একটি মৃতপ্রায় নদীর আর্তনাদ

 



সঞ্চয়িতা সরকার




যদি দেখি নদীর ইতিহাস, তার সৃষ্টি হয়েছে লক্ষ লক্ষ

 কালের ইতিহাসে অনেক মিলিয়েও গেছে, শুষ্ক করিয়া বক্ষ।

অনেকেরই স্থান আছে ইতিহাসে, অনেকের বা নেই, 

এদেরও আমরা ফিরে পাবো, সমীক্ষা করবো যেই।

'Memories of Moribound River', নাম দিয়েছি তাই,

 যা বলি শোনো এখন, অন্য কথা নাই।

বাংলা তো নদীমাতৃক দেশ, নদী তার জীবনের সব,

 নদী যদি শুকিয়ে যায়, তবে হবেই কলরব।

নদীর মাছ ছিল খাদ্য, যা শরীরে যোগাবে প্রোটিন,

নদী পথে যাতায়াত, এটাই ছিল রুটিন।

বসতি ছিল তাকে ঘিরেই, ছিল বাণিজ্য তথা, 

আজ আমি বলছি এখন মুর্শিদাবাদের নদীর কথা।

হারিয়ে গেছে অনেক নদী, অনেকের বা ঢেউ,

 ইতিহাসে আঁকড়ে আছে, মৃত্যুর প্রহর গুনছে কেউ কেউ।


মুর্শিদাবাদের প্রাচীন নদ, ভৈরব নাম তার

একখান হয়েছে পূর্বেই লীন, জীর্ণ তার জলাধার।

মহানন্দা ও পদ্মা যেথায় মিলিত হয়, 

ঠিক তার বিপরীতে, পদ্মা থেকে উৎপত্তি, এমন কথা কয়।

জেনেছি আমি পূর্বে এটি ছিল  লালগোলা থানার অন্তর্গত

 পদ্মার মূলধারা যখন গঙ্গা ছিলনা, মহানন্দা এই এছাড়া প্রবাহিত হতো।

পরবর্তীতে পদ্মা রাণী, আসেন ভৈরবেতে, 

তবে পদ্মা এখনো পুষ্ট হয় মহানন্দাতে।

এরই খাত বরাবর প্রবাহিত হয় ভৈরব, তখন জল গেল কমে,

 হ্রাস পেলো নদের গতি, জেনেছি লোকমুখে শুনে।

 এই কথা ছিল পুরনো ভৈরবের, বর্তমানে এটি বৃহৎ আকারের নালা,

 ইহার উৎপত্তি এখন হাসানপুর, থানা ভগবানগোলা।


কি কষ্ট ভৈরবের, পদ্মা শুধুই বর্ষাতেই প্রবাহিত আজ,

 মুর্শিদাবাদে কিছুটা প্রবাহিত হয়ে, জলঙ্গিতে পায় স্রোতের সাজ।

 ইতিহাসের কথা কয় এই ভৈরব নদ, বর্তমান কি অবস্থা হায়! 

পূর্বে, এই পথেই মহাপ্রভু প্রতিবছর, রাজশাহীর খেতুড়িতে  বৈষ্ণব সম্মেলনে যায়।

বাংলার সুবাদার, মানসিংহ নাম 

নদীপথে গমনকালে দর্শন করেন ছাতায় গ্রামের বুড়ো শিবের ধাম।

একথার প্রমাণ আছে, বলছি আমি পত্রে,

সেই আমলের বোলান গানে, এর উল্লেখ আছে,  প্রতি ছত্রে ছত্রে। 

বারো ভূঁইয়াদের অত্যাচার, বাদশা জাহাঙ্গীর দমন করতে চান, 

তাই বাল্যবন্ধু ইসলাম খানকে, বাংলার সুবেদার করে পাঠান।

ভৈরব পথে তিনিও আসেন, এ কথা আজও সত্য,

 তারই তীরে মনোরম  জনপদ পেয়ে বিশ্রাম নেন, এই কথা আছে কথ্য।

অভিভূত হন সুবাদার, তাই পুরাতন নাম করেন দুর, 

তার নিজ নামে নামাঙ্কিত করেন, যা আজ ইসলামপুর। 



১৭৪১, আলীবর্দী খাঁর শাসন,

 জানা যায়, তখনই হয় বর্গীদের আগমন।

পূর্ব ভারতের শ্রেষ্ঠ বন্দর, কাশিমবাজার নাম,

হেথায় ছিল বাংলার রেশম ব্যবসায়ী ও তাঁতিদের ধাম।

বাংলায় বর্গী আক্রমন, যখন ছোঁয় পূর্ণমাত্রা,

ভৈরব পরিবেষ্টিত ইসলামপুরে তাঁতিরা করে যাত্রা।

এখানেই হতো নীল চাষ, সাহেবরাও থাকতো হেথা,

ভৈরব তীরবর্তী তাই, সাহেবচর নাম হয়েছিল তথা।

এমন ভৈরব আজ গতিহীন, ভৈরব আজ বৃদ্ধ,

এক সময় এই নদই, বাংলা কে করেছে সমৃদ্ধ।

কালের নিয়ম গ্রাস করেছে, ভৈরব কে আজ,

 গণজাগরণ ই ফেরাতে পারে, ভৈরবের পুরাতন সাজ।















লেখক পরিচিতি ঃ সঞ্চয়িতা সরকার বোলপুরের মেয়ে, তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে স্নাতকোত্তর, এর পর তিনি এডুকেশন বিষয়েও স্নাতকোত্তর হন এবং  পরবর্তীতে তিনি মাস্টার অফ এডুকেশন ( এম. এড) ডিগ্রীও লাভ করেন। বর্তমানে তিনি মুর্শিদাবাদের একটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের শিক্ষিকা। পেশার সূত্রেই তিনি বর্তমানে মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে  বসবাস করেন,এবং এই শহরেই  সংসার পেতেছেন। তাঁর লেখা লেখির  হাতেখড়ি হয় কবিতা দিয়ে , তিনি , জীবনের প্রথম কবিতা লেখেন  কলেজ জীবনে।তারপর কেটে গেছে বহু সময়,তিনিও আপন মনে লিখে গেছেন নানান কবিতা। এক সময় তিনি নিয়মিত ডাইরিও লিখতেন,কিন্তু সেগুলি আজ অযত্নে হারিয়ে গেছে।কবিতা ছাড়াও তিনি গল্প, প্রবন্ধ সহ ব্যাক্তিগত গদ্যও লিখতে ভালোবাসেন। সঞ্চয়িতাকে ইতিহাস বরাবর খুব টানে, ভ্রমণ পিপাসু হিসেবেও তাঁর বেশ সুনাম রয়েছে। আপাতত তিনি মুর্শিদাবাদ জেলার আঞ্চলিক  ইতিহাস নিয়ে কাজ করছেন, খুব  শীঘ্রই তার পরিশ্রমী কাজ বই হিসেবে হাতে পাবে বলে আশা রাখি।


Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস