মুর্শিদাবাদের কিরীটেশ্বরী মন্দিরের কথা

 



সায়ন্তনী ঘোষ




ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে মুর্শিদাবাদ জেলার মধ্যে কিরীটেশ্বরী একটি পুরাতন স্থান।এই স্থানের প্রকৃত নাম "কিরীটকণা" । এই কিরীটেশ্বরী বর্তমানে পাশাপাশি অবস্থিত ডাহাপাড়া গ্ৰাম থেকে সাদ্ধক্রোশ পশ্চিমে অবস্থিত। পৌরাণিক ও তান্ত্রিক মতে কিরীটেশ্বরী বহু প্রাচীনকাল থেকে বিদ্যমান বলে উল্লেখ আছে।এই স্থানকে নিয়ে অনেক পৌরাণিক কাহিনীর উল্লেখ আছে, যেমন- দক্ষযঞ্জে সতী প্রাণ পরিত্যাগ করলে ভগবান বিষ্ণু তাঁর অঙ্গপ্রতঙ্গ খণ্ড খণ্ড করলে, সেই দেহের খণ্ড গুলি যে যে স্থানে পড়েছিল তার মধ্যে অন্যতম হল কি্রীটেশ্বরী । আরো এক কাহিনী যা প্রচলিত লোক মুখে শোনা যায় সেখানে নাকি এক সময় একরাতে গয়া নির্মানের কাজ চলছিল, কিন্ত ভোর হওয়ার পূর্বে বিঘ্ন ঘটার ফলে তা সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেনি তারফলে ওই স্থানে অনেক ছোটো ছোটো ইটের ঢিবি লক্ষ্য করা যায়। যায় হক দেবির কিরীটপাত হওয়ায় কিরীটকণা মহাপীঠরূপে পূজিত হয়ে আসছেন। রাজা শশাঙ্ক যখন মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণে রাজধানী স্থাপন করে ছিল তখনও তিনি এই কিরীটেশ্বরী মন্দির দেবির শক্তির উপাসনা করতেন তিনি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্বেও হিন্দু ধর্মকে হেলা করেননি । এমন কি গুপ্তবংশীয়গণ খ্রীষ্টপূর্ব প্রায় ৪০০বৎসর থেকে খ্রষ্টজন্মের পর কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত নানা স্থানে রাজত্ব করে ছিল, সুতরাং ৪০০বৎসর পর এখানে কিরীটেশ্বরীর মাহাত্ম্য বিস্মৃত হয়ে আরম্ভ হয় বলে অনুমান করা যায়। গুপ্তবংশ অব্যাহত হওয়ার পর পালবংশ,সেনবংশ, শূরবংশ রাজত্বের বিবরণ দেখা যায় । তাদের সময় ও কিরীটেশ্বরীর আস্তিত্ব ম্লান হয়ে যায়নি। পালবংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও তাদের হিন্দুধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ছিলনা । এমনকি সেই সময় বৌদ্ধ ও হিন্দু উভয় মত মিশ্রিত  হয়ে তান্ত্রিক ধর্ম বঙ্গদেশে প্রাধান্য লাভ করে।   

মুলমান রাজত্ব কালেও এই স্থানে প্রাধান তীর্থস্থান বলে প্রসিদ্ধ ছিল। সেই সময় মুর্শিদাবাদ বাংলা , বিহার ওড়িষ্যার রাজধানী হওয়ায় মহিমাশালী হয়ে উঠেছিল কিরীটেশ্বরী । কিরীটেশ্বরীর গৌরব প্রজ্বলভাবে দিগন্তে বিস্তৃত হয়ে পড়ে ছিল। মুর্শিদাবাদের নবাবগণ ও কিরীটেশ্বরীর মহিমার সম্মান করতেন নবাব জাফর আলি খাঁ বা মীরজাফর তাঁর দেওয়ান মহারাজ নন্দকুমারের অনুরোধে অন্তিম সময়ে কিরীটেশ্বরীর চরণামৃত পান করে ছিলেন। 


তবে কিরীটেশ্বরী মন্দির কে নির্মান করেছিল এবং কবে তা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তার সঠিক তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু ইউরোপীয় পণ্ডিতগণের মতে খ্রীষ্টপূর্ব ৪৬৯বৎসর পূর্বে পীঠস্থান সমূহের মাহাত্ম্য প্রকাশের ঐতিহাসিক কাল কোন সময়ে স্থির হয় সেটাও বিবেচনার বিষয়। তবে ভগবান শঙ্করাচার্য্যের অব্যবহিত পরে গুপ্তবংশীয়গণ ভারতের সম্রাট হন। 

অষ্টাদশ শতাব্দীতে কিরীটেশ্বরী স্থানটি যার অধিকারে ছিল তিনি হলেন বঙ্গাধিকারী মহাশয়গণ। বঙ্গাধিকারী গণের আদি নিবাস ছিল কাটোয়ার নিকটে। খাজুর ডিহি গ্ৰামে, তবে জানা যায় যে তাদের পূর্বপুরুষ ভগবান রায় মোগল বাদশাহের কাছ থেকে যে সমস্ত দেবোত্তর লাখেরাজ সম্পত্তি জায়গীর রূপে প্রাপ্ত করে ছিলেন তার মধ্যে অন্যতম ছিল কিরীটেশ্বরী মন্দির।


নবাব মর্শিদকুলি জাফর খাঁর সময়ে বঙ্গাধীকারীবংশীয় দর্পনারায়ন প্রধান কানুনগো পদে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ডাহাপাড়ায় অবস্থান করে কিরীটেশ্বরীর উন্নতি সাধনে যত্মবান হন।তবে দর্পনারায়নের পূর্বে কিরীটেশ্বরীর অবস্থা তত ভালো ছিল না। মন্দির জীর্ণ হতে শুরু করে ছিল চারদিকে জঙ্গলে ভড়ে যাচ্ছিল। তিনি বনজঙ্গল কেটে গুপ্তমঠ নামে দক্ষিণদ্বারী প্রাচীন আদি মন্দিরের সংস্কার করে পশ্চিমদ্বারী মন্দির ও কতিপয় ভৈরবমন্দির নির্মান করেছিল এবং তার পাশে এক কালী সাগর নামে পুষ্করনী খনন করে ছিলেন ও পাথরের সোপান তৈরি করে ছিলেন যা বর্তমানে মূল মন্দির হয়তে কিছু দূরে অবস্থিত।  কিন্তু সেটি  কালের করার গ্ৰাসে বিনষ্ট হয়। দর্পনারায়ন কিরীটেশ্বরী মেলা নামে এক মেলার প্রচলন করেছিলেন।যে মেলা পৌষ মাসে শনিবার ও মঙ্গলবার বসে থাকে আজ অবধি দূর দূরান্ত থেকে পর্যটকরা ও ভক্তরা দেবির স্মরণে আসেন। 


বর্তমান সময়ে এই গুপ্তমঠ মন্দিরের গৌরব হ্রাস পেয়েছে এবং মন্দিরটির  জরাজীর্ণ অবস্থা । আর পুষ্করণীটি  জঙ্গলে পূর্ণ ও জলশূণ্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কিরীটেশ্বরী গুপ্তমঠ সংস্কার না হলে তার অস্তিত্ব অধিক দিন থাকা সম্ভব নয়।





 লেখক পরিচিতি - সায়ন্তনী ঘোষ । কিরীটেশ্বরী অঞ্চলের বাসিন্দা।এবং লালবাগ সুভাষ চন্দ্র বসু সেন্টেনারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।সায়ন্তনী লেখা শুরু করেছে প্রায় বছর  তিনেক আগে।  তার স্বপ্ন ভবিষ্যতে মুর্শিদাবাদ  ছাড়াও  অন্যান্য জেলার অবহেলিত ইতিহাস তুলে ধরা।

Comments

  1. খুব সুন্দর লিখেছে

    ReplyDelete
  2. Khub sundor hoyeche.
    Aro tothho somriddho lekha agami din dekhte pabo asa korchi.

    ReplyDelete
  3. খুব সুন্দর হয়েছে। আগামী দিনে আরো এরকম লেখা পাবো আশা করছি।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ইতিহাস

বঙ্গে বর্গি আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ফলশ্রুতি

কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়ার ইতিহাস