এই "আট লক্ষ্মী" হলেন ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আটটি বিশেষ রূপ। তারা সম্পদের আট উৎস তথা লক্ষ্মীদেবীর শক্তির প্রতীক। অষ্টলক্ষ্মী লক্ষ্মীরই রূপভেদ মাত্র। অষ্টলক্ষ্মী "সম্পদ" কথাটির অর্থ হল সমৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য, জ্ঞান, শক্তি, সন্তানাদি ও ক্ষমতা। মন্দিরে অষ্টলক্ষ্মীকে একযোগে পূজা করা হয়ে থাকে।
অষ্ট লক্ষ্মীর নাম গুলি হলো - ১/ আদিলক্ষ্মী ( বা মহালক্ষ্মী ) লক্ষ্মীর আদিরূপ এবং ঋষি ভৃগুর কন্যারূপে লক্ষ্মীর অবতার।তাঁকে আবার কিছু পুরাণে ‘সাগর কন্যা’ও বলা হয়। সমুদ্র মন্থনের সময় আদিলক্ষ্মী প্রকটিত হয়ে ভগবান বিষ্ণুকে স্বামী রূপে বরণ করেন।
২/ ধনলক্ষ্মীঃ ধনলক্ষ্মীর অর্থ ও স্বর্ণদাত্রী রূপ, তাঁকে প্রসন্ন করতে পারলেই তিনি সাধককে অর্থ, ঐশ্বর্য এমনকি পারমার্থিক ধন –সম্পত্তি- এমনকি ‘ব্রহ্মবিদ্যা’অবধি প্রদান করেন ।
৩/ধান্যলক্ষ্মীঃ কৃষিসম্পদদাত্রী লক্ষ্মী।ধান্যলক্ষ্মী’ হলেন চাল, ডাল, ধান, গম ইত্যাদি কৃষিজ ফসলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তাঁর কৃপায় কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে মাঠ ফসলে ভরে ওঠে। কৃষকেরা গৃহে ফসল তুলে এই লক্ষ্মীর মুখ দেখতে পান। মাঠ ভরা ধান, গম এই লক্ষ্মীর প্রতীক। তাঁকে কেন্দ্র করেই নবান্ন উৎসব পালিত হয়।
৪/গজলক্ষ্মীঃ গজলক্ষ্মী’ হলেন পশু ,সম্পত্তি এমনকি পশু পালন মারফৎ যে অর্থ আসে- তাঁর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। পশুপালনের দ্বারা সভ্যতার বিকাশ, লাঙল, রথ টানা ইত্যাদির মাধ্যমেই সমাজের বিকাশ হয়েছিল । এই দেবীর কৃপায় দেবতাদের রাজা ইন্দ্রদেব ঐরাবতকে বাহন রূপে প্রাপ্ত করেন বসুধা নারায়ণ “গজলক্ষ্মী” শব্দটির ব্যাখ্যা করেছেন “গজ অর্থাৎ হাতিদের দ্বারা পূজিত লক্ষ্মী।
৫/ সন্তানলক্ষ্মীঃ সন্তানপ্রদাত্রী লক্ষ্মী দেবী রূপে পূজিত হন।
৬/ বীরলক্ষ্মী বা ধৈর্যলক্ষ্মীঃ তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব এবং জীবনের কঠিন সময়ে সাহস প্রদানকারী লক্ষ্মী।দেবী তাঁর ভক্তদেরকে সাহস ও উদ্যম প্রদান করেন। তাঁর কৃপায় হতাশা, অলসতা আদি শত্রু গুলির নিরাময় ঘটে । নিষ্কাম সাধকের মনে অনেক সময় ধর্ম ও অধর্মের মধ্যে সংগ্রাম হয়, তখন বীরলক্ষ্মীদেবী সাধককে সাহস, উদ্যম, এবং ক্ষমতা দিয়ে অধার্মিক রিপুগুলিকে ধ্বংস করবার শক্তি প্রদান করেন ।
৭/বিজয়লক্ষ্মী বা জয়লক্ষ্মীঃ বিজয়লক্ষ্মী হলেন বিজয় প্রদানকারিনী লক্ষ্মী, বিজয় শক্তির দেবী। যুদ্ধের পর যে ‘বিজয়’ ঘোষণা করা হয় সেই বিজয়শ্রী প্রদান করেন দেবীবিজয়ালক্ষ্মী। সাধক যখন তাঁর রিপুগুলিকে পরাজিত করে শুভশক্তির প্রকাশ ঘটান তখন তিনি এক পারমার্থিক সুখ লাভ করেন সেই সুখ প্রদান করেন এই দেবী ।
৮/ বিদ্যালক্ষ্মীঃ তিনি বিদ্যা কলা ও বিজ্ঞানের জ্ঞানপ্রদানকারিনী লক্ষ্মী।
এছাড়াও আরো কয়েকটি লক্ষ্মীর নাম পাওয়া যায় তা হলো- ঐশ্বর্যলক্ষ্মী : ঐশ্বর্য দান কারিনী মালক্ষ্মীর এক রূপ। সৌভাগ্য লক্ষ্মী : সৌভাগ্য প্রদানকারিনী। রাজ্যলক্ষ্মী : যিনি শাসককে আশীর্বাদ করেন। বরলক্ষ্মী : যে দেবী সুন্দর বর প্রদান করেন ।
বিষ্ণুপুরাণে উল্লেখিত আছে যে, সমুদ্র মন্থনকালে সমুদ্র থেকে লক্ষ্মীর আবির্ভাবের পরেই গঙ্গা ও নানান নদী সমূহ লক্ষ্মী দেবীর স্নানের জন্য সমাগত হন। আর সেই সময় দিগ্ গজগণ স্বর্ণ কলসে জল নিয়ে দেবীকে স্নান করিয়েছিলেন -
"গঙ্গাদ্যাঃ সরিতস্তোয়ৈঃ স্নানার্থমুপতিস্থিরে।।
দিগ্ গজাঃ হেমপাত্রস্থমাদায় বিমলং জলম।
স্নাপয়াঞ্চক্রিরে দেবীং সর্বলোকমহেশ্বরীম।।
লক্ষ্মী দেবীর এই মূর্তিই অভিষেক লক্ষ্মী বা গজলক্ষ্মী। এই রূপে দেবীর ডান দিকের ঊর্ধ্ব হস্তে পদ্ম ও অধোহস্তে বরমুদ্রা এবং বামদিকের ঊর্ধ্ব হস্তে পদ্ম ও অধোহস্তে অভয়মুদ্রা ধারণ করে আছেন। যার মস্তকে রত্ন মুকুট এবং পরিধানে পট্টবস্ত্র। তিনি আবার পদ্মের উপর আসীন থাকেন। গজলক্ষ্মী হলেন মা লক্ষ্মীর আরাধ্য দেবী। যাঁর কৃপায় পশুপালন এবং পশুজাতীয় সম্পত্তির বিকাশের মধ্য দিয়ে ভক্তের ঘরে ধনসম্পদ আসে। যদিও চারটি হাতির কথা শাস্ত্রে উল্লেখ থাকলেও উড়িষ্যাতে মা লক্ষ্মীর দু-পাশে সবসময় দুইটি সাদা হাতিকে দেখতে পাওয়া যায়। যারা ঘড়ায় করে দেবীর মাথায় পবিত্র অমৃত জল ঢেলে চলেছে, এছাড়া পাশে দুই দেবীর মূর্তি দেখা যায়। পুরাণ বলে, দেবরাজ ইন্দ্রের সাদা ঐরাবতটিও নাকি দেবী গজলক্ষ্মীরই উপহার। জমিতে লাঙল দেওয়া, রথ চালানো, ভ্রমণ, যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে দেশ রক্ষা সহ এমন নানা কাজে পশুর ব্যবহার অতি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। উড়িষ্যার অনন্তগুহায় লক্ষ্মী দেবীর অন্যতম প্রাচীন মূর্তি হিসেবে গজলক্ষ্মীর মূর্তি অঙ্কিত দেখা যায়। এখানে দেবী পদ্মবনে দন্ডায়মান দুই হস্তে পদ্ম ধারণ করেছেন। দুটি হাতি শুড় দিয়ে জলপূর্ণ কলসী উপুড় করে দেবীকে স্নান করাচ্ছে। এছাড়া সাঁচি এবং ভারহূতের বৌদ্ধ স্তুপে গজলক্ষ্মীর ছবি অঙ্কিত আছে। সুতরাং অনুমান করা যেতে পারে গজলক্ষ্মী মূর্তির পরিকল্পনা খ্রিস্টপূর্ব প্রথম অথবা দ্বিতীয় শতাব্দীর পরে নয়। প্রাচীন ভারতের বহু মুদ্রাতে গজলক্ষ্মী মূর্তির ছাপ দেখা যায়।
উড়িষ্যার পাশাপাশি আমাদের পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলাতেও এই গজলক্ষ্মী পূজা হয় বলে শোনা গেছে। বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি থানার রামকানালি গ্রামের গজলক্ষ্মীপুজো প্রায় ১২১ বছরের পুরোনো। গ্রামের একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের লোকজনই মূলত এই পুজোর আয়োজন করেন। প্রতি বছরই মন্দিরে নতুন করে প্রতিমা তৈরি করা হয়। হাতির পিঠে চড়ে থাকার জন্যই দেবী এখানে পরিচিত গজলক্ষ্মী নামে। অপরদিকে বাঁকুড়া জেলারই সিমলাপাল থানার বিক্রমপুরের পারুলিয়া গ্রামেও গজলক্ষ্মীপুজো হয় বলে জানা যায়।
তথ্য ঋণ :
হিন্দুদের দেবদেবী(তৃতীয় খণ্ড) - হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য,
এই সময় খবরের কাগজ ও অষ্ট লক্ষ্মী কথা "উইকিপিডিয়া" থেকে প্রাপ্ত।
বাংলা বিভাগ নিয়ে স্নাতকোত্তর হলেও ইতিহাস আমার প্রিয় বিষয়। যদিও কর্মে আমি ফার্মের হিসাব রক্ষক হিসেবে কাজ করি উমরপুর মাহিন্দ্রা ট্রাক্টর ডিলারশিপে। মুর্শিদাবাদ জেলার আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে সামান্য পড়াশুনো করি ও কিছু প্রবন্ধ লিখেছি এছাড়া মাঝে মধ্যে বেরিয়ে পরি নানান প্রত্নস্থলে তথ্য অনুসন্ধানে। বই সংগ্রহ করতে ভালোবাসি মুর্শিদাবাদ জেলার প্রায় বই আমার সংগ্রহে। এছাড়াও আরো কিছু বই সংগ্রহ করেছি মাত্র।




Comments
Post a Comment